শানিত মেধা আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে হাজারো সীমাবদ্ধতাতেও তার স্ফুরণ ঘটবেই—এমন উদাহরণ নতুন কিছু নয়। আমাদের দেশে প্রতি বছর বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার পর এমন অনেক মেধাবীকে নিয়েই জাতীয় দৈনিকগুলোতে ছাপা হয় বিশেষ প্রতিবেদন। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার পর গ্রাম-বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এমন অনেক শিক্ষার্থীর কথাই জানা যায়, যারা চরম দারিদ্র্যকে মোকাবেলা করে, সারাবছর ধরে নানা কায়িক শ্রম দিয়ে পরিবারের খরচ চালিয়ে ন্যূনতম সময় সুযোগ পায় নিজের লেখাপড়ার জন্য। আর তাতেই তারা সর্বোচ্চ ফলাফল করতে সমর্থ হয়। বেশিরভাগ প্রতিবেদনে যে বিষয়টির উল্লেখ থাকে তা হচ্ছে দারিদ্র্যের কারণে ভবিষ্যতে পড়ালেখা করার সুযোগ তাদের অনেকেরই থাকে না। এমনই মেধাবীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতেই ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করে ‘এডুকেশন ফর অল’ বা ‘সবার জন্য শিক্ষা’ শীর্ষক একটি প্রকল্প। স্বপ্নবাজ তিন তরুণের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেই প্রতি বছরে সুবিধাবঞ্চিত কিছু শিক্ষার্থীকে পড়ালেখার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। আর ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা তিনজনই সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পরিচালনা করে যাচ্ছেন এর কার্যক্রম।
‘সবার জন্য শিক্ষা ফাউন্ডেশন’-এর তিন প্রতিষ্ঠাতার একজন রাজীব। পুরো নাম এনায়েত হোসেন রাজীব। পেশায় মূলত একজন ফ্রিল্যান্সার। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের রাজীব পড়ালেখা করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইএসটিতে কম্পিউটার বিজ্ঞানে। এরপর আউটসোর্সিংকে নিজের উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। নিজের মেধা আর শ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১১ সালে সেরা ফ্রিল্যান্সারের পুরস্কারও পেয়েছেন রাজীব। ফ্রিল্যান্সিং করতে করতেই গড়ে তোলেন ‘দ্য ওয়েব ল্যাব’ নামের সফটওয়্যার আর ওয়েব সলিউশনের প্রতিষ্ঠান। নিজেই এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করছেন রাজীব। আরেক উদ্যোক্তা সাইফুর রহমান। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের সাইফুর পেশায় একজন প্রকৌশলী, কর্মরত রয়েছেন এরিকসনের সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে পড়ালেখা করেছেন সাইফুর। উদ্যোক্তাদের তৃতীয় জন নূর খান। নেত্রকোনার কেন্দুয়ার নূর পড়ালেখা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ড কলেজ পার্কে, অর্থনীতিতে। এরপর কানাডায় ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করেছেন। ২০১০ সালে দেশে ফিরে কাজ শুরু করেন ইন্টারনেট, সফটওয়্যার আর অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে। ওয়েব, আইফোন, অ্যান্ড্রয়েড প্রভৃতি প্ল্যাটফর্মের জন্য। এসব নিয়ে কাজ করা ই-মাইক্রোগ্রাফের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।
বিনামূল্যে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে শিক্ষার আলোকে ছড়িয়ে দেয়ার এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে রাজীব বললেন, ‘সুবিধা বঞ্চিত মেধাবীরা সুযোগ পেলে নিজেদের প্রমাণ করতে পারবে সকলের মাঝে। এমন তাড়না থেকেই আমরা শুরু করি আমাদের উদ্যোগ। আমরা আমাদের পরিচিত ধনী মানুষদের বলছি একজনের খরচের দায়িত্ব নিন। এভাবেই টাকা আসছে।’
সাইফুর রহমান বললেন, ‘এসব মেধাবী সুযোগ পেলে অনেক উপরে উঠতে পারবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি। তাই তাদের জন্য যতটুকু করা প্রয়োজন, ততটুকু করার চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে সারাদিন অফিস করার পরেও এই প্রকল্পে সারারাত কাজ করতে হয়। আবার পরের দিন অফিস করতে হয়। কিন্তু এই প্রচেষ্টার ফলে মেধাবীদের মুখে সামান্য হলেও যে হাসি ফোঁটাতে পারি, সেটার জন্য সব পরিশ্রমই সার্থক মনে হয়।’
নূর বললেন, ‘আমি নিজের মতো করে আলাদাভাবে মেধাবীদের পড়ালেখার জন্য কাজ করতাম। পরে সাইফুর আর রাজীবের সাথে একসাথে কাজ করা শুরু করলাম। আসলে আমরা তো অনেক ছোট উদ্যোগ নিয়ে শুরু করেছি। এরকম বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি একই ধরনের উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে দেশের চিত্রই ৫/১০ বছর পরে পাল্টে যাবে।’
উদ্যোক্তারা জানালেন, ২০১১ সাল থেকে এই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। প্রথম বছরের প্রথম ব্যাচে ১০ জনকে সহায়তা করেন তারা। পরের ব্যাচে ২৮ জনকে নিয়ে কাজ করা হয়। আর এ বছরে ৬৫ জনকে নিয়ে কাজ করছে সবার জন্য শিক্ষার এই প্রকল্প। গত জুন মাসে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের জন্য পরীক্ষা নেয়া হয়। লিখিত পরীক্ষার পর সাক্ষাত্কারও নেয়া হয়। সব শেষে বেছে নেয়া হয় ৬৫ জন শিক্ষার্থীকে। সামনের বছরে এই সংখ্যাকে ১০০তে উত্তীর্ণ করার ইচ্ছা রয়েছে উদ্যোক্তাদের।
সবার জন্য শিক্ষা কার্যক্রমে একজন শিক্ষার্থীর এইচএসসি প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের যাবতীয় বই, ভর্তি, পরীক্ষার ফিসহ ৩০ মাসের যাবতীয় খরচ এবং পড়ালেখার খরচ বহন করা হয়। এ ছাড়াও ৫ মাস ঢাকায় থাকা-খাওয়াসহ কোচিংয়ের খরচ এবং ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম পূরণ, পরীক্ষা দেয়ার খরচ এবং যাতায়াত খরচ বহন করা হয়। গত বছরে প্রতি শিক্ষার্থীর পেছনে সার্বিক খরচ হিসেবে বরাদ্দ ছিল ৬৯ হাজার টাকা। এ বছর তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮১ হাজার টাকা। কেবল টাকা বরাদ্দ আর বিতরণই নয়, পুরোটা সময় জুড়ে শিক্ষার্থীদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগও করা হয়। আর যেকোনো ধরনের সমস্যাতেও পরিবারের একজন হিসেবেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় সবার জন্য শিক্ষা।
