ওষুধের নামে ‘বিষ’ খাচ্ছে রোগী!

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:১৪
ওষুধ রোগীর জীবন রক্ষা করে। কিন্তু সেই ওষুধই যদি তার জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটিকে ওষুধ বলার চাইতে ‘বিষ’ বলাই ভালো! ভয়াবহ তথ্য হলো- ওষুধের নামে এমন ‘বিষ’ উত্পাদন ও বাজারজাত হচ্ছে খোদ রাজধানীতেই। ওষুধ প্রশাসনের নাকের ডগায় তৈরি হচ্ছে জীবন বিপন্নকারী ভেজাল ও নিম্নমানের এসব ওষুধ। আর রোগীরা সরল বিশ্বাসে ফার্মেসী থেকে এসব ওষুধ কিনে সেবন করে নিজেদের জীবনকেই বিপন্ন করে তুলছেন। গতকাল মঙ্গলবার র্যাব পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পূর্বে লাইসেন্স স্থগিতকৃত ওষুধ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল টেকনোফার্মা লিমিটেডের পান্থপথের কর্পোরেট অফিসে অভিযান চালায়। সেখান থেকে জব্দ করে বিপুল পরিমাণ এন্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক টেবলেট-ক্যাপসুলসহ বিভিন্ন ধরনের ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ। এসব ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করার অপরাধে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ৪ কর্মকর্তাকে জেল-জরিমানা করে আদালত। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভেজাল ও বিষাক্ত দ্রব্য সংমিশ্রণে নিম্নমানের ওষুধ উত্পাদন করে বাজারজাত করার কারণে গত বছর কোম্পানিটির লাইসেন্স সাময়িক বাতিল করেছিল ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। কিন্তু তার তোয়াক্কা না করেই ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উত্পাদন অব্যাহত রাখে প্রতিষ্ঠানটি। গতকাল র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে আদালত কোম্পানির কার্যালয়ের গুদাম থেকে অবৈধভাবে উত্পাদিত নিম্নমানের ভেজাল এন্টিবায়োটিক ও ওমিপ্রাজল ক্যাপসুলসহ বিপুল পরিমাণ ওষুধ জব্দ করেন। তারা দেখতে পান, কোম্পানিটির ওষুধ রাখার গুদামটিও বেশ অস্বাস্থ্যকর। ওষুধ সংরক্ষণের জন্য ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তাদের তাও নেই। মোবাইল কোর্টের কাছে কোম্পানির এমডি মোহাম্মদ আলী খান স্বীকার করেন যে তিনি অবৈধভাবে ওষুধ উত্পাদন করে আসছেন। সাংবাদিকদের তিনি জানান, তার ওষুধের কারখানা দিনাজপুরে। সেখান থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। তাবে তাদের উত্পাদিত ওষুধের গুণগত মান নিয়ে কোন সন্দেহ নেই বলে তিনি দাবি করেন। পরে আদালত বেঙ্গল টেকনোফার্মা কার্যালয় সীলগালা করে দেয়। কোম্পানির এমডি মোহাম্মদ আলী খানকে ২ বছরের কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করে। এছাড়া কোম্পানির তিন কর্মকর্তা নূরুজ্জামান চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন ও একেএম বোরহান উদ্দিন প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। অভিযানে র্যাব-২ এর মেজর হিমাদ্রি শেখর রায় নেতৃত্ব দেন। এদিকে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক বলছেন, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ খেয়ে লিভার ও কিডনি জটিলতাসহ নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে রোগীরা। এসব ওষুধ শরীরের গোটা সিস্টেমকে দ্রুত নষ্ট করে দেয়, যা ফরমালিনের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। মুনাফার জন্য ‘বিষাক্ত’ ওষুধ দিয়ে দেশে মানুষ হত্যা করে যাচ্ছে একটি চক্র। কিছুদিন আগে বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ পান করে তিন শতাধিক শিশুর প্রাণহানি এবং ৫ শতাধিক শিশুর কিডনিসহ নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন তোলে। এরপরও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। নিউরোলজিষ্ট অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, নিম্নমানের ও ভেজাল ওষুধ খেলে প্রাণহানির আশংকার পাশাপাশি মানবদেহের পুরো সিস্টেম বিনষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে। ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন বলেন, সাম্প্রতিকালে বিষাক্ত প্যারাসিটামল সেবন করে কয়েকশ’ শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। কিডনি, লিভার জটিলতায় পরবর্তীদের অনেক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কঠোর হস্তে এসব ওষুধ প্রতিরোধ করা জরুরি। চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএম হুদা বলেন, বেশির ভাগ ওষুধের দোকানের সেলসম্যান কিংবা মালিক ব্যবস্থাপত্রে নামিদামি কোম্পানির ওষুধ উল্লেখ থাকলেও বেশি লাভের আশায় নিম্নমানের ওষুধ রোগীকে ধরিয়ে দেন। এটা এক ধরনের প্রতারণা বলে তিনি জানান। রাজধানীর কয়েকটি ফার্মেসীর সেলসম্যানরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে জানান, বেঙ্গল টেকনোফার্মার এন্টিবায়োটিক ক্যাপসুল কোম্পানি থেকে তারা পাইকারি প্রতিটি ১০ থেকে ১২ টাকায় কিনে রোগীর কাছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করেন। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধে লাভ হয় অনেক বেশি। এক হাজার টাকার ওষুধে ৮শ’ টাকা পর্যন্ত মুনাফা হয়। এ কারণে নামিদামি কোম্পানির ওষুধ তারা প্রথমেই দিতে চান না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কয়েকটি কোম্পানির ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উত্পাদন করার মত দুঃসাহস দেখানোর নেপথ্যে রয়েছে কোটি টাকার ভাগাভাগি। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ প্রশাসনের দায়িত্বশীল একশ্রেণীর কর্মকর্তা ওই সব প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মোটা অংকের মাসোহারা পান। অনেককে এপার্টমেন্ট, গাড়ি পর্যন্ত কিনে দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তা, বিএমএ ও স্বাচিপের কয়েকজন নেতার বিদেশে যাতায়াতের খরচ ওই সকল ওষুধ কোম্পানি বহন করে থাকে। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে একশ্রেণীর চিকিত্সকের প্রাইভেট চেম্বারের ভাড়া, গাড়ি ও বাড়ি কেনার খরচ, এমনকি বাসার বাজার পর্যন্ত করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিম্নমানের ওষুধ উত্পাদনের সঙ্গে জড়িত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন মালিক নিজেরা স্বীকার করেছেন যে, বিভিন্ন উপহার সামগ্রীর নামে মোটা অংকের উেকাচ দিয়ে তারা নকল ও ভেজাল ওষুধ দেশব্যাপী বাজারজাত করছেন। এদিকে চারটি নামিদামি ওষুধ কোম্পানির মালিকরা ইত্তেফাককে জানান, সম্প্রতি সংসদীয় কমিটির তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষজ্ঞ দল এলোপ্যাথিক ওষুধ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহে সরেজমিনে তদন্ত করেন। নিয়ম বহির্ভূতভাবে ও নিম্নমানের ওষুধ উত্পাদনের অভিযোগে বেঙ্গল টেকনো ফার্মা লিমিটেডসহ ৬২টি কোম্পানির লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ কমিটি ওই ৬২টি কোম্পানির ওষুধ উত্পাদন বন্ধ করার সুপারিশ করে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এর আগে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি প্রতিবেদনে ঐ সকল কোম্পানির ওষুধ নিম্নমানের এবং খেলে রোগীর প্রাণহানিসহ বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশংকার কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ওই ৬২ কোম্পানির মধ্যে কয়েকটি নিয়মনীতি ও নির্দেশনা উপেক্ষা করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের নামে ‘বিষ’ তৈরি করে বাজারজাত অব্যাহত রেখেছে। এরই একটি বেঙ্গল টেকনো ফার্মা। জাতীয় সংসদের স্বাস্থ্য বিষয়ক উপকমিটি গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আ ব ম ফারুক বলেন, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি। বেঙ্গল টেকনো ফার্মা’র নির্দেশনা উপেক্ষা করে ওষুধ উত্পাদন বেআইনি। এ ধরনের কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তিনি আরো জানান, জাতীয় সংসদের স্বাস্থ্য বিষয়ক স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে পুনরায় ওই ৬২টি কোম্পানির কারখানা পরিদর্শনের জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। তার নেতৃত্বে পুনরায় পরিদর্শন ও তদন্ত কার্যক্রম শুরু হবে।