বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ মানলেও দুর্নীতি ঠেকানো যায়নি

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:১৫
বাংলাদেশে দুর্নীতি রোধে নেয়া বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সুপারিশও কার্যত কোন ফল দিচ্ছে না। আন্ডারইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিপুল অংকের অর্থ ফাঁকি দেয়া হচ্ছে বলে ইকনোমিস্ট পত্রিকায় অনলাইন ব্লগের একটি নিবন্ধে প্রতিফলন ঘটেছে এ ধারণার। এতে বলা হয়, আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের কারণেই রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির এক শতাংশ। কিন্তু বিষয়টি খতিয়ে দেখলে স্পষ্ট যে, দীর্ঘদিনের এই অভিযোগের কারণে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শেই প্রাকজাহাজীকরণ পরিদর্শন বা পিএসআই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত কোম্পানিকেই এই দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিল। তারপরও যদি বলা হয় যে, একই ধরনের ঘটনা অব্যাহত ছিল। তাহলে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, ওসব কোম্পানি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেনি? বাংলাদেশে সংঘটিত দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের দুর্নীতির ধারণা সূচকে অবনতি হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের পদ্মা সেতু প্রকল্পে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের অর্থায়ন বাতিলের ঘটনা। বিষয়গুলো নিয়ে ঐ ব্লগে কিছু মন্তব্য তুলে ধরা হয়। বলা হয়, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম নিয়োগ লাভের পর তার দুর্নীতি বিরোধী অবস্থানের কথা বিভিন্ন সময়ে প্রচার মাধ্যমে উল্লেখ করতে গিয়ে বাংলাদেশের ঘটনাকে প্রচার করেছেন। কিন্তু এর চেয়েও অনেক বড় বিষয় রয়েছে যা এখনো উপেক্ষিত। বাংলাদেশের আন্ডার ইনভয়েসিং-এর মাধ্যমে যে রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে তা পদ্মা সেতু প্রকল্পের চেয়েও অনেক বেশি। আমদানি পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করে মূল্য কম দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকির ঘটনাকে আন্ডার ইনভয়েসিং বলা হয়। এই ক্ষতি জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ। ইকোনমিস্ট-এর ব্লগে উল্লেখ করা হয়েছে, ফরেস্ট কুকসন নামে মার্কিন অর্থনীতিবিদের হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে আন্ডার ইনভয়েসিং-এর মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্যের শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) এক শতাংশের কাছাকাছি। আন্ডার ইনভয়েসিং রোধ করা গেলে দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও দেড় শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে এটি প্রতিরোধ করা গেলে ৩০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য বাড়তে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে যে, পিএসআই কোম্পানিগুলো তাহলে এতদিন ধরে কি করেছে? তাদেরকে নিয়োগ করে কি লাভ হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ওসব কোম্পানি আমদানিকারক ও কাস্টমস কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করেই শুল্ক ফাঁকি সহজ করে দিয়েছে। এমন অভিযোগ, আলোচনা-সমালোচনার পর গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশের বাধ্যতামূলক পিএসআই (প্রাক জাহাজীকরণ) প্রথা ঐচ্ছিক করা হয়েছে। অর্থাত্ এখন থেকে আমদানিকারকরা পিএসআই কোম্পানির মাধ্যমে মূল্যায়ন করাতে বাধ্য নন। প্রসঙ্গত, পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে দেশে বাধ্যতামূলভাবে পিএসআই ব্যবস্থা চালু হয় ২০০০ সালে। বিশ্বকে ৫টি ব্লকে ভাগ করে ৪টি কোম্পানিকে সরকার নিয়োগ দিয়েছে। এ ব্যবস্থাটি চালু করা হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের পরমর্শে। বলা হয়েছিল, এর ফলে আন্ডার ইনভয়েসিং রোধ করা সম্ভব হবে; কিন্তু কার্যত তা হয়নি। গত এক যুগে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের ফলে বিশাল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এটা আশ্চর্য যে, বিশ্বব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এ ধরনের বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেন, পণ্যের সঠিক শুল্কায়নের জন্য এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বেনাপোল, চট্টগ্রাম ও ঢাকা— এ তিনটি বন্দরে একটি নতুন সফটওয়্যার স্থাপন করেছে যার মাধ্যমে সন্দেহজনক পণ্যের মূল্য নিরূপণে বর্তমান বাজার দর যাচাই করা যাবে। অবশ্য পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন স্থাপনে এখনো অনেক কিছু বাকি রয়েছে।