দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জনগণ বর্তমানে পানিবিপন্ন এক দুঃসময় পাড়ি দিচ্ছেন। এই বিশাল জনপদের মানুষেরা খাবার পানি থেকে শুরু করে কৃষি ও নিত্যব্যবহার্য পানির জন্য মাইলের পর মাইল ছুটে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু কোথাও খাওয়ার পানি নেই। বিশ্ব ব্যাংক, এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়নে এই এলাকায় পানি সমস্যা সমাধানসহ প্রকল্পের পর প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও স্থানীয় মানুষদের সিদ্ধান্ত, জ্ঞান ও দাবিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কিন্তু জনজীবন এবং পরিবেশ দিনে দিনে আরো বিপর্যস্ত এবং দুর্যোগের ভেতর পড়েছে। এই দুর্যোগ এবং দুঃসময়ের ভেতরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাহসী পরিশ্রমী জনগণই নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকবার ছোট ছোট উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন এবং বিদ্যমান তথাকথিত উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন স্থানীয় মানুষের সমস্যা সমাধান কিভাবে করতে হয়। জলবায়ু বিপন্ন খাদ্য সংকটের এই সময়ে আমাদের আজ সময় হয়েছে স্থানীয় মানুষের জীবন এবং উদ্যোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার। কারণ এখানেই জাগ্রত আছে দেশকে গড়ে তোলার সম্ভাবনার বীজ। এখান থেকেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের কৃষি-পরিবেশ-প্রতিবেশ-প্রাণবৈচিত্র্য ও জীবন জীবিকা রক্ষার প্রয়োজনীয় সমাধান হওয়া সম্ভব। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রান্তিক জীবনের প্রস্তাব ও দাবিসমূহ এক করে একটি সমন্বিত যৌথ নীতিমালা এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান সম্ভব।
চিংড়ি চাষ পূর্ববর্তী কৃষি ঃ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে মনুষ্য বসতি গড়ে উঠেছিল ধান চাষের জন্যই্্। ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্র তাঁর যশোর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন.‘এ অঞ্চলে ধান্যক্ষেত্র অধিক এবং যেখানে জমি বারোমাস জলাপ্ল¬াবিত না থাকে সেখানে স্বল্পায়াসে প্রচুর ধান্য হয়। যেখানে স্থান একটু পলির বলে উচ্চ হয়, সেখানে মনুষ্যবল ও কৌশলে শ্বাপদসংকুল স্থানে আত্মরক্ষা করিয়া “বাদা” কাটিয়া আবাদ বা শস্যক্ষেত্র প্রস্তুত করিতেছে এবং সেই বহুযুগের পতিত নবাবিষ্কৃত অকর্ষিত ক্ষেত্রে বীজমুষ্টি নিক্ষেপ করিলে শষ্যের স্বর্ণবৃষ্টি হয়’। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের বিলের পরিবেশ ছিল ভিন্ন। বর্ষাকালে বিলগুলোতে ভেউলো, ছামনা, ভটকা, নাড়ার গোজ, চেচো, কোচুরি জাতের আগাছা পচে সার হতো। আগাছা পঁচে মাটি কালো হলে কৃষক ২/৩ চাষ দিয়ে স্থানীয় প্রজাতির বিভিন্ন ধান চাষাবাদ করতো। যে সমস্ত স্থানীয় ধান কৃষকেরা চাষাবাদ করতো তার মধ্যে তালমুগুর, বয়ারবাট, বালাম, আকন্দ, মুটাগেতি, লালগেতি, খাজুরছড়ি, হোগলা, দারশাইল, মেলিগৌড়, হরকোচা, ঝিঙ্গে শাইল, বাঁশফুল, দুধেমোটা, হলদেবাটালি, কৈজুড়ি, গোপালভোগ, ছোটনাখাজুর ছড়ি, গেড়মুড়ি, চাপরাইল, বয়ানগেতি, কাটারাঙ্গী, আশফল, শোলির পোনা, নোনাবালাম, নারিকেল মুচি, পর্বতবালাই, ঘুন্সি, পানবোট, পানখাগি, কাকশিল, ঢেউকামিনী, বেগুনবিচি, ক্যাথরাইল, পাটনাই, চিনিকানি, ইঞ্চি, মালাগেতি, হামাই, তিলোককুচি ধান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ডিএফআইডি’র অর্থায়নে ‘পেট্রা’ প্রকল্পের অধীনে (২০০২) বারসিক, সিডিপি ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের ধান বৈচিত্র্যের উপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে। ২০টি গ্রাম গবেষণা করে ১১৬টি জাতের ধান সংগ্রহ করে যার মধ্যে ১০০টির মত স্থানীয় জাতের ধান। এছাড়া, কৃষকেরা মৌসুম ও জমির ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ডাল (চৈতিমুগ, মুশুরি, খেসারী, কলুই, ফেলন, অড়হর), পাট, সরিষা, তিল, গম, মসলা (পেয়াজ, মরিচ, আদা, হলুদ, রসুন, ধনিয়া, চুই), আলু, শাক (ডাটা, লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক), বেগুন, কুমড়া, লাউ, পটল, ঢেড়ষ, উচ্ছে, তরুল, ঝিঙ্গা, কুশি, মূলা, ওলকপি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, শসা, বরবটি, সীম, ঔল, কচুরমুখি, কচু, মেটেআলু ইত্যাদি চাষাবাদ করতো। মূলত, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ছিল সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর। কৃষির সমস্ত উপকরণ কৃষকের নিয়ন্ত্রণে ছিল, কৃষক ছিল আত্মনির্ভরশীল। কৃষক প্রতিটি ফসল থেকে পরবর্তী বছর চাষাবাদের জন্য বীজ সংরক্ষণ করতো এবং পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে গড়ে তুলতো বৈচিত্র্যময় বীজভান্ডার।
