হাজার বছরের পুরনো ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সাতক্ষীরাকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। বিভিন্ন শাসনামালে প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনগুলো বহন করছে জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদারদের ছোঁয়া লক্ষণীয়। তারা নানান স্থাপনা তৈরি করেছিলেন আজ যা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসাবে স্বাক্ষর রেখে চলেছে। রাজা কিংবা জমিদারদের এসব বিলাসবহুল প্রাসাদ মন্দির কিংবা মসজিদ কীর্তিমান স্থাপনা বিভিন্ন শিল্পীর রক্ত-ঘামের ফসল। তাদের শ্রম ও নান্দনিক চেতনায় কীর্তিত। এই কীর্তির প্রত্যেক পরতে সেইসব অজানা অচেনা শিল্পী ও শ্রমজীবী মানুষগুলোর স্পর্শ আজ স্মৃতি হয়ে জ্বল জ্বল করছে। এসব পুরাকীর্তির কোন কোনটা স্থানীয় অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ও পরিবর্ধন করে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনটাবা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংস্কার করে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। অনেক কীর্তি প্রকৃতির সাথে লড়াই করতে করতে বিলীন হতে চলেছে। কোনটারই রক্ষণাবেক্ষণের সুষ্ঠু উদ্যোগ নেই। জেলার অর্ধশতাধিক পুরাকীর্তির মধ্যে কয়েকটির সচিত্র পরিচিতি এখানে তুলে ধরা হ’ল।
প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ
কালিগঞ্জ উপজেলার প্রবাজপুর গ্রামে অবস্থিত এ মসজিদটি ১১০৪ হিজরির ১৯ রমজান ২ মে ১৬৯৩ খিস্টাব্দে নির্মিত। সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময় তার ফৌজদার নবাব নুরুল্লাহ খাঁ এ মসজিদের নামে লাখেরাজে ৫০ বিঘা জমি দান করেন। কথিত আছে সুবাদার পারভেজ খাঁ বাদশাহর কাছ থেকে নির্দেশ পেয়ে সেনাবাহিনীর নামাজ পড়ার জন্য এটি নির্মাণ করেন। তার নামানুসারে এ গ্রামের নাম হয় প্রবাজপুর। জেলার মধ্যে সবচেয়ে টেরাকোটা সমৃদ্ধ মসজিদ এটি। কলিগঞ্জ উপজেলা সদর হতে প্রায় ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে এর অবস্থান।
যশোরেশ্বরী কালীমন্দির, ঈশ্বরীপুর, শ্যামনগর
শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে ১২ শতকের শেষার্ধে রাজা লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে যশোরেশ্বরী কালীমন্দির নির্মিত হয় বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। রাজা প্রতাপাদিত্য রাজধানী নির্মাণকালে জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় ভগ্নাবস্থায় এই মন্দির ও কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি উদ্ধার করেন। তারপর তিনি এ বিশাল মন্দিরটি পুন:প্রতিষ্ঠা করেন। কবিরামের দিগ্বিজয় গ্রন্থ থেকে জানা যায় রাজা লক্ষণ সেন ঈশ্বরীপুরে অবস্থিত যশোরেশ্বরী মন্দির ও তার উত্তর-পূর্ব কোণে চন্ড ভৈরব মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। বংশীপুর বাসস্টান্ডের পূর্ব পার্শে এই মন্দিরটি শ্যামনগর উপজেলা থেকে ৪ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে হাম্মামখানা ও শাহী মসজিদের পাশে অবস্থিত।
জাহাজঘাটা নৌদুর্গ, খানপুর, শ্যামনগর
শ্যামনগর উপজেলার খানপুর গ্রামে অবস্থিত রাজা প্রতাপাদিত্যের জাহাজঘাটা নৌদুর্গ। যমুনা ইছামতি নদীর পূর্ব পাড়ে এ জাহাজঘাটায় রণতরী তৈরি ও মেরামতের কাজ হতো। মুঘলদের আক্রমণ প্রতিহত করতে রাজা প্রতাপাদিত্য এখানে শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। সেখানে ছিল তার প্রধান কার্যালয় ও পোতাশ্রয়। নৌবিভাগের প্রধান ছিলেন পর্তুগীজ নাগরিক সেনাপতি ফ্রেডরিক ডুডলী ও বড়ারিগো। জাহাজঘাটার একটি মাত্র ভবন ভেঙ্গে চুরে এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এ ভবনটিতে ছয়টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে অফিস, মালখানা, শয়নকক্ষ ও স্নানাগার ছিল। ছাদের গম্বুজে বড় বড় ছিদ্র যা দিয়ে ঘরের মধ্যে প্রয়োজনীয় আলো প্রবেশ করত। ঐ ছিদ্রয় স্বচ্ছ কাঁচ বসানো ছিল বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা। ঈশ্বরীপুরের হাম্মামখানার সাথে এর কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়। এ জাহাজঘাটাটি নির্মাণ করা হয়েছিল ষোল শতকের শেষ দশকে। কালিগঞ্জ থেকে শ্যামনগর যাওয়ার পথে মৌতলা পার হলেই খানপুর পাকা রাস্তার পূর্ব পাশেই এর অবস্থান। জাহাজঘাটার পাশে নৌ সেনাপতি ডুডলীর নামানুসারে বর্তমান দুদলী গ্রামে নৌকা জাহাজ নির্মাণ ও সংরক্ষণের “ডক ছিল”।
তেঁতলিয়া জামে মসজিদ তেঁতুলিয়া তালা
ঐতিহ্যবাহী এ মমসজিদটি নির্মিত হয় ১২৭০ বঙ্গাব্দে। এর অপূর্ব নির্মাণশৈলী সহজেই সকলকে আকৃষ্ট করে। এটি তেঁতুলিযার জমিদার কাজী রেজওয়ানউল্লাহর পূর্বপুরুষ তৈরি করেন। তালা সদর উপজেলা থেকে উত্তরে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে খুলনা-তালা রাস্তার পাশেই এর অবস্থান। এর অনতিদূরে বিখ্যাত হাশেমী বাড়ী, যেখানে সাহিত্যিক সিকান্দার আবু জাফরের জন্মস্থান।
পঞ্চমন্দির, পুরাতন সাতক্ষীরা, সাতক্ষীরা সদর
সাতক্ষীরা শহরের পুরাতন সাতক্ষীরায় অবস্থিত পঞ্চমন্দির। জমিদার বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী বুড়ন পরগানা ক্রয়ের পর এলাকায় বনজঙ্গল পরিষ্কার করে এ মন্দির নির্মাণ করেন ১২০১ বঙ্গাব্দে। পঞ্চমন্দিরগুলো হলো অন্নপুর্ণা মন্দির, কাল ভৈরব মন্দির, শীব মন্দির, রাধা গোবিন্দ ও কালি মন্দির । এসব মন্দিরের মধ্যে রাধা গোবিন্দ মন্দিরের মূল ভবন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। রাধা গোবিন্দ মন্দির ও শনিদেবের মন্দিরে এখন সারা বছর পূজাপার্বণ হয়ে থাকে। বর্তমানে এটা মায়ের বাড়ী হিসাবে পরিচিত।
হাম্মামখানা বংশীপুর, শ্যামনগর
শ্যামনগর উপজেলার বংশীপুর গ্রামে টেংগা বা শাহী মসজিদের পূর্ব পার্শ্বে এবং যশোরেশ্বরী মন্দিরের পশ্চিমে অবস্থিত হাম্মামখানা বা স্নানাগার। এটা ছিল রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজকীয় অতিথিশালা। এর মধ্যে চৌবাচ্চা, পানি চলাচলের পথ, ছাদে গম্বুজ ও গম্বুজে বড় বড় ছিদ্র রয়েছে। যেটা দিয়ে ঘরের মধ্যে আলো প্রবেশ করে। ১৬ শতকের শেষ দিকে নির্মিত এ হাম্মামখানার উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালের পশ্চিম পার্শে ছোট একটি করে দরজা আছে।
বংশীপুর ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ, বংশীপুর শ্যামনগর
পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি ১৫৯৯ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত বলে জানা যায়। একে টেংগা মসজিদও বলা হয়। টেংগা ফার্সি শব্দ। যার অর্থ সেনানিবাস বা ছাউনি। রাজা প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি খাজা কামাল বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, রাজ কর্মচারী, বহু পাঠান ও স্থায়ী মুসলিম সৈন্যদের জন্য মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের ৫টি মেহরাব থাকার কারণে একই সাথে পাঁচটি নামাজ পরিচালনা করা সম্ভব। মসজিদের পূর্ব পার্শে ১ ফুট লম্বা ১টি ও আরো কয়েকটি কবর আছে। কবরগুলো বারো ওমরাহের কবর। যারা দিল্লির বাদশাহ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসে মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া সাতক্ষীরায় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসাবে আশাশুনির শ্রীউলা জামে মসজিদ, সদরের লাবসা গ্রামর মায়ি চম্পার দরগা, ছয়ঘরিয়ার জোড়া শিবমন্দির, জমিদারবাড়ী জামে মসজিদ ও কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া মঠ উল্লেখযোগ্য।
