২ মে ২০১৯ ছিল রেনেসাঁ মানব লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ৫০০তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর আঁকা ‘মোনালিসা’র খ্যাতি শিল্পীকে ছাড়িয়ে গেছে। পৃথিবীর যে কোনো দেশে তুষারপ্রান্ত থেকে শুরু করে মরুপ্রান্ত যদি মানুষের আঁকা একটি ছবির নাম বলতে বলা হয় সম্ভবত সমস্বরে ধ্বনিত হবে মোনালিসার নাম।
পপলার কাঠের তক্তার ওপর তেলরঙে আঁকা ৭৭ সেন্টিমিন্টার – ৫৩ সেন্টিমিটার (৩০ ইঞ্চি – ২১ ইঞ্চি) মাপের নারী পোর্ট্রেট ১৯১১ সালে যখন ল্যুভ জাদুঘর থেকে চুরি হয়ে যায়, প্যারিস হয়ে ওঠে শোকের শহর।
দেয়ালে চার পেরেকের ওপর স্থাপিত ছিল ছবিটি। চুরির পর এই শূন্যস্থানটি দেখার জন্য মানুষের ঢল নামে। একদিন বা দু দিনের ঢল নয়, প্রতিদিনের হাহাকারে পরিণত হয় মোনালিসা। ছবিটি আর ছবি থাকে না, সর্বনাম IT হয়ে ওঠে SHE; বাস্তবিক জীবন আরোপিত হয় একদা ফ্রেমবন্দি হারিয়ে যাওয়া মোনালিসা।
দু বছর পর মোনালিসার চোর ধরা দেন—সে কাহিনিও যতটা না চুরির, তার চেয়ে বেশি দেশপ্রেমের। ল্যুভ জাদুঘরের একসময়ের ইতালীয় কর্মচারী ভিনসেনজো পেরুছিয়া মনে করলেন, ইতালি থেকে লুট করে নেওয়া ফ্রান্সের জাদুঘরে টাঙানো ছবি ইতালিতে ফিরিয়ে দেওয়া তাঁর নৈতিক দায়িত্ব। পঞ্চম প্রচেষ্টায় তিনি চুরিতে সফল হন। ধরা পড়লেন অক্ষত ছবিসহ দু বছর পর।
লিওনার্দো কবিতাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পমাধ্যম মনে করতেন। কিন্তু চিত্রকলা যে কবিতার চেয়েও উত্তম সংস্কৃতি-মাধ্যম—একথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। তাঁকে নিয়ে তাঁর আঁকা ‘মোনালিসা’, ‘ভার্জিন অব দ্য রক্স’, ‘দ্য লাস্ট সাপার’ নিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের অনেকেই লিখেছিন। মোনালিসা নিয়ে একালের পাঁচ জন কবির পাঁচটি কবিতা অনূদিত হলো :
মোনালিসা
টেডি কিমাথি
দশ বছর ধরে তার রঙের তুলি তার হাতে গতিতে
সাদা লোম্বার্দি পপলার তক্তার ওপর নেচেছে,
তার সৃষ্টিকরা চিত্রকল্পের অননুকরণীয় প্রভাব ফেলেছে
হ্যাঁ! নোবলম্যান ফ্রান্সেসকো দেল গিয়োকোন্দোর স্ত্রী
লিসা ঘেরারদিনির ছবি।
তিনি তার ছবিটিকে দশ বছর হলি গ্রেইলের মতো ধরে রেখেছেন
বিভিন্ন তেলরঙে তার মেধার যথার্থ প্রকাশ করতে চেয়েছেন
তার প্রেরণাদাত্রী দেবীর আর্শীবাদ মিশে গেছে সাথে
তিনি যখন মাতাল কিংবা ক্ষুব্ধ
কখনো একবারও মোনালিসাকে আঁকেননি
আজ তার আদি-অকৃত্রিম মনের রঙের প্রতিফলন
দেখা যায় প্যারিসে ল্যুভ জাদুঘরে।
মোনালিসার হাসি
ম্যারিলিন লট
তার হাসিটা রহস্যময়
মানুষ জানতে চায় কী এর মানে
পাঠ্যবইয়ে তো লেখাই আছে
কোনো কোনো স্বপ্নে দেখাও দিয়েছে
মোনালিসার হাসি নিয়ে
ন্যাট কিং কোল গান বেঁধেছেন
মানুষ কৌতূহলী হয়ে জানতে চেয়েছে
সময় ধরে তাকে পাঠ করেছে
ভালোবাসার কারণে হেসেছে?
সেই ব্যাকুল সামান্য দেঁতো হাসি
যখন সে তার কথা মনে করেছে
একটা ভাবনা সম্ভবত তার মনে ছিল
তার মেধাবী শিল্পী একরাতে
স্বপ্নে তাকে এমনই দেখেছে—এমন মুখাবয়ব
নাকি এটা আসলে পুরুষের মুখমণ্ডল
যিনি এঁকেছেন তারই আয়না প্রতিবিম্ব?
হাসির সত্যিকার গল্পটা
অবশ্যই কেউ কখনো জানবে না
কিন্তু ব্যাপারটা খুব মজার, তুমি কি মনে করো না?
কারণ সত্যিই সে প্রতারণা করে থাকতে পারে।
মোনালিসা প্রেমে পড়েছে
আইরিন ল্যাথাম
তুমি বলো আমার চোখ
মহাসাগরের রহস্য ধরে আছে,
সেই প্রশ্ন আমার মাথায় বাসা বেঁধেছে
তুমি চাও তোমাকে দেখাই
কী আছে লুকিয়ে আমার ধূর্ত হাসির আড়ালে।
যদি তোমাকে বলি
আমার ঘুম পাচ্ছে, স্বপ্নালু তা হলে কি
স্মৃতির ঢেউ ভাসিয়ে নেবে?
এটা কেবল তুমিই
আমি তোমাকে স্মরণ করছি
আমরা দুজন একসাথে পাল তুলেছি
সীমান্তহীন নীলের ক্যানভাসে।
ককানো লিসা
জ্যাক এলিসন
কেউ কখনো জানেনি এই ছবি
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি যখন আঁকছিলেন
ককানো লিসার নিচের অংশে
মাংসপেশী কুঁকড়ে যাচ্ছিল
যেখানে বসে গোঙানি চেপে
সামনে কী খ্যাতি তার অপেক্ষায় জেনে
মৃত্যর পরও শতক শতক ধরে
স্বীকৃত হবে তা সে জানত
তার নিচে যে পোর্টেবল টয়লেট ছিল দেখোনি
বিশ্বাস করো আমি জানি, তা ছিল
তখন এ ধরনের সরঞ্জাম ছিল
ঠিক প্রতিটি চেয়ারের সাথে তৈরি করা
এরপর তুমি যখন বিখ্যাত ছবিটি দেখবে
ককানো লিসার বিরক্তির কথা ভেবো
এমন দেবীর মতো চেহারাতে দেখায়
কী যে অস্বস্তিতে ছিল কখনো অনুমানও করোনি।
তোমার হাসি আমাকে পাঠায়
রাম মেহতা
তোমার খেলুড়ে চাহনি, তুমি ধূর্ত ছিলে
একটি মাত্র চাহনিতে আমাকে বশ করে নিলে
কোনো ধ্রুপদে নয় বইতেও মেলেনি
তোমার বেলা অনুপম, যদিও কিছুটা অবিচার
যখন আমি সেখানে নির্বসন দাঁড়িয়ে ছিলাম।
তুলির আঁচড় এত দ্রুত আমাদের দেখা কিঞ্চিত কেবল
রঙের প্যালেট কী ভেবেছে আমি জানি না
আমি ভয় পেয়েছি গোঁফ মিলিয়ে যাবে
যখন আমি ক্যানভাসে চুমো খাই, আমরা দুজন একটি দ্বৈত,
রং যখন ছড়াতে লাগল একটি আলৌকিক কিছু ঘটে গেল।
