সাক্ষাত্কারে চান্তাল আকেরমান

আমি সবসময়ই নির্বাসনে থাকি

আপডেট : ১৬ মে ২০১৯, ১৯:৫২

তাঁর সিনেমা একধরনের আত্মজৈবনিক; ঠিক নৈরাশ্য নয়, একধরনের আবদ্ধবোধের ফসল। কোনোরকম স্বীকৃতির তোয়াক্কা না করা, কোনোরকম চলতি কাঠামোতে জীবন না কাটানো এই মানুষটি একসময় নিজেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন পৃথিবী থেকে! তিনি চান্তাল আকেরমান (৬ জুন ১৯৫০—৫ অক্টোবর ২০১৫)। বেলজিয়ান মাস্টার ফিল্মমেকার। তাঁর ২০১ মিনিট সময়ব্যাপ্তির ফিচার ফিল্ম ‘জ্যান দিলমাঁ, ২৩ কমার্স কুই, ১০৮০ ব্রাসেলসকে (সংক্ষেপে, ‘জ্যেন ডেলমাঁ’) ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকা অভিহিত করেছে ‘সিনেমার ইতিহাসে নারীসংক্রান্ত প্রথম মাস্টারপিস’ হিসেবে। ২০১০ সালের কোনো একসময়, আমেরিকান অনলাইন নিউজপেপার ‘দ্য এ.ভি. ক্লাব’-এর পক্ষে তাঁর এই সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন—

স্যাম অ্যাডামস

স্যাম অ্যাডামস : আলাপ শুরু করতে চাই ‘পিয়েরো লা ফু’ (জ্যঁ-লুক গোদার; ১৯৬৫) নিয়ে। সিনেমাটি আপনি ১৫ বছর বয়সে দেখেছিলেন...

চান্তাল আকেরমান : ওহ, এ কথা আমি হাজারবার বলেছি। বাদ দিন তো! এ কথা আপনারা তো জানেনই। এই গল্প আমি লাখোবার বলেছি। আর, এখন আমি গোদারের ওপর খুবই ক্ষুব্ধ। এ বিষয়টি নিয়ে আর ভাবতেও চাই না। কারণ তিনি দিনে দিনে একটা ফালতু লোক হয়ে উঠেছেন।  (একদা) তিনি আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন, আচ্ছা ঠিক আছে!

 

স্যাম : এই গল্পটিকে যদি এড়িয়ে যাই, তাহলে বলুন, কোন জিনিসটি আপনার মনে ফিল্মমেকার হওয়ার বাসনা তৈরি করেছিল?

চান্তাল : হ্যাঁ, হ্যাঁ। গোদারই। ‘পিয়েরো লা ফু’-ই। তবে ব্যাপারটি খুবই সিম্পল। অল্প বয়সে আমি সিনেমার প্রতি আগ্রহী ছিলাম না। এর সঙ্গে ব্রাসেলসও সম্পৃক্ত। (বেলজিয়ামের এই রাজধানী শহরে) বেশিরভাগ সিনেমাই ছিল নিষিদ্ধ। কোনো ইন্টারেস্টিং জিনিস দেখতে হলে বয়স ১৬ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হতো। ফলে এর আগে যা কিছু আমি দেখেছি সেগুলোর সবই ছিল আমেরিকান আবর্জনা। কী পরিচয় যে দেব এগুলোর, বুঝে উঠতে পারছি না। এই ধরুন যুদ্ধবিগ্রহের সিনেমা, ‘দ্য গানস অব ন্যাভারন’ (জে. লি থম্পসন; ১৯৬১), ‘দ্য টেন কমান্ডমেন্টস’ (সিসিল বি. ডিমিল; ১৯৫৪)। আমরা তখন স্রেফ চুমু ও আইসক্রিম খেতেই সিনেমা হলে যেতাম; সিনেমা দেখাটা প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল না। তবে সিনেমার প্রতি আমার টান ছিল না। বরং সাহিত্যের প্রতিই বেশি আগ্রহী ছিলাম। আমি লেখক হতে চেয়েছিলাম। এরপর একদিন যখন গোদারের ‘পিয়েরো লা ফু’ দেখলাম, মনে হলো, এটি তো আর্ট; সিনেমার মাধ্যমে তো নিজেকে প্রকাশ করা সম্ভব। বলছি ১৯৬৫ সালের কথা। মনে হতো লাগল, সময় বদলে যাচ্ছে। স্বাধীনতা ও কবিতা, এবং ভালোবাসা অন্য তরিকা—পুরো বিষয়টির সত্যিকার অর্থেই প্রতিনিধিত্ব করছিলেন গোদার। ফলে সেদিন একটা পুঁচকে মেয়ে হিসেবে সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে আমি নিজেকে বললাম, ‘আমিও সিনেমা বানাতে চাই।’ এই তো!

 

স্যাম : অনেকেই নিজের বেড়ে ওঠার জায়গাটি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য শিল্পকর্ম করে। অথচ আপনার অনেক সিনেমাতেই দেখা মেলে ভ্রমণের, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটি...

চান্তাল : আপনি ‘যাযাবরবৃত্তি’র কথা বলছেন। দেখুন, আমি একজন ইহুদি। এই তো! ফলে আমি সবসময়ই নির্বাসনে থাকি। যেখানেই আমরা যাই না কেন, সেখানেই কিন্তু নির্বাসিত। 

স্যাম : সেই ১৫ বছর বয়সেও এই বোধটি আপনার ভেতর ছিল?

চান্তাল : নিজেকে কখনোই এর (ইহুদি সম্প্রদায়ের) অংশ হিসেবে অনুভব করিনি আমি। যখন স্কুলে পড়তাম, প্রথমে একটি ইহুদি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। তখন আমি একদমই শিশু। কিন্তু যখন আমার ১২ বছর বয়স, তারা আমাকে এমন একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন—যেটিতে প্রচুর রেওয়াজ ছিল। সেখানকার লোকজন ছিলেন শিক্ষিত মানুষ। তারা গ্রিস, পার্থেনন—আরো কীসব বিষয় নিয়ে যেন কথা বলতেন। বাকি সব শিশু, সব বালিকা ইতোমধ্যেই নিজ পরিবার থেকেই এসব দেখে ফেলেছিল ও জেনে ফেলেছিল; অথচ আমি ভাবতাম, ‘কী নিয়ে কথা বলছ তোমরা? এটি কী বস্তু!’ এ তো আমার দুনিয়া নয়।

 

স্যাম : তাদের পরিবার কি ধনী ছিল?

চান্তাল : আমার পরিবার ছিল গরিব। যখন আমার ১২ বছর বয়স, ততদিনে আমরা আর অতটা গরিব ছিলাম না; মধ্যবিত্ত হয়ে উঠেছিলাম। আমার দাদা-দাদী খুবই শিক্ষিত মানুষ ছিলেন, তবে তা ইহুদি রেওয়াজ মতে। ধর্মগ্রন্থের সবকিছুই জানা ছিল তাদের। তারপর তারা পোল্যান্ড থেকে ব্রাসেলসে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন; সবকিছুই খোয়াতে হয়েছিল তাদের। ১২ বছর বয়সে আমার বাবাকে উপার্জন শুরু করতে হয়। তিনি কাপড় কাটতেন। স্কুলের পরিচালক আমার দাদার সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, ‘আপনার একটিই ছেলে, সে মেধাবী, অথচ শ্রমিক হচ্ছে?’ দাদা জবাব দিয়েছিলেন, ‘আর কোনো রাস্তা নেই। আমাদের বাঁচতে হবে তো?’ তার মানে, আমার বাবার দিক থেকে পরিবারটি ছিল ধনী ও উচ্চশিক্ষিত। আমার সব ফুফুই পিয়ানো বাজানো শিখেছিলেন; বুঝতেই পারছেন? আমার বাবা ছিলেন শ্রমিক। পুরো শহরে তার মতো দ্রুত কেউ কাপড় কাটতে পারত না। ১৮ বছর বয়সে নিজের একটা কারখানা দিয়েছিলেন তিনি। (পরিবারের) সবার খরচ তিনিই বহন করতেন। ফলে পরিবারে তিনি পিয়ানো বাজানোসহ অন্যান্য রেওয়াজ চালু করলেন; কেননা, অতীতে তারা এভাবেই শিক্ষিত হতেন। কিন্তু নিজে কোনো কিছু শেখার মতো সময় ছিল না তার। তিনি পড়তে জানতেন ঠিকই, কিন্তু নিজের নাম যেভাবে স্বাক্ষর করতেন— দেখলেই বোঝা যায় তিনি লেখায় অভ্যস্ত ছিলেন না।

তার মানে, আমি ইহুদি স্কুলটিতে পড়তাম।... খুবই ভালো ছিলাম; ক্লাসে ফার্স্ট হতাম। কিন্তু তখন আমার দাদা মারা যান। দাদা খুব ধার্মিক ছিলেন। বাবা বললেন, ‘আচ্ছা, ইহুদি স্কুলে যথেষ্ট পড়া হয়েছে তোমার।’ তিনি আমাকে একটা পাবলিক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুমি যেহেতু ক্লাসে ফার্স্ট হও, তার মানে আগের স্কুলটা খারাপ!’ এ রকমই কৌতুক করতেন তিনি। হাইস্কুলটিতেও আমি খুব ভালো করছিলাম। স্কুলের পরিচালক আমার মাকে বললেন, ‘সে খুবই ভালো ছাত্রী; তবে তাকে (ধর্মীয়ভাবে) শিক্ষিত হতে হবে।’ ফলে তারা আমাকে সেই ফালতু স্কুলটিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সেখানে এক মাস যাওয়ার পর তারা আমার মাকে জানালেন, আমি নাকি সহ্যের অতীত! কারণ স্কুলটি ভীষণ কড়া ছিল, ফলে আমি পুরোপুরিই খাবি খেলাম। খাবি খেতে খেতে উপলব্ধি করলাম, এটি আমার জায়গা নয়; এটি একটি শ্রেণিগত বিষয়। শুধু তা-ই নয়, কেননা, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ইউরোপে কিংবা বেলজিয়ামে—সম্ভবত ফ্রান্সে নয়—যখন কোনো ইহুদির টাকা হয়, তারা কোনো শ্রেণির সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না। পোল্যান্ড থেকে আসা যে ইহুদিরা জামা-কাপড় বানিয়ে টাকা কামিয়েছিল, তারা শ্রেণিবদ্ধ নয়। তারা স্রেফ উদ্ভাবক, সবল শ্রমিক।  তারা টাকা কামিয়েছিল, এবং তারা চেয়েছে তাদের সন্তানরা যেন স্কুলে যায়।

কিন্তু আমার বাবা নিজের কাজ নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলেন, আমার দিকে খেয়াল রাখার সময় পাননি। ফলে আমি আর স্কুলে গেলাম না। কিছুদিন পর থেকেই স্কুলটিকে, সেই শ্রেণিচর্চাকে, শ্রেণিগত সবকিছুকে ভীষণ ঘৃণা করতে শুরু করলাম। স্কুলে আমি প্রথম যে লেখাটি হয়েছিল, সেটিকে ‘প্রবন্ধ রচনা’ বলে। তার মানে ছোট্ট একটি গল্পের মতো করে লিখতে হবে। তারা বললেন, ‘পপুলার স্টাইল’ তাদের কাছে ফালতু লাগে। আমরা যেভাবে খাই, যেভাবে খাবার পরিবেশন করি—সেটি তাদের পছন্দ ছিল না। আপনাকে ‘এখান’ থেকে নিতে হবে, অথচ আমি নিতাম ‘ওখান’ থেকে। আমাকে তলব করা হলো। স্কুলের পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে হলো। তারা বললেন, ‘তুমি কুশিক্ষা পেয়েছ।’ এ-ই ছিল হাইস্কুলটির অবস্থা। আমি এটিকে ঘৃণা করতাম। তারা আমার চামড়া তুলে নিতে চেয়েছিলেন। ১৪ বছর বয়সে আমি লাতিন, গ্রিক ইত্যাদি ভাষা শিখতাম; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হতো না। তবে সাহিত্যের প্রতি ঘোর ছিল আমার। ঠিক সেই মুহূর্তেই গোদারকে আবিষ্কার করেছি। তারা চেয়েছিলেন স্কুলে আমি যেন একই ক্লাসে আরেক বছর থাকি; কারণ শিষ্টাচার ও শিক্ষায় আমার ফল ছিল খারাপ। ফলে আমি কোনোদিনই আর স্কুলে যাইনি।

 

স্যাম :শিষ্টাচারের ওপরও নাম্বার দেওয়া হতো?

চান্তাল :শিষ্টাচার ও শিক্ষায় ৮০ নাম্বারের মধ্যে আমি কেবল ২০ পেয়েছিলাম। ফলে আর স্কুলে যাইনি; রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছি। ক্যাফেতে ঘুরতে যেতাম, কিংবা আমার ফ্রেন্ডকে আনতে যেতাম। ঠিক ‘পোর্ট্রেট অব অ্যা ইয়ং গার্ল ইন দ্য লেট সিক্সটিজ ইন ব্রাসেলস’ সিনেমাটির মতোই; একদম ঠিক এ রকমই। আচ্ছা, আমি এসব কথা কেন বলছি? আপনি কি আমার শ্রেণি নিয়ে কথা তুলেছিলেন?

 

স্যাম : বলছিলাম, কোন জিনিসটি আপনার কাছে ফিল্মমেকিংকে প্রথম স্থানে জায়গা করে দিয়েছে?

চান্তাল : কারণ আমি লিখতে চেয়েছিলাম, এবং তারপর (‘পিয়েরে লা ফু’) দেখে বুঝতে পারলাম, সিনেমার মাধ্যমে নিজেকে আরো বেশিমাত্রায় প্রকাশ করতে পারব।... যদি শুধু লিখিই, তাহলে হয়তো আমাকে সারাটাক্ষণ একটা রুমেই আটকে থাকতে হবে, আমি কখনোই বাইরে বের হতে পারব না—এ রকম একটা পূর্বাভাসও হয়তো আমার ছিল। মনে হলো, যদি সিনেমা বানাই, তাহলে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে আমাকে, আর সেটি আমার জন্য ভালোই হবে।

 

স্যাম : লেখক হলে একটা বদ্ধ জায়গায় আটকে থাকতে হবে, এবং বেরিয়ে পড়ার কথা লেখা যাবে না—এই আতঙ্কটি আপনার ‘টুমরো উই মুভ’ ও ‘দ্য ম্যান উইথ অ্যা সুটকেস’ সিনেমায় প্রতীয়মান।

চান্তাল : কারাগারের বিষয়টিও আমার সব কাজেই ভীষণ রকম উপস্থিত... কখনো কখনো অবশ্য পুরোপুরি সরাসরি নয়। ‘দ্য ক্যাপটিভ’-এও এটি একই; ‘জ্যেন ডেলমাঁ’য়ও। এখানে সেও (কেন্দ্রীয় চরিত্র জ্যেন ডেলমাঁ) তার নিজের কারাগারে বন্দি; বেঁচে থাকার জন্য এই নিজস্ব কারাগারটি তার দরকার। এ কারণেই যখন সে শীত্কার দেয়, তখন সেটি তার কারাগার ও তার অস্তিত্বকে ধ্বংস করে ফেলে; এ কারণেই সঙ্গী লোকটিকে মেরে ফেলে সে। (আমার সিনেমায় থিম হিসেবে) ‘কারাগার’ এসেছে বন্দি শিবির থেকে; কারণ আমার মা বন্দি শিবিরে ছিলেন, এবং সেটি তার মনোজগতে সবসময়ই ছিল, আর সেটি তার কাছ থেকে আমি পেয়েছি। ধন্যবাদ!

 

স্যাম : তিনি কি এ ব্যাপারে কখনো কিছু বলেছেন?

চান্তাল : না; কখনোই না। কখনোই কিছু বলেননি তিনি। আমি এ কথা বলছি—তিনি যদি জানেন, তাহলে নির্ঘাত্ আমাকে পাগল ভাববেন। এ ব্যাপারে তিনি কখনো কিছু বলতে চান না। এ নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম আমি। তিনি জবাব দিয়েছেন, ‘দেখো, এ বিষয়টির বাইরে যে কোনো বিষয়েই তোমার জন্য আমি অনেককিছুই করতে পারি। এ নিয়ে কিছু বলতে বললে আমি পাগল হয়ে যাব।’ অথচ বাস্তব এর উল্টোটাই। মানে, তিনি একটা আস্ত পাগল, বুঝলেন!

 

স্যাম : এ কারণেই আপনি আপনার ইনস্টেলশন আর্টওয়ার্ক ‘ম্যানিয়াক সামার’-এর প্রদর্শনীর সময় গ্যালারিতে তার ডায়েরিজুড়ে দিয়েছিলেন?

চান্তাল : আসলে ডায়েরিটি, ভাবুন একবার, আমার নানীর! পোল্যান্ডের ছোট্ট গ্রামটিতে ধার্মিক লোকদের ভেতর কাটানো জীবনে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে এটি লিখেছিলেন তিনি। কী দারুণ দম ছিল তার। দেখুন, তিনি কেবল ডায়েরিই লিখতে পারতেন; কারণ তিনি ১৯২০ সালের এক নারী।

 

স্যাম : কারাগারের আইডিয়াটি, বদ্ধ জায়গার আইডিয়াটি...

চান্তাল :  একই জিনিস। ‘ডাউন দেয়ার’ সিনেমাটি আপনি দেখেছেন কি না, জানি না। এগুলো একই জিনিস।

 

স্যাম : কখনো কখনো এই ‘কারাগার’ এমনই এক জায়গা, যেখানে কেউ বাস করে; আবার প্রায় সময়ই এটি কোনো হোটেল রুম, যেখানকার বাসিন্দা নিরন্তর পাল্টে যায়।

চান্তাল : একটা রুম মানে একটা রুম, মানে একটা রুম, মানে একটা রুম... হা হা হা!

 

স্যাম : এর উল্টো রূপটি সম্ভবত ‘ফ্রম দ্য ইস্ট’-এর সেই ট্র্যাকিং শটগুলো, যেখানে ক্যামেরাটি যথার্থভাবেই কখনোই মুভ করা থামায় না।

চান্তাল : সেটিও একটি কারাগার; কেননা, আপনি যা অনুভব করেন সেটি কোনো বিস্ফোরণ নয়, বরং ধস। পুরো সিনেমাটিই একটি আচমকা ধস। দর্শক হিসেবে আপনি যখন সিনেমাটির মুখোমুখি হন এবং যখন সিনেমাটি দেখেন, তখন একটি ধস অনুভব করেন। ‘এর পরের ধসটা কখন হবে...’, এবং এ অসহনীয় ব্যাপার হলেও আপনি জানেন এটি মঙ্গলের জন্যই (ঘটেছে)। এটি মোটেও বিষাদবাদী কিছু নয়।

 

স্যাম : ‘জ্যেন ডেলমাঁ’ দেখার সময় ঠিক এই অনুভূতিটিই হয়। জ্যেন ডেলমাঁর দৈনন্দিন জীবনের টুকিটাকি কাজগুলোর পুনরাবৃত্তিটি দর্শকের বাস্তবিক শরীরের সঙ্গে একটি সংযোগ স্থাপন করে দেয়। ফলে পালিশ করার সময় জুতোটি যখন জ্যেনের হাত থেকে পড়ে যায় কিংবা চুলোয় আলুগুলো বল্কে পড়তে থাকে— তখন দর্শক একটা ঝাঁকুনি অনুভব করেন। এরকম একটি ইফেক্ট আপনি আসলে কেবল এমন দৈর্ঘ্যের একটি সিনেমাতেই অর্জন করতে পারবেন।

চান্তাল : এটি শারীরিক; কিন্তু দেখুন, যখন আমি ‘জ্যেন ডেলমাঁ’র শ্যুটিং শুরু করেছিলাম, একদম শুরুতে, তখন জানতামই না—এটি শেষ পর্যন্ত কী হতে যাচ্ছে। সবকিছু ততদিনে স্ক্রিপ্টে লেখা ছিল যদিও, তবু আমি নিশ্চিত ছিলাম। তিন-চারদিন পর, যখন প্রথম দিকের পরিকল্পনাগুলো দেখলাম, তখন উপলব্ধি করলাম, ‘হায় ঈশ্বর, এই ফিল্মটা তিন ঘণ্টা বিশ-চল্লিশ মিনিটের হয়ে যাবে; আর এটির বিকাশ ঘটবে খুবই ধীরে ধীরে।’ যেমন ধরুন, জ্যেন দ্বিতীয়বারের মতো লোকটির সঙ্গে বিছানায় যাবার পর আপনি টের পাবেন, ওদের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। যদিও শটগুলোর দৈর্ঘ্য ঠিক আগেরবারেরটির মতোই—কমও না, বেশিও না; তবু নিশ্চিতভাবেই দর্শকের অন্তঃস্থলে একটি তাড়াবোধ তৈরি হবে। এর কারণ কেবলই, ‘ওহ, সে তো টাকা দিতে ভুলে গেছে, আর হুট করেই সে বুঝতে পারছে না ঠিক কী করবে।’ এ যেন তার জীবনের শেষ পর্যায়। উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তবু এ যেন দর্শকের কর্মপাগলামি। দর্শক ঠিক এমনটাই করেন। যখন তারা থেমে যান, তারা মরে যান তখন; কেননা, তাদের তখন নিজেদের অন্তঃস্থলের এমন কিছুর মুখোমুখি হতে হয়—যেটির মুখোমুখি তারা হতে নারাজ। অন্যদিকে জ্যেনের বেলায় বিষয়টি উদ্বেগের।

আমার ধারণা, আমি যে কোনো মানুষের কথাই বলছি। জ্যেন ডেলমাঁ বিশেষ কেউ নয়। পুরুষকে দিয়েও আমি এই চরিত্রটি করাতে পারব। কাজে যাওয়া, একই কাজ করা, আর খুশি থাকা; কেননা, তার কাছে চাবি আছে, সে দরজা খোলে, আর অফিসে রয়েছে তার কাগজপত্র আর তার সেক্রেটারি। সে কল্পনা করে। তারপর কিছু একটা বদলে যায়। সেই বদলে যাওয়াকে সে আর মানতে পারে না। কেননা, পরিবর্তন খুবই বিপজ্জনক জিনিস। পরিবর্তন মানে ভয়; পরিবর্তন কারাগারকে খুলে দেয়। এ কারণেই ভীষণ গভীরভাবে নিজেকে বদলে দেওয়া খুব কঠিন কাজ।

 

স্যাম : (আপনাকে নিয়ে) সামি ফ্রের (ফরাসি অভিনেতা) ডকুমেন্টারিটি (অতর দু জ্যেন ডেলমাঁ, ২০০৪) দুর্দান্ত; বিশেষ করে দেলফিন স্যেরিগকে (জ্যেন ডেঁলমা চরিত্রের অভিনেত্রী) যখন আপনি একেবারেই সুস্পষ্টভাবে (দৃশ্য) বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। এর আগে বা পরে কখনো কোনো অভিনেতার সঙ্গে এভাবে কাজ করেছেন, নাকি এমনটা কেবল এই সুনির্দিষ্ট সিনেমাটির বেলায়ই ঘটেছে?

চান্তাল : এটি আসলেই এই সিনেমাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইশারাভাষাবিষয়ক সিনেমা এটি। রিয়েল টাইমেই এটি ঘটছে—দর্শকের মনে এমন অনুভূতি জাগানোর জন্য এই কোরিওগ্রাফিটি করা হয়েছে। অথচ এটি রিয়েল টাইম নয়; বরং পুরোটাই কোরিওগ্রাফ করা। সেই হিসেবে এটি একেবারেই সুনির্দিষ্ট একটি সিনেমা।