খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লা (র.) বাঙালি মুসলমানদের গর্ব

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৯
সর্বজন শ্রদ্ধেয় সুফী সাধক, দেশবরেণ্য সমাজসেবক, অবিভক্ত বাংলা ও আসামের শিক্ষা বিভাগের সহকারি ডিরেক্টর, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংস্কারক, প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক ও মহান সুফী সাধক আলহাজ্ব খান বাহাদুর আহছানউল্লা (রঃ) বাঙালি মুসলমানদের অহংকার এবং তাঁর কালের আলোকিত এক সূর্যস্নাত মহাপুরুষ। তিনি দীর্ঘ (১৮৭৩-১৯৬৫) আয়ুষ্কাল পেয়েছিলেন। এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ তাঁর জীবনের প্রায় পুরোটা সময় অনগ্রসর মুসলমান জাতির উন্নয়নের জন্য ব্যয় করেছেন। সুফী সাধক খান বাহাদুর আহছানউল্লা ১৮৭৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর শনিবার প্রত্যুষে সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জের নলতা মোবারকনগর গ্রামের ধার্মিক, বিত্তবান ও দানশীল মুনশী মোহাম্মদ মফিজউদ্দীনের ঘর আলোকিত করে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। তাঁর সমগ্র জীবন ছিল দৃষ্টান্তমূলক। পাঁচ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পূর্বে পাঠশালার গন্ডিতে প্রবেশের মাধ্যমে শিক্ষাজীবনে পদার্পণ করে নলতা মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়, টাকী গভর্নমেন্ট হাইস্কুল, কলিকাতার এল,এম,এস ইনস্টিটিউশনে পড়াশুনা করে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে কৃতিত্বের সাথে বর্তমান এস,এস,সি সমমানের তত্কালীন এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনি হুগলী কলেজ থেকে ১৮৯২ সালে বর্তমানে এইচ,এস,সি সমমানের তত্কালীন এফ,এ এবং কলিকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৮৯৪ সালে বি,এ পাস করেন। এরপর ১৮৯৫ সালে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে এম,এ পাস করেন। ১৮৯৬ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে সুপারনিউমারি টিচার হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। অল্প কিছুকালের মধ্যেই তিনি উচ্চতর বেতনে ফরিদপুরের অতিরিক্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৮৯৮ সালের ১ এপ্রিল খান বাহাদুর আহছানউল্লা (রঃ) বাখেরগঞ্জের ডেপুটি ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে তিনিই সর্বপ্রথম ইন্সপেক্টিং লাইন থেকে টিচিং লাইন-এর প্রভিন্সিয়াল সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত হয়ে ১৯০৪ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের হেড মাস্টার পদে নিযুক্ত হন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তাঁর কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯০৭ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের ডিভিশনাল ইন্সপেক্টর পদে উন্নীত হয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর যাবত্ চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিক্ষার প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। চট্টগ্রাম বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন তিনি ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিসে (আই,ই,এস) অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর ‘বঙ্গদেশের মোছলেম শিক্ষার সহকারি ডিরেক্টর’ হিসেবে খান বাহাদুর আহছানউল্লা (রঃ) পদোন্নতি লাভ করেন এবং ৫ বছর এ পদে সুষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে কলকাতায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তিনি কিছুদিন অবিভক্ত বাংলা ও আসামের শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টর পদে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯২৯ সালে ৫৫ বছর বয়সে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষা সংস্কারে অবদান রেখে অবসর গ্রহণের পর স্বদেশবাসীর ‘রূহানী খেদমত’ এবং সমাজসেবার ব্রত নিয়ে খান বাহাদুর আহছানউল্লা ১৯৩৫ সালের ১৫ মার্চ ‘আহ্ছানিয়া মিশন’ নামে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যার প্রধান কার্যালয় তাঁর জন্মভূমি নলতা শরীফে অবস্থিত। ‘আহ্ছানিয়া মিশন’ মূলত খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লার (রঃ) বিশ্বাস, আদর্শ এবং অন্তর্গত সৌন্দর্যের বহি:প্রকাশ। তিনি মিশনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য স্থির করেন-‘স্রষ্টার ইবাদত ও সৃষ্টের সেবা’। সেবাই ছিল তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। ১৯৬৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকাল ১০ টা ১০ মিনিটে ৯২ বছর বয়সে খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রঃ) প্রয়াত হন। প্রায় একটি শতাব্দীকালের সূর্যস্নাত মহাপুরুষ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বার বার স্মরিত ও উচ্চারিত হবেন। তাঁর বিস্তৃত কর্মময় জীবন এখন ইতিহাসের অন্তর্গত। এই দেশ এবং জাতি খান বাহাদুর আহ্ছানউল্ল¬ার (রঃ) কাছে নানাভাবে ঋণী।