কষ্টে আছে ফাইজুদ্দিন

আপডেট : ১৬ মে ২০১৯, ১৯:৫৫

নামটা ‘সাইফুদ্দিন’ হলে সেটা হয়ে যায় উত্তরপাড়ার একজনের নাম। মানুষটা একেবারেই নরমাল। লুঙ্গি পরে ঘুরে বেড়ায়। লুঙ্গিতে আবার পোয়াখানেক ময়লা। দৈনন্দিন গোসল করে কি না— এ নিয়ে তার ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যেই ঘোরতর সন্দেহ বিরাজমান। অ-ঘনিষ্ঠজনরা তো বলে সপ্তাহেও নাকি একবার গোসলের সম্মুখীন হয় না। অথচ এই ‘সাইফুদ্দিন’ নামটাকেই সংক্ষেপ করলে সেটা আর উত্তরপাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। হয়ে যায় এমন একজনের নাম, যিনি বলিউডের নায়ক। শুধু নায়ক না, কারিশমা কাপুরের বোন কারিনা কাপুরের জামাইও বটে। ‘সাইফ’। সাইফ আলী খান।

আবার নাম যদি ‘রিয়াজুুদ্দিন’ হয়, সেটা হয়ে যায় পুবপাড়ার একজনের নাম। এই লোকও খেত লেভেলের। হাটবাজারে যায় স্যান্ডো গেঞ্জি পরে। কিন্তু ‘রিয়াজুদ্দিন’ না হয়ে ‘রিয়াজ’ হলে? একদম শাবনূরের নায়কের নাম। কী সুন্দর নাচে! মিশা সওদাগর, ডিপজল প্রমুখকে কী সুন্দর কিলায়! দাগ থেকে দারুণ কিছু হলে যেমন দাগই ভালো, তেমনি নামের সংক্ষিপ্তকরণ থেকে যদি দারুণ কিছু হয় মানে নায়কের নাম বেরিয়ে আসে, তাহলে সংক্ষিপ্তকরণই তো ভালো। উহুঁ, ভালো না, একেবারে উত্তম।

উপরোক্ত চিন্তাভাবনার জন্য লেখক দায়ী নহে। কারণ, এই নায়কোচিত চিন্তাভাবনা লেখকের না। বরং ফাইজুদ্দিনের। এখানে বলে রাখা অতীব জরুরি—‘কষ্টে আছি আইজুদ্দিন’-এর সেই আইজুদ্দিনের সঙ্গে ফাইজুদ্দিনের কোনো সম্পর্ক নেই। না রক্তের, না আর্থিক লেনদেনের। ফাইজুদ্দিন নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান ইংরেজি সম্ভবত ইনস্টিটিউশন। তো ফাইজুদ্দিন মনে করে তার নামটাকে যদি কোনোমতে সংক্ষিপ্তকরণের আওতায় ফেলে ‘ফায়েজ’ বানিয়ে ফেলা যায়, তাহলে অ্যানি টাইম সে নায়কের পদমর্যাদায় ভূষিত হয়ে যেতে পারে।

এহেন ভাবনা থেকে ফাইজুদ্দিন হুট করেই ‘এলান’ দিয়ে বসে, তাকে এখন থেকে ‘ফায়েজ’ বলে ডাকতে হবে। যদি কেউ এলানের অমর্যাদা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ছোট এবং মাঝারি আকারের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক হয়ে পড়বে। ছোট আকারের শাস্তির তালিকায় থাকবে ঠুঁয়া, চিমটি, উষ্টা ইত্যাদি। আর বড় আকারের শাস্তির তালিকা থাকবে—চামড়া ছিলা ঘাউয়া কুকুর লেলিয়ে দেওয়া। যদিও গোপনসূত্রে প্রকাশ, কুকুরটা কাউকে কামড় দিতে পারে না। কারণ, দাঁত পোকায় খেয়ে ফেলেছে। কুকুরের দাঁতে ফিলিং করে, এমন দক্ষ ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না বলে ফিলিং করা যাচ্ছে না।

এলানের পরদিনই বড়রকমের মানসিক কষ্টে পতিত হতে হয় ফাইজুদ্দিনকে। আর এরই মধ্য দিয়ে সূত্রপাত হয় ‘কষ্টে আছে ফাইজুদ্দিন’ আখ্যানের। সে এক রাজকীয় সূত্রপাত। গ্রেট ওপেনিং। ফাইজুদ্দিন তার জানেমান, কলিজার আধখানের বাড়ির সামনে দিয়ে ‘রঙ্গ কইরা হাঁইট্টা’ যাচ্ছিল। আর চোখ ট্যারা করে তাকাচ্ছিল, যদি সুলতানাকে একনজর দেখা যায়। যদি কলিজাটা শীতল করা যায়। হঠাত্ সুলতানা বের হয় অন্দরমহল থেকে। সঙ্গে তার বিচ্ছু ছোটবোন আফসানা। ফাইজুদ্দিনকে দেখেই সে বলে উঠল—আরে পায়েস ভাই যে! কোথায় যাচ্ছেন পায়েস ভাই?

জানেমানের সামনে তার কনিষ্ঠ ভগ্নি ফাইজুদ্দিনের সংক্ষেপকৃত নাম ‘ফায়েজ’কে বিকৃত করে ‘পায়েস’ বলছে অথচ জানেমান এই অন্যায়ের প্রতিবাদ তো করছেই না, উল্টো হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে—এই হূদয়বিদারক দৃশ্য সহ্য করতে বড় বেগ পেতে হয়েছিল ফাইজুদ্দিনকে। বিড়বিড় করে সে তখন বলছিল—মাটি রে, তুই দুই ভাগ হ। আমি ফাল মেরে গাছে উঠে বসে থাকি। দুই ভাগ হওয়া মাটির ভেতরে না ঢুকে ফাল মেরে গাছে ওঠা কেন? এই প্রশ্নের জবাবে ফাইজুদিনের বক্তব্য—মাটির ভিতর ম্যালা গরম। বাতাস নাই তো! গাছে উঠলে বাতাসের অভাব নাই। ফলের গাছে উঠতে পারলে আরো সুবিধা।

‘ফায়েজ’ নামটা ‘পায়েস’-এ রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনার... মতান্তরে দুর্ঘটনার পর একটা প্রবাদ এসে বারবার গোঁতা মেরেছে ফাইজুদ্দিনের ঘিলুতে—ভিক্ষা চাই না, কুত্তা সামলা। মানে নাম সংক্ষেপ করে তার নায়ক সাজার দরকার নেই। পায়েস হওয়ার হাত থেকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করা জরুরি। একবুক কষ্ট নিয়ে ফাইজুদ্দিন পুনরায় এলান দেয়—ফায়েজ ডাকতে হইবো না। ফাইজুদ্দিনই ডাইকেন। কেউ কেউ এই পুনঃএলানের হেতু জানতে চাইলে সে রেগে যায়—অ্যাই মিয়া, অত কথা কন ক্যান? বেশি কথা কইলে আয়ু কইমা যায় জানেন না?

নাম-সংক্রান্ত মনোকষ্ট প্রাপ্তির পর থেকে ফাইজুদ্দিনের প্রাপ্তির খাতা আর একদিনের জন্যও শূন্য থাকেনি। একটার পর একটা কষ্ট পেয়েই গেছে, পেয়েই গেছে। কষ্ট পেয়ে পেয়ে এখন সে মোটামুটি ‘কষ্টের গোডাউন’। এবার চলুন শোনা যাক তার গোডাউন হওয়ার নেপথ্য কেচ্ছা। মানে কোন কষ্টটা কিভাবে পেল। যে কোনো কাজে বাহাদুরি প্রদর্শনের মনমানসিকতা ফাইজুদ্দিনের ছোটবেলা থেকেই ছিল, এখনো আছে। আর এই বাহাদুরি প্রদর্শন করতে গিয়ে সে অর্জন করেছে দুই বা ততোধিক কষ্ট। আপাতত একটার কথা উল্লেখ করি।

একবার ফাইজুদ্দিন বেড়াতে গেছে তার বড়ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে। ভাইয়ের সুন্দরী একটা শ্যালিকা ছিল। ববিতা নাম। তার প্রতি ফাইজুদ্দিনের ছিল ব্যাপক টান। আর এই টানেই সে ক দিন পর পর ছুটে যেত তাদের বাড়িতে। একদিনের জন্য গিয়ে তিন দিন চার দিন থেকে আসত। ববিতা পাত্তা না দিলেও গায়ে পড়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চাইত। এমন ভাব করত, যেন জীবনে এই প্রথম কোনো মেয়েকে তার ভালো লেগেছে। অথচ এলাকায় যে সুলতানা নামের একজনের পেছনে ঘুরে ঘুরে জুতার তলা ক্ষয় করে ফেলেছে—ঘুণাক্ষরেও তা বুঝতে দিত না।

ফাইজুদ্দিনকে দেখে তার ভাইয়ের শাশুড়ি মানে ববিতার মা কী রাঁধবেন কী রাঁধবেন না ভাবতে ভাবতে মোরগ জবাইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। দেশি মোরগ। বেশ তরতাজা। কিন্তু ফাজিল মোরগটা ধরা যাচ্ছিল না কোনোভাবেই। তিড়িংবিড়িং করে দৌড়াচ্ছিল পাড়াজুড়ে। এলাকার দৌড়বাজ ছেলেরা পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল দৌড়াতে দৌড়াতে। হঠাত্ ফাইজুদ্দিনের বাহাদুর সত্তা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে শিংওয়ালা গরুর মতো। সে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, মোরগটা ধরতে সে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট ব্যয় করবে।

চ্যালেঞ্জ শুনে ববিতা টিপ্পনী কাটে— হাতি-ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল। আর অমনি মোরগের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ফাইজুদ্দিন। মোরগ দৌড়ায়, সেও দৌড়ায়। দৌড়াতে দৌড়াতে যখন বোঝে পাঁচ মিনিট পার হয়ে যাচ্ছে, তখন দ্রুত ধরার জন্য একটা লাফ মারে শেয়ালের মতো। কিন্তু শুধু লাফটা শেয়ালের মতো হলে তো হবে না, বুদ্ধিটাও শেয়ালের মতোই হতে হবে। নইলে হিতে বিপরীত হওয়া ঠেকায় কে! ফাইজুদ্দিনের ‘বিপরীত’ও কেউ ঠেকাতে পারল না। সামনের একটা দাঁত ভেঙে গেল গাছের শেকড়ে বাড়ি লেগে।

দাঁতের ব্যথায় ফাইজুদ্দিনের আর মোরগ খাওয়া হয় না। খাওয়া হয় কেবল ববিতার যন্ত্রণাদায়ক খোঁচা। সেই খোঁচা আর টিটকিরির যন্ত্রণা থেকে শুভমুক্তি পাওয়ার লক্ষে ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি ছাড়লেও কষ্ট থেকে মুক্তি মেলে না। কিসের কষ্ট জানেন? বখাটের খাতায় নাম লেখানোর কষ্ট। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মেয়েদের দেখলেই সে শিস দেয়। তাকে উপস্থাপন করা হলো গ্রাম্যসালিশে। তার সোজাসাপ্টা জবানবন্দি—আমি শিস দেই নাই। দিলেও...

ফাইজুদ্দিনকে কথা শেষ করার সুযোগ দেয় না সাক্ষীরা। তারা সমস্বরে বলতে থাকে—আমরা নিজ কানে শুনছি তুই শিস দিছস। খালি আমরা না, তোর সাথে যারা ছিল, যাদের সাথে তুই কথা বলতেছিলি, তারাও শুনছে। তাগোরে কমু ‘সাক্ষী’ দিতে? ফাইজুদ্দিন এবার বুঝতে পারে সমস্যাটা কোথায়। তাই সে গলার স্বর চড়িয়ে বলে—আপনেরা যেইটারে শিস বলতাছেন, সেইটা শিস না। মোরগ ধরতে গিয়া দাঁত ভাইঙ্গা ফেলছিলাম তো! এখন কথা বলার সময় এই দাঁতের ফাঁকা দিয়া বাতাস বাইর হইয়া শিসের উত্পন্ন করে। এইখানে আমার কী দোষ? দোষ করলে করছে আমার দাঁতে।

দাঁত-সংক্রান্ত কষ্ট এখানেই শেষ না। ফাইজুদ্দিনের এই কষ্ট সবচেয়ে বেশি উথলে ওঠে লোডশেডিংয়ের রাতে। কারণ, লোডশেডিংয়ের সময় সে বাড়ির সবার গালি খায়। কেন খায়, এই প্রশ্নের উত্তর সোজাসুজি না দিয়ে একটা ঘটনার মাধ্যমে দিই। একরাতে বিদ্যুত্ গিয়ে যখন আর ফিরছিল না, তখন মোমবাতি জ্বালিয়ে বাড়ির সবাই খেতে বসে। তো খাওয়া শুরুর আগেই ঘটে যায় অঘটন। গল্পরত ফাইজুদ্দিনের ভাঙা দাঁতের ফাঁক দিয়ে ফুড়ুত করে বাতাস বের হয়ে মোমবাতি নিভে বিনাশ। অতঃপর সম্মিলিত গালি। গায়ে হাত দেওয়াটা বাকি খালি।

দাঁত-সংক্রান্ত কষ্টের কথায় সমাপ্তি টেনে চলে যাওয়া যাক দাদ-সংক্রান্ত কষ্ট প্রসঙ্গে। দাদ বোঝেন তো? দাউদ। মানে এক কিসিমের চর্মরোগ। দাদটা খুব জ্বালাচ্ছে ফাইজুদ্দিনকে। দিন নেই রাত নেই চুলকানি। লুঙ্গি পরা অবস্থায় যেমন তেমন, প্যান্ট পরা অবস্থায় যা-তা। ফলে দেখা যাচ্ছে, তার একটা প্যান্টের পকেটও আস্ত নেই। এইসব পকেটে কয়েন তো রাখতেই পারে না, মোবাইল রাখলেও তটস্থ থাকতে হয়। এই বুঝি পকেটের ফুটো দিয়ে বের হয়ে পা গড়িয়ে নামতে নামতে মোবাইল চলে গেল সীমানার বাইরে।

সাধারণত দাদ বা দাউদ হয় অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতার কারণে। কিন্তু ফাইজুদ্দিনের দাদ হয়েছে আলসেমির কারণে। নিশ্চয়ই প্রশ্ন করার জন্য কোমর বাঁধা শুরু করেছেন—আলসেমির কারণে আবার দাদ হয় কিভাবে? দরকার নেই প্রশ্ন করার। বরং ঘটনা শোনেন। ফাইজুদ্দিন প্যান্ট কিনতে গেছে। কিন্তু এমন মার্কেটে গেছে, যে মার্কেটে কোনো ট্রায়াল রুম নেই। লোকজনের সামনেই পরনের প্যান্ট খুলে নতুনটা পরে ট্রাই করতে হয়। যা অত্যন্ত বিব্রতকর।

এই বিব্রতকর অবস্থা থেকে বাঁচতে সবাই সঙ্গে লুঙ্গি নিয়ে যায়। ফাইজুদ্দিন নেয়নি আলসেমি করে। কিন্তু সবার সামনে পরনের প্যান্ট খুলে নতুন প্যান্টটা পরে ট্রাই করবে, এত বেশরমও তো সে না। তাহলে উপায়? দোকানদার বলল তার কাছে নাকি একটা লুঙ্গি আছে। ফাইজুদ্দিন দিতে বলল। দিল লুঙ্গি। পরল। অনেকগুলো প্যান্ট ট্রাই করতে গিয়ে দশ মিনিটের মতো ফাইজুদ্দিনের পরনে থাকল লুঙ্গিটা। চুলকানির শুরু তখন থেকেই। এরপর এই চুলকানি যখন দাদে পরিণত হলো, ফাইজুদ্দিন হয়ে গেল আসিফ আকবর। আর গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল—এত কষ্ট মেনে নেওয়া যায় না, মেনে নেওয়া যায় না।

ফাইজুদ্দিন খুবই জানালাপাগল মানুষ। বাসে উঠুক আর ট্রেনে উঠুক, জানালার পাশে তার বসা চাইই চাই। নিন্দুকেরা বলে, সে নাকি রিকশায় উঠেও জানালা খোঁজে। তো যে মানুষটা জানালার জন্য এমন দিওয়ানা-মাস্তানা, নিজের বাড়িতে তার বিছানাটা জানালার পাশে হবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক ঘটনা কি সবসময় ঘটে রে পাগলা? ফাইজুদ্দিনের ক্ষেত্রেও ঘটেনি। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঠেলাঠেলিতে কুলিয়ে উঠতে না পেরে সে এমন বিছানা পায়, যে বিছানা জানালা থেকে হাত চারেক দূরে।

নিজের দৃষ্টিতে ফাইজুদ্দিন ব্যাপক করিতকর্মা। তার মতো লোক কেন জানালাটাকে জুতসই জায়গায় ফিট করে নিতে পারবে না? পারতেই হবে। ফাইজুদ্দিন মিস্ত্রি ডাকে। মিস্ত্রি বলে—আপনে যেইভাবে চাইতাছেন, সেইভাবে কাজ করতে গেলে ঝামেলা বাড়বো ছাড়া কমবো না। ফাইজুদ্দিন দাবড়ানি দেয় মিস্ত্রিকে—যেইভাবে কাম করতে কইছি, সেইভাবে কর। নাইলে ভাগ। এইসব টুকটাক কাম আমি নিজেই করতে পারি। তোরে ডাকছিলাম দয়া কইরা। যাতে তোর দুই-চাইর পইসা ইনকাম হয়।

মিস্ত্রি চলে যেতেই ফাইজুদ্দিন ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের করিতকর্মাত্বের প্রমাণ দেওয়ার জন্য। বাড়ির লোকজন আপত্তি করতে এলে সে ধুর ধুর করে তাড়িয়ে দেয় তাদের। একদম মনমতো ফিট করে নেয় জানালাটা। কিন্তু কে জানত তখন, এই মনমতো ফিটিং-ই তাকে মনমতো কষ্ট দেবে? এখন জানালাটা খুলতে লাগে দুজন, বন্ধ করতে লাগে দুজন। মানে একবার দ্বৈতভাবে টানো, আবার দ্বৈতভাবে ধাক্কাও। কিন্তু হতভাগা জানালার পক্ষে এমন টান আর ধাক্কা কত সহ্য করা সম্ভব? জানালা কি বোঝে—সবুরে মেওয়া ফলে?

একদিন সকালে হুলস্থুল লেগে গেল ফাইজুদ্দিনের ঘরে। কী বিষয়? কী বিষয়? খোঁজ নিয়ে জানা গেল, পাশের বাড়ির একজনকে নিয়ে জানালা খুলতে গিয়ে এত জোরে টান দিয়েছে যে, সদ্য ফিট করা জানালার একটা অংশ খুলে হাতে চলে এসেছে। আর টানের জোশ সামলাতে না পেরে একজন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে আরেকজনের ওপর। তাও সাফ জায়গায় পড়েনি। পড়েছে খাটের ওপর। দুই হাতির যৌথ হুমড়িতে খাটের পায়ার অবস্থা মুমূর্ষু।

জানালাটা দৈনিক দু বেলা ফাইজুদ্দিনকে কষ্ট দিলেও সে মুষড়ে পড়ার পক্ষে ছিল না। কারণ, তার বিশ্বাস, এই যে সকাল বিকাল জানালার সঙ্গে লড়াই করছে, এতে ঠিকঠাক ব্যায়ামটা হয়ে যাচ্ছে। খুব শিগগিরই এর সুফল সে পাবে ঋত্বিক রোশনের মতো মাসল হওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু সে মুষড়ে পড়েছে সুলতানার সাম্প্রতিক ঘোষণা শুনে। সুলতানা নাকি পরিষ্কার বলে দিয়েছে, যার বাড়িতে এইরকম জানালা আছে, আমি মইরা গেলেও তার বাড়ির বউ হইয়া যামু না। বিয়ার পরে তার সাথে জোড়া বাইন্ধা আমি জানালা খুলমু-বন্ধ করমু নাকি? আমার অত মাসলের দরকার নাই।

পরের কাঁধে বন্দুক দিয়ে শিকার করার একটা প্রবণতা ফাইজুদ্দিনের আছে। আর এই প্রবণতাও তাকে নানাভাবে কষ্ট দেয়, দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তার মোটরসাইকেলের ঘটনাটা উল্লেখ না করলেই নয়। কিছুদিন আগেও তার একটা মোটরসাইকেল ছিল। তবে বস্তুটাকে মোটরসাইকেল না বলে ‘ভাঙ্গারির মাল’ বলতেই বেশি আরাম পেত এলাকার বান্দর ছেলেপুলেরা। আর কেউ কেউ বলত, বস্তুটা জাদুঘরে না রাখলে নাকি জাতিকে দর্শনীয় বস্তু দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে।

মোটরসাইকেলটার নানামুখী বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা বৈশিষ্ট্য ছিল—যখন ইচ্ছে থামত, যখন ইচ্ছে চলতে শুরু করত। কখন থামবে আর কখন চলতে শুরু করবে, মালিক বা চালক হিসাবে ফাইজুদ্দিনের জানার কথা থাকলেও সে জানত না। জানার চেষ্টাও করত না। কী হবে এত কিছু জেনে? আর একটা মোটরসাইকেলের কি স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা থাকতে পারে না? সবসময়ই এটাকে চালকের কথামতো চলতে হবে, থামতে হবে? এটার নিজের ইচ্ছের কি কোনো দাম নেই?

ফাইজুদ্দিন মোটরসাইকেলটা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিপদে পড়ত। থেমে যেত, তারপর হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে বাড়ি আনত। একদিন আর বিপদ না, রীতিমতো মহাবিপদে পড়ে যায় সে। কারণ, মোটরসাইকেলটাকে হাঁটিয়েও আনা যাচ্ছিল না। উঠিয়ে আনার জন্য রিকশা খোঁজে। পায় না। খুঁজতে খুঁজতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। হঠাত্ প্রকৃতির ডাক আসে ফাইজুদ্দিনের। বড়টা না। ছোটটা। ডাকে সাড়া দিতে সে মোটরসাইকেল থেকে একটু দূরে যায়।

ফাইজুদ্দিন যখন ফিরবে, তখন দেখে তিন জন লোক মোটরসাইকেলটাকে ধরাধরি করে নিয়ে চলে যাচ্ছে। সে চিত্কার করতে গিয়েও থেমে যায়। কারণ, ততক্ষণে তার মধ্যে সেই প্রবণতাটা চিলিক মেরে উঠেছে। কোনটা বুঝতে পারছেন তো? আরে ওই যে পরের কাঁধে বন্দুক রেখে শিকার করার প্রবণতা। যেহেতু লোক তিনটা ফাইজুদ্দিন যেদিকে যাবে, সেদিকেই হাঁটছিল, তাই সে ঠিক করল কিছু না বলে পেছন পেছন যাবে। তারপর সময়মতো লোক ডাকবে, ধাওয়া করবে। তার জিনিস সে নিয়ে চলে আসবে। লোক তিনটার কাঁধে চড়ে মোটরসাইকেলটা যদি এক কিলোমিটার পথও এগোতে পারে, মন্দ কী?

লোকগুলো এগোচ্ছে, ফাইজুদ্দিনও এগোচ্ছে। রিকশা ভাড়া ছাড়াই মোটরসাইকেলটাকে বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে দেখে সে কী খুশি তার। কিন্তু এই খুশি কষ্টে রূপ নিল, যখন লোকগুলো একটা অপকর্ম করে বসল। অপকর্মটা হচ্ছে—তারা ব্রিজের ওপর থেকে মোটরসাইকেলটা ঝপাত্ করে ফেলে দেয় খালের থৈথৈ পানিতে।

পরদিন এলাকাজুড়ে হাসির রোল পড়ল। সবার একটাই কথা, এই বস্তু চোরেরও পছন্দ না। না হোক পছন্দ, কিন্তু ফাইজুদ্দিনের তো পছন্দ! অতএব সে লোক খুঁজতে লাগল খাল থেকে মোটরসাইকেলটা তোলার জন্য। পাওয়া গেল লোক। কিন্তু তারা যে পারিশ্রমিক দাবি করল, তাতে তার মনোকষ্ট দ্বিগুণ হয়ে গেল। সেইসঙ্গে উত্তেজনাও। সে মুখ তিতে করে বলতে লাগল—ওই বেটারা, খাল থেইকা মোটরসাইকেল তোলার মজুরি তোরা এক হাজার টেকা ক্যামনে চাস? এই মোটরসাইকেলের দাম কত?

ফাইজুদ্দিন দামটা তখন প্রকাশ না করলেও পরে জানা যায়, ইতিপূর্বে তিন বা ততোধিক বার বিক্রির চেষ্টাকালে বস্তুটার দাম নাকি কোনোভাবেই আট শ টাকার ওপরে ওঠেনি। আট শ টাকার জিনিস উদ্ধারের পারিশ্রমিক হাজার টাকা? দেশটা মগের মুল্লুক নাকি!