যমজ তোফা-তহুরার নূতন জীবন

আপডেট : ১৬ মে ২০১৯, ২১:২৬

শরীর জোড়াবদ্ধ যমজ শিশু তোফা ও তহুরার মা শাহিদা বেগম কোনোদিন চিন্তাও করিতে পারেন নাই তাহার মেয়েরা একদিন আলাদা শরীর নিয়া হাঁটিতে পারিবে। অথচ প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় ও কল্যাণে তাহাই হইয়াছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কোমর জোড়াবদ্ধ অবস্থায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাশদহ গ্রামে হতদরিদ্র পরিবারে যমজ শিশু তোফা ও তহুরার জন্ম হয়। মিড়িয়ায় বিষয়টি প্রচার হইলে প্রধানমন্ত্রীর নজর কাড়ে। অক্টোবর মাসে তাহাদের প্রথম অস্ত্রোপচার হয়। জোড়াবদ্ধ শিশুদের প্রথম অস্ত্রোপচার চিকিত্সকদের জন্য ছিল চ্যালেঞ্জ । ২০১৭ সালের আগস্টে তাহাদের শরীর আলাদা করিতে পুনরায় অস্ত্রোপচার করিতে হয়। তাহার পরেও শরীরের নানা জটিলতা নিরসনে আরও কয়েক দফা অস্ত্রোপচার  করা হয়। তিন বত্সরকাল হাসপাতালে অবস্থানের পরে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাড়িতে ফিরিয়া আসে তোফা-তহুরা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাহাদের পিতা হতদরিদ্র রাজু মিয়াকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরী দিয়াছে।  জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তোফা-তহুরার জন্য একটি টিনশেড বাড়িও নির্মিত হইয়াছে। তাহাদেরকে সেই বাড়িও বুঝাইয়া দেওয়া হইল।

তোফা ও তহুরার শরীর আলাদা করা, তাহাদের বাবাকে চাকুরী প্রদান ও বাড়ি নির্মাণ করিয়া দিবার এই ঘটনাগুলিকে সহজেই বিভিন্ন মহলের মহানুভবতার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়; কিন্তু তাহার অতিরিক্ত যে পরিতৃপ্তি আমরা বোধ করিতে পারি তাহা হইল, আমাদের চিকিত্সাবিদ্যা অনেকদূর আগাইয়াছে। চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় যমজদের শরীর জোড়াবদ্ধ থাকিলে তাহাকে বলা হয় ‘পাইগোপেগাস’। বাংলাদেশে ‘পাইগোপেগাস’ শিশু আলাদা করিবার ঘটনা ইহাই প্রথম। তোফা ও তহুরার শরীরে সফলভাবে অস্ত্রোপচার করিয়াছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের চিকিত্সকেরা। অস্ত্রোপচার করিয়া দুইজনের শরীর আলাদা করা, পেটে অস্ত্রোপচার করিয়া আলাদা পায়খানা ও মাসিকের রাস্তা তৈরিসহ মোট চারবার অস্ত্রোপচার করা হয়। তোফা-তহুরা বাংলাদেশের সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি সাফল্য বলিতে হয়। তোফা-তহুরার ঘটনা প্রমাণ করিল, চিকিত্সকদের উপর আস্থা রাখিলে বিশ্বমানের সেবা বাংলাদেশেও সম্ভব। স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়া নেতিবাচক খবরে যখন মিডিয়া সয়লাব, উন্নত চিকিত্সার্থে মানুষ পাগলের মতো যখন ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে ছুটিতেছে, ঠিক তখনই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ জীবন রক্ষাকারী চিকিত্সা লইতে বাংলাদেশেও আসিতেছে। বাংলাদেশের ডাক্তারদের কাছেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলি হইতে রোগীরা আসিতেছেন ক্রনিক হেপাটাইটিসের চিকিত্সা লইতে।

বাংলাদেশের মানুষের গড়আয়ুু বাড়িতেছে। গড় আয়ুু এখন ৭০ বত্সর ছাড়াইয়া গিয়াছে, ২০০৯ সালে গড় আয়ুু ছিল ৬৭.২ বত্সর। মা ও শিশুমৃত্যু হার কমাইতেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হইয়াছে। বাংলাদেশ মা ও নবজাতকের টিটেনাস সংক্রমণ নির্মূলে সাফল্যের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করিয়াছে। অথচ মাত্র এক দশক আগেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছয়টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যু হার ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই সকল সাফল্য গাথার পাশাপাশি ইহাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, তোফা-তহুরার মায়ের মতো প্রতি ১০০ জন গর্ভবতীর ৬২ জনের সন্তান প্রসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে না হইয়া নিজ বাড়িতে হইতেছে এবং তাহার মতো প্রতি ১০০ জন গর্ভবতীর মাঝে ৭৪ জনই গর্ভকালীন ন্যূনতম ৪ বার চিকিত্সকের চেকআপে যান না। সর্বোপরি, যন্ত্রপাতির অভাব, বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের অপ্রতুলতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, দুর্নীতি, অনিয়ম ও অনাচার স্বাস্থ্যখাতকে বেসামাল করিয়া রাখিয়াছে। তাই আত্মশ্লাঘায় ভুগিবার সুযোগ নাই। স্বাস্থ্যখাতকে উন্নত ও জনবান্ধব করিয়া তুলিতে আমাদের আরও বহুদূর পথ অতিক্রম করিতে হইবে।