চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ত:-কোন্দলের আগুনে পুড়ছে ছাত্রলীগ। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সাথে শিবিরের আঁতাতের খবরে ক্যাম্পাসে সংকটে পড়েছে ছাত্রলীগ। এ কারণে নতুন নেতৃত্বের দাবি করেছে নেতা-কর্মীরা। সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের পরপরই গ্রুপিং, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠতে থাকে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। এ সময় আন্ত:কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে তারা। সভাপতি মামুনুল হক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পিযূষ কান্তি বর্মণের বিরুদ্ধে শিবিরের সাথে আঁতাতের অভিযোগ আনে নেতা-কর্মীরা। আভ্যন্তরীণ গ্রুপিং : বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ একাধিক গ্রুপে বিভক্ত। এসব গ্রুপের মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সহ-সভাপতি অমিত কুমার বসু সমর্থিত গ্রুপ সিএফসি। সিনিয়র সহ-সভাপতি আবুল মনসূর ও যুগ্ম সম্পাদক সুমন মামুনের নেতৃত্বে রয়েছে একটি গ্রুপ। সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফের নেতৃত্বে রয়েছে ভিএক্স গ্রুপ। এছাড়া সাধারণ সম্পাদক খালেদের নেতৃত্বে ১নং গেট গ্রুপ, সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর টিপুর নেতৃত্বে রয়েছে সিক্সটি নাইন এবং যুগ্ম সম্পাদক তানজীমের নেতৃত্বে রয়েছে একাকার গ্রুপ। গ্রুপগুলোর মাঝে গত দুই বছরে ৫০ বারেরও বেশি সংঘর্ষ হয়েছে। এসব সংঘর্ষে আহত হয়েছে শতাধিক নেতা-কর্মী। সর্বশেষ শনিবার ভিএক্স গ্রুপ ও সিক্সটি নাইন গ্রুপের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে ৮ নেতা-কর্মী আহত হয়। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের আট নেতা-কর্মীকে অভিযুক্ত করে একে অন্যের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এর আগে ১৪ মে সভাপতি মামুন ও সহ-সভাপতি অমিত কুমার বসুর নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ছাত্রলীগের দুই কর্মী আহত হয়। ২৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সভাপতি মামুন গ্রুপের সাথে সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর টিপুর গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে ৫ ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী আহত হয়।
নিয়োগ বাণিজ্য
নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের সভাপতি মামুনুল হক ও সাধারণ সম্পাদক এম খালেদসহ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে এ বাণিজ্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমপ্রতি এক শিক্ষক নিয়োগে ছাত্রলীগের দুই নেতার টাকা নিয়ে ভাগাভাগির ঘটনা প্রকাশ পায়। ছাত্রলীগের একটি ঘনিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি হওয়ার পর থেকেই নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন কয়েকজন নেতা। বিভিন্ন বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিয়োগে চাপ দেন বলে জানা গেছে।
সাংগঠনিক সম্পাদকের শিবিরের সাথে আঁঁতাত
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক পিযূষ কান্তি বর্মণের সাথে শিবিরের আঁঁতাতের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে একটি মোবাইলে রেকর্ডিংয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। রেকর্ডিংয়ে এ নেতা ৮ ফেব্রুয়ারি শিবিরের সাথে সংঘর্ষের ঘটনার বিভিন্ন বিবরণ দেয় এবং আঁতাত করে। অভিযোগের ভিত্তিতে এরই মধ্যে কেন্দি য় কমিটি তদন্ত শুরু করেছে বলে ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়ে পিযূষ কান্তি বর্মণ বলেন, আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ মিথ্যা। আমার সাথে শিবিরের কোন সংলাপ নয়। সভাপতি মামুনুল হক বলেন, কোন ছাত্রলীগ নেতার শিবিরের সাথে আঁঁতাতের সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
চাঁদাবাজি : শুধু নিয়োগ বাণিজ্যই নয় কমিটি গঠনের পর চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। ২০ এপ্রিল চাঁদার দাবিতে নির্মাণাধীন শেখ হাসিনা হলের কাজ বন্ধ করে দেয় তারা। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহজাহান চৌধুরীর কাছে মোট কাজের ৩ শতাংশ চাঁদা দাবি করে সভাপতি মামুনুল হক ও সাধারণ সম্পাদক এমএ খালেদ চৌধুরীসহ কয়েকজন নেতা। শাহজাহান চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ছাত্রলীগ নেতারা ক্যাম্পাসে এসে কাজ বন্ধ করে দেয়। এছাড়া ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সময়ে এসব চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা মারধর করে। সর্বশেষ গত মাসের মাঝামাঝিতে জিয়া নামের এক দোকানদারকে মারধর করে ছাত্রলীগ কর্মী মিজানুর রহমান মিনু।
নতুন কমিটির দাবি নেতা-কর্মীদের
এদিকে ছাত্রলীগ সভাপতি মামুনুল হককে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে নতুন কমিটির দাবি জানিয়েছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সম্প্রতি এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করে তারা। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি মামুনুল হকের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য ও মৌলবাদ বিরোধী কর্মকাণ্ডে প্রশ্নবোধক ভূমিকা, নতুন কমিটির দাবিসহ ৬টি অভিযোগ আনে নেতা-কর্মীরা। ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক খালেদকে বিবাহিত উল্লেখ করে এ সময় তারা বলেন, তিনি ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক কাজে সময় দিতে পারছেন না। সংগঠনের কেন্দি য় কমিটিকে নতুন কমিটি দেয়ার আহবান জানিয়ে তারা বলেন, বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির প্রায় ৫০ জনেরই ছাত্রত্ব নেই। সার্বিক বিষয়ে সহ-সভাপতি অমিত কুমার বসু বলেন, সংগঠনে ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকে। যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে এ সংকট হয়েছে বলেও তিনি জানান।
এসব বিষয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি মামুনুল হক বলেন, আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অসত্য। ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য কয়েকজন এসব অভিযোগ তুলছে। কেন্দি য় সংসদ নতুন কমিটি দিলে আমি স্বাগত জানাব। সাধারণ সম্পাদক এমএ খালেদ বলেন, ছাত্রলীগের কেউ চাঁদাবাজির ঘটনার সাথে জড়িত নয়। এ অভিযোগ অসত্য। কেউ ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে এসব কাজ করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
