অতি প্রাচীন কাল থেকেই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে চিঠিপত্র ছিল মানুষের অন্যতম হাতিয়ার। যখন ডাকঘর ছিল না তখন মানুষ পোষা পাখি বা প্রাণী অর্থাত্ কবুতরের মাধ্যমে চিঠিপত্র আদান প্রদান করতো। ইংল্যান্ডে ১৬৬০ সালে সরকারিভাবে জেনারেল পোস্টঅফিস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে কলকাতায় ১৮৬৮ সালে জেনারেল পোস্টঅফিস চালু হয়। ১৮৪০ সালে ডাকটিকিট প্রচলন হয় ইংল্যান্ডে। আগাম ডাক মাশুল দেওয়ার জন্য ছোট ছোট কাগজ ছাপিয়ে চিঠির খামে ব্যবহার করার রীতি প্রবর্তন করেন রোনাল্ড হিল নামের একজন ইংরেজ ভদ্রলোক। মহারানী ভিক্টোরিয়ার ছবি ছিল সেই ডাকটিকিটে। মোবাইল ফোন, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট, ই-মেইল ইত্যাদি প্রচলন হওয়ার পূর্বপর্যন্ত নিয়মিত চিঠি লেখা হতো। দৈনন্দিন কাজ-কর্মের মধ্যেও মানুষ সারাক্ষণ অপেক্ষা করতো কখন পোস্টম্যান চিঠি নিয়ে হাজির হবে। পল্লীজননী ছেলে কাজের সন্ধানে শহরে গিয়েছে সেই খবরটি পেতে অপেক্ষা করতেন চিঠির জন্য। চিঠি এলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন— তাঁর আদরের দুলাল ঠিকভাবে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেছে। শহরে বন্দরে এখন উপজেলা সদরের গ্রামগুলোতে ডাকপিয়ন বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিঠিপত্র, মানিঅর্ডার ইত্যাদি বিলি-বণ্টন করেন। এককালে গ্রাম-গঞ্জে সাপ্তাহিক হাটবারের দিনে চিঠিপত্র বিলি করা হতো। এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ রেওয়াজের প্রচলন আছে। কোনো কোনো পোস্টঅফিসের নিজস্ব ভবন পর্যন্ত নেই। অতি কষ্টে মানিঅর্ডার, পার্সেল, চিঠিপত্র বিলি-বণ্টন করা হয়। তখন প্রতি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে একটি মাত্র ব্রাঞ্চ পোস্টঅফিস ছিল। দল বেঁধে মানুষ চিঠিপত্র নেওয়ার জন্য হাটবারে আসতো। হাটে এসে দেখা যেতো যেখানে পোস্টঅফিস আছে সেখানে পিয়ন কিংবা পোস্টমাস্টার নেই। তিনি দূরে একটি বিছানা পেতে বা কোনো দোকানঘরের কোণে টেবিলে বসে আছেন। তখন গ্রামভিত্তিক চিঠিপত্র ভাগ করে রাখা হতো। সেই ভাগ থেকে মানুষ নিজ নিজ গ্রামের চিঠি নিয়ে যেতো।
৮০-৯০-এর দশকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ফলে পোস্টঅফিসের মান কিছুটা উন্নত হয়েছে। বর্তমানে মোবাইল ফোনের অবাধ প্রচলনের ফলে ব্যক্তিগত চিঠিপত্র লেখার অভ্যাস মানুষ প্রায় ভুলেই গেছে। শুধু দাপ্তরিক চিঠিপত্র ছাড়া এখন আর কোনো চিঠি তেমন লেখা হয় না। বর্তমানে প্রতি সেকেন্ড, মিনিট এবং ঘণ্টায় কী হয়, মানুষ তার খোঁজ-খবর রাখে। এক সপ্তাহ, দু’সপ্তাহ পর খবর পাবে এইজন্য কেউ অপেক্ষায় বসে থাকে না এবং চিঠিপত্রও লেখে না। গ্রামের মানুষ এককালে এ বাড়ি থেকে সে বাড়িতে যেতো চিঠি লেখা এবং পড়ার জন্য। এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। ব্যক্তিগত চিঠিপত্র লেখা মানুষ এখন বোঝা মনে করে। এখন বলতে শোনা যায়— মোবাইল ফোনে বা ফোনে সবকিছু বলে দে, চিঠি লিখে সময় নষ্ট করার দরকার নাই।
চিঠি লেখার রীতি আমাদের সংস্কৃতির একটি অংশ। কাগজ আবিষ্কারের আগে মানুষ গাছের পাতায়, গাছের ছালে, চামড়ায়, ধাতব পাত্রে লিখতো। অনেকের ধারণা পাতায় লিখতো বলে এর নামকরণ করা হয়েছে পত্র। চিঠি সাহিত্যেরও একটি অংশ। মানব মনের ভাবাবেগ অন্যের কাছে সুন্দর এবং নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় চিঠির মাধ্যমে। চিঠির মাধ্যমে মানুষের শিক্ষা-দীক্ষা, রুচি এবং ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। একটি জাতির সংস্কৃতি অন্য জাতির কাছে তুলে ধরা যায় চিঠির মাধ্যমে। সুলিখিত চিঠি উন্নত সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত। যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’।
‘চিঠি’ এই শব্দটি শুনলে পাঠকের মন হঠাত্ করে চমকে ওঠে। চিঠির সাহায্যে যেভাবে ভাবের আদান-প্রদান করা যায় অন্য কিছু দিয়ে তা পূরণ করা সম্ভব নয় বলে চিঠির গুরুত্ব ও তাত্পর্য সর্বজনবিদিত। লেখক চিঠিতে নিজেকে উজাড় করে উপস্থাপন করে আর পাঠক তা অনুভব করে। মনের এমন কিছু কথা থাকে যা শুধু চিঠির মাধ্যমে বলা যায়। অন্য কোনো কিছুর মাধ্যমে বলতে তেমন স্বাচ্ছন্দবোধ হয় না। যেমন অনেকে বলে এবং লেখে— “তোমার চিঠির প্রথম পৃষ্ঠায় লিখে দিলাম আলপনা, আমার ছবি কইবে কথা যখন আমি থাকব না।” এসব রস আমরা খুঁজে পাই চিঠির মধ্যে।
চিঠি প্রাচীন কাল থেকে মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে। মিল-মহব্বত, আদর-আপ্যায়ন এবং সামাজিকীকরণ এই চিঠির মধ্যেই নিহিত রয়েছে। চিঠি লিখে আমরা যে আত্মতৃপ্তি পাই অন্য কোনো মাধ্যম দিয়ে কথা বলে তেমন পাই না। হাজার বছরের সংস্কৃতি আমরা চিঠির মাধ্যমে লালন করতে পারি। ব্যক্তি-জাতি-গোষ্ঠীর চিন্তা, মনন চিঠির মধ্যে লুকিয়ে থাকে। আজ অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে সেই চিঠি বিলুপ্তির পথে। আমাদের সমাজ থেকে চিঠি যেন হারিয়ে না যায় সে দিকে সকলের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।
কুমিল্লা
