নেত্রকোনায় বড় দুই দলেই চলছে লবিং ও প্রচারণা

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫১
নেত্রকোনা জেলার ৫টি সংসদীয় আসনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ করে গ্রামেগঞ্জে বা চায়ের টেবিলে ১৪ দল আর ১৮ দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে চলছে নানামুখি আলোচনা। আর সম্ভাব্য প্রার্থীরাও মনোনয়ন লাভের জন্য দলের মধ্যে যেমন লবিং করছেন,তেমনি কেন্দ ীয় নেতাদের সাথেও যোগাযোগ রক্ষার পাশাপাশি এলাকায় সাংগঠনিক তত্পরতা শুরু করেছেন বেশ জোরেসোরেই। তারা নেতাকর্মীদের সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। সন্ধ্যায় দুটি দলের অফিসই এখন সরগরম। এদিকে বর্তমান সরকারের আমলে এলাকার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সরকারি দলের লোকজন যেখানেই সুযোগ পাচ্ছেন এলাকার উন্নয়নের কথা তুলে ধরছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীর সমর্থকরা প্রার্থীর পক্ষে গুণগান গাইছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কমবেশি সমালোচনাও করছেন। বর্তমানে নেত্রকোনার ৫টি আসনের সবকটিতেই আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলীয় জোটের এমপি রয়েছেন। বিএনপি নেতারা নেত্রকোনার সবকটি আসনে জয়লাভের জন্য ব্যাপকভাবে সাংগঠনিক তত্পরতা শুরু করলেও সেই তুলনায় আওয়ামী লীগের তত্পরতা কিছুটা কম। ইদানিং অবশ্য দলীয় নেতাকর্মীরা মাঠে নেমেছেন। এদিকে দুটি দলের মধ্যেই রয়েছে কমবেশি দলীয় কোন্দল। এই কোন্দল আওয়ামী লীগের চাইতে এবার বিএনপিতে বেশি। বিএনপির এক সম্ভাব্য প্রার্থীর লোকজন অপর প্রার্থীর বিরুদ্ধে জুতা মিছিল পর্যন্ত করিয়েছেন। দাহ করেছেন কুশপুত্তলিকা। জেলা বিএনপির প্রভাবশালী সিনিয়র কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কারের জন্য নোটিসও প্রদান করা হয়েছে। তবে নেত্রকোনায় ১৪ দলীয় জোট বা ১৮ দলীয় জোট বলতে তেমন কিছু নেইও। এখানে ১৪ বা ১৮ দলের জোটের মধ্যে মাত্র ২/৩টি ছাড়া আর কোন দল নেই। ইসলামি দলগুলোর এখানে তেমন তত্পরতা নেই। জামায়াতে ইসলামীর তত্পরতা এখানে বর্তমানে নেই। দলীয় অফিসের মধ্যেই তাদের তত্পরতা সীমাবদ্ধ। ন্যাপ, সিপিবি,বাসদ, খেলাফত ইসলামসহ অন্যান্য দলের তেমন তত্পরতা নেই। নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা):এই আসনের বর্তমান এমপি হচ্ছেন ১৪ দলীয় জোট বা মহাজোটের তরুণ নেতা মোশতাক আহমেদ রুহী। গত পাঁচ বছরে এই এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হলেও তার বড় অবদান হচ্ছে দুর্গাপুর সড়ক সংস্কার এবং বহুল আলোচিত শুকনাকুড়ি সেতু নির্মাণের কাজ শত বাধার মুখেও সমাপ্ত করা। সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার লোকের যাতায়াতের পথ সুগম হয়েছে শুকনাকুড়ি সেতু নির্মাণে। তাই এবারও তিনি এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী। এই আসনে আওয়ামী লীগের অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন, সাবেক এমপি মরহুম জালাল তালুকদারের পুত্র কুতুব উদ্দিন তালুকদার রয়েল, কৃষকলীগ কেন্দ ীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছবি বিশ্বাস, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক খান, কেন্দ ীয় যুবলীগ নেতা এরশাদুর রহমান মিন্টু, আওয়ামী লীগ নেতা এসএম ফখরুল ইসলাম ফিরোজ, যুবলীগ নেতা ওসমান গনি। এই আসনে সিপিবি থেকে এবার মনোনয়ন প্রত্যাশী সিপিবির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কমরেড মণি সিংহের পুত্র ডাঃ দিবালোক সিংহ। অপরদিকে ১৮ দলীয় জোট হতে নতুন পুরাতন অনেক নেতা মনোনয়ন পেতে তত্পর। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে জেলা-উপজেলা শহর। এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করছেন সাবেক এমপি বিএনপি নেতা এবং কলমাকান্দা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী। তিনি বেশ জোরেসোরেই নির্বাচনী সাংগঠনিক তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার জনপ্রিয়তা রয়েছে এলাকায়। এই আসনে আর একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন নেত্রকোনা জেলা ছাত্রদলের দুই দুইবারের সভাপতি এবং বর্তমানে জেলা বিএনপির সদস্য নির্যাতিত নেতা জাহাঙ্গীর আলম মাসুদ। এই আসনে বিএনপির অপর একজন শক্তিশালী প্রার্থী হচ্ছেন দুর্গাপুর উপজেলার বিএনপি নেতা সেলিম রেজা খান। বয়সে তরুণ এই সম্ভাব্য প্রার্থী তার এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে তত্পর বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের সদস্য কলমাকান্দার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী থাকলেও নিজ কেন্দ সহ সবক’টি কেন্দে ই পরাজিত হন। এই আসনে বিএনপি’র অপর প্রার্থীরা হচ্ছেন দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, অ্যাডভোকেট হামিদুর রহমান রাশেদ এবং অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াহাব। জামায়াত থেকে মনোনয়ন পেতে তত্পর কলমাকান্দা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারী হাবিবুর রহমান। এই আসন থেকে বর্তমান এলডিপি নেতা ও বিএনপি দলীয় সাবেক হুইপ এমএ করিম আব্বাসীর নির্বাচন করার কথা রয়েছে। নেত্রকোনা-২(নেত্রকোনা-বারহাট্টা):এটি নেত্রকোনার ৫টি আসনের মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আসন। কারণ এটি জেলা শহরের আসন। বর্তমানে এমপি হচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক আশরাফ আলী খান খসরু। এই আসনে আওয়ামী লীগ প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ করেছে। বিশেষ করে বড় বড় সেতু এবং কালভার্ট নির্মাণ হয়েছে বেশ কয়েকটি। ২শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলকে আধুনিক করা হয়েছে এবং আন্তঃনগর ট্রেন সার্ভিস চালু করা হয়েছে সমপ্রতি। মনোনয়ন চাইবেন বর্তমান এমপি মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী খান খসরু , এক সময়ের তুখোড় ছাত্র নেতা এবং বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তিনবারের সাবেক পৌর চেয়ারম্যান ও বর্তমান জেলা পরিষদ প্রশাসক মতিয়র রহমান খান, সাবেক পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম খান, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য লেঃ কর্নেল (অবঃ) নূর খান। তরুণদের মধ্যে মনোনয়ন চাইবেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি আরিফ খান জয় এবং নেত্রকোনা সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি নির্যাতিত ছাত্র নেতা শামসুল হক লিটন, জেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক অধ্যাপক ওমর ফারুক। জাসদ (ইনু) কেন্দ ীয় নেতা মুখলেছুর রহমান খান মুক্তাদিরও ১৪ দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন। জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে সাবেক সাংবাদিক-সাহিত্যিক ফকির আশরাফ মনোনয়ন চাইবেন। সিপিবি থেকে জেলা সিপিবির সম্পাদক খন্দকার আনিসুর রহমান সম্ভাব্য প্রার্থী। জাতীয় পার্টি (জেপি) থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আইয়ূব আলী ফনু। ইতিমধ্যে কথিত সংগঠন বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ এনে জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও কেন্দ ীয় ৫ নেতাকে বহিষ্কারের জন্য কারণ দর্শানো নোটিস দেয়া হয়েছে। এই আসনে এবার বিএনপি থেকে নতুন প্রার্থীদেরও তত্পরতা দেখা যাচ্ছে। বিএনপির সম্ভব্যা প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ উদ্দিন খান, ঢাকা বারের সম্পাদক ও কেন্দ ীয় বিএনপি নেতা এডভোকেট খোরশেদ আলম মিয়া, বিএনপির কেন্দ ীয় ও মানবাধিকার নেত্রী এডভোকেট ড. আরিফা জেসমিন, বিএনপি নেতা ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান খান রেজভি, বিশিষ্ট চিকিত্সক ও কেন্দ ীয় ড্যাব নেতা জেলা বিএনপির সদস্য প্রফেসর ডাঃ আনোয়ারুল হক, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি বিশিষ্ট চিকিত্সক দেলোয়ার হোসেন টিটু,বিএনপি নেতা আলহাজ্ব শওকত হোসেন তালুকদার, কেন্দ ীয় নেতা আব্দুল বারি ড্যানী এবং জেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সমাজ সেবক মুজিবুল হক মামুন। নেত্রকোনা-৩ আসন (কেন্দুয়া-আটপাড়া): এই আসনে বর্তমান এমপি হচ্ছেন আওয়ামী লীগের মঞ্জুর কাদের কোরাইশী । এই এলাকাতেও উন্নয়ন কাজ হয়েছে। এই আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন মঞ্জুর কাদের কোরাইশী এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ ীয় নেতা অসীম কুমার উকিল, যুব মহিলা লীগ কেন্দ ীয় কমিটির সম্পাদক অধ্যাপক অপু উকিল এমপি, কেন্দ ীয় আওয়ামী লীগ নেতা এডভোকেট আব্দুল মতিন, কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইফতেকার উদ্দিন পিন্টু, জেলা যুবলীগ নেতা ও শিল্পপতি আলহাজ্ব মনিরুজ্জামান ভুঁইয়া শামীম এবং যুবলীগ নেতা আবু সাঈদ খান। এই আসনে বিএনপিতে রয়েছে চরম কোন্দল। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন, কেন্দ ীয় বিএনপি নেতা ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী। এই আসন থেকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন, অর্থনৈতিক বিষয়ক বিশিষ্ট কলামিষ্ট হায়দার আহমেদ খান মন্টু এফসিএ, এসিআই সল্টের এমডি বিএনপি নেতা সৈয়দ আলমগীর খসরু, সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক পৌর মেয়র দেলোয়ার হোসেন ভুঁইয়া দুলাল, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা শফিক বিন হাসান সোহাগ, কেন্দ ীয় বিএনপি নেত্রী সুলতানা রাজিয়া শাওন। নেত্রকোনা-৪ (মদন মোহনগঞ্জ খালিয়াজুরী): হাওর এলাকা হিসাবে পরিচিত এই আসনে বর্তমান এমপি রয়েছেন আওয়ামী লীগের রেবেকা মমিন। এই আসনটি তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত বিশাল এলাকা। তিনটি উপজেলাতেই রয়েছে আওয়ামী লীগের কোন্দল। এবার সঠিক প্রার্থী দিতে না পারলে এই আসনটি হাতছাড়া হতে পারে আওয়ামী লীগের। এই আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন ৯০-এর গণআন্দোলনের তুখোর ছাত্রনেতা শফি আহমেদ, সমাজ সেবক ক্যাপ্টেন (অবঃ) মঞ্জুরুল হক মঞ্জু। মঞ্জু এলাকায় ব্যাপক সমাজ উন্নয়ন মূলক কাজ করে চলেছেন। এই আসনে আওয়ামী লীগের অপর দুজন সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন মোহনগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপিত শহীদ ইকবাল। এই আসনে বিগত সরকারের অর্থাত্ চার দলীয় জোটের সময় এমপি ছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামন বাবর। তিনি এখন কাশিমপুর কারাগারে। যদি তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন তবে তার স্ত্রী শ্রাবণী জামান বিএনপি থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। এছাড়া মনোনয়ন প্রত্যাশী বর্তমান পৌর মেয়র দেওয়ান মোদাচ্ছের হোসেন শফিক সিপিবির কেন্দ ীয় নেত্রী জলি তালুকদারও মনোনয়ন প্রত্যাশী। নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা): নেত্রকোনার ৫টি আসনের মধ্যে ৪টি আসন একাধিক উপজেলা নিয়ে গঠিত হলেও এই আসনটি এবার মাত্র একটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এর আগে নেত্রকোনা সদরের মৌগাতি ইউনিয়নকে এই আসনের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। আর এ কারণেই প্রার্থীদের নির্বাচনী তত্পরতা চালাতে সুবিধা বেশি হবে। এই আসনের বর্তমান এমপি হচ্ছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীরপ্রতীক। তিনি ইতিমধ্যে তার সকল ইউনিয়ন কমিটিগুলো তৃণমূল ভোটারের মাধ্যমে গঠন করে ফেলেছেন। এখন চলছে সকল ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ কমিটি নিয়ে সাংগঠনিক তত্পরতা। এই এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ হয়েছে। বেলাল এবারও মনোনয়ন প্রার্থী। এছাড়া এই আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন আওয়ামী লীগ কেদ্রীয় কমিটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন। এই আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন জেলা বিএনপির সম্পাদক আবু তাহের তালুকদার, সাবেক এমপি মরহুম মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী অধ্যক্ষ রাবেয়া আলী, উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাইদুর রহমান তালুকদার, কেন্দ ীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এ এস এম শহীদুল্লাহ ইমরান, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য ড. আব্দুল জলিল।