রাজধানীতে নাগরিক সেবার করুণ হাল

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫২
মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের সামনে থেকে প্রধান সড়ক ধরে তেজগাঁও শিল্প এলাকার দিকে এগুলে যানবাহনের যাত্রীদের হঠাত্ মনে হতে পারে গাড়ি হয়তো নর্দমায় পড়েছে। বাস্তবে সড়কের অবস্থাই এমন যে, নর্দমার সঙ্গে তফাত্ সামান্যই। দীর্ঘদিন ধরেই সড়কটির এমন দুর্দশা বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। এমন চিত্র রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায় প্রায় বছর জুড়েই। গুলশান এক নম্বর সার্কেল থেকে শ্যুটিং কমপ্লেক্স হয়ে তেজগাঁও লিংক রোডের সঙ্গে যুক্ত সড়কটিতে ওয়াসার পাইপলাইন বসাতে সেটি খোঁড়া হয়েছিল বছরখানেক আগে। এরপর খোঁড়া জায়গা ভরাট করে দেয় ওয়াসা। কিন্তু সড়কটি আজও যথাযথ চলাচল উপযোগী হয়নি। নগরীর মগবাজার মোড় ঘিরে একটি ফ্লাইওভার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যেভাবে কাজ চলছে তাতে চারদিকের কয়েক কিলোমিটার সড়ক রীতিমতো চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বেহাল সড়কের মতো আরো নানা বিষয়ে রাজধানীর মানুষের রয়েছে নানা অভিযোগ, ক্ষোভ। কিন্তু নাগরিক সুবিধার ইস্যুতে এসব অভিযোগ নিয়ে তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। সেবা-সুবিধাকে নগরবাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার কথা বলে প্রায় দুই বছর আগে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। অথচ তখন থেকেই মূলত সেবার ক্ষেত্রে এমন দৈন্য নেমে আসে। দিন দিন পরিস্থিতির অবনতিই হচ্ছে। নাগরিকদের সেবা দেয়া দূরের কথা, উল্টো নতুন করপোরেশনের ভেতরেই সৃষ্টি হয়েছে নানা সমস্যা ও জটিলতা। আজও করপোরেশন দুটির জনবল কাঠামো তৈরি করা যায়নি। অবিভক্ত করপোরেশনের জমানো সব টাকা ও এফডিআর ভেঙ্গে খরচ করে ফেলা হয়েছে। এ পর্যায়ে আর্থিক অনটনের কবলেও পড়েছে দুই করপোরেশন। ফলে সেবা-সুবিধার আরও অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গুলশান আবাসিক এলাকার ৬ নম্বর সড়কের বাসিন্দা এহছানুল হক বলেন, ‘লেকের কাছাকাছি ভাড়া বাসায় থাকি। সন্ধ্যা নামতেই মশার অত্যচারে অতিষ্ঠ হয়ে যাই। সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম আদৌ চালু আছে কিনা জানি না। সন্ধ্যার পর রাস্তার বাতিগুলোর অর্ধেকই ঠিকমতো জ্বলে না। এ কারণে গুলশানের মতো অভিজাত এলাকাতেও সন্ধ্যার পর ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছে।’ গ্রীনরোড এলাকার বাসিন্দা আবু হোরায়রা রনি জানালেন, বাচ্চার পাসপোর্ট করার জন্য জন্ম নিবন্ধন সনদের দরকার হয়। এ জন্য তিনি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে যান। কিন্তু তাকে জানানো হয় যে, সিটি করপোরেশন দুই ভাগ হওয়ার পর থেকে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কার্যালয়গুলো বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন রকম সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে করপোরেশনের জোনাল অফিস বা আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে। এরপর তিনি আজিমপুরের হাজী আব্দুল গণি কমিউনিটি সেন্টারে অবস্থিত দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৩ এর অফিসে গিয়ে জন্ম নিবন্ধন সনদের জন্য ধর্ণা দেন। সেখান থেকে এটি সংগ্রহ করতে পেরেছেন ঠিকই, কিন্তু এজন্য বেশ সময় ব্যয় করতে হয়েছে। কারণ, একটি আঞ্চলিক অফিস থেকে ১১টি ওয়ার্ডের সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করার কারণে সব রকমের সেবা প্রদানই কম-বেশি বিলম্বিত হচ্ছে। মিরপুর ১১ নম্বর বেনারশী পল্লী এলাকার বাসিন্দা আনারুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, মিরপুর ও পল্লবী এলাকার অধিকাংশ সড়ক ও লেন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলাচলের জন্য পুরোপুরি অযোগ্য। এসব রাস্তা মেরামত বা সংস্কার দূরের কথা, এগুলো দেখার জন্যও কেউ কখনো আসে না। অথচ আগে এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে এলাকার মানুষ ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছে ছুটে যেতো এবং এলাকাবাসীর চাপেই কাউন্সিলররা যতদূর সম্ভব রাস্তাগুলো চলাচলের উপযোগী রাখার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করতেন। এখন সে রকম দায়-দায়িত্ব কারো নেই। প্রসঙ্গত, রাজধানীতে নাগরিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার কথা বলে, ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে জাতীয় সংসদে একটি বিল পাসের মাধ্যমে ৪শ’ বছরের পুরনো ঢাকা মহানগরীর ব্যবস্থাপনাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নামে দুই ভাগ করা হয়। আইনটি পাস হওয়ার পরদিনই বিদায় নেন অবিভক্ত ঢাকার সর্বশেষ নির্বাচিত মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। নতুন দুই করপোরেশনের প্রশাসক পদে নিযুক্ত হন সরকারের দু’জন কর্মকর্তা। প্রথমে প্রণীত আইনে বলা হয়েছিল যে, প্রশাসক নিযুক্ত হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে; কিন্তু সে অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় পরবর্তীকালে আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচনের সময়সীমা ১৮০ দিন করা হয়। যদিও আইনী জটিলতার অজুহাতে গত পৌনে দুই বছরেও রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করা হয়নি। এছাড়া প্রথমে প্রণীত আইনে বলা হয়েছিল যে, বিভক্ত সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসাবে নিযুক্ত কর্মকর্তারা কেউই একটানা ৯০ দিনের বেশি এই দায়িত্বে থাকতে পারবেন না; কিন্তু পরবর্তীকালে আইন সংশোধন করে একজন প্রশাসকের দায়িত্বকাল সর্বোচ্চ ১৮০ দিন করা হয়। সে অনুযায়ী বিগত পৌনে ২ বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসাবে অন্তত ৬ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বর্তমানেও জনপ্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের দুই জন কর্মকর্তা দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভক্ত সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, দুই সিটি করপোরেশনের জনবল কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম এখনো ঠিক হয়নি। এই সুযোগে জনপ্রশাসন থেকে বিভিন্ন স্তরের বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা প্রেষণে দুই করপোরেশনে নিয়োগ পাচ্ছেন। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রায় প্রতিটি বিভাগই বর্তমানে প্রেষণে আসা কর্মকর্তা দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিভক্ত হওয়ার আগে তত্কালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনে যত সংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা প্রেষণে নিযুক্ত ছিলেন, বর্তমানে তার অন্তত তিনগুণ কর্মকর্তা প্রেষণে দুই করপোরেশনে নিয়োজিত রয়েছে। এসব কর্মকর্তার সঙ্গে করপোরেশনের নিজস্ব কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের নানা রকম দ্বন্দ্ব-কলহ সৃষ্টি হচ্ছে বলেও প্রচার রয়েছে। এদিকে সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করার পর নাগরিক সেবার উন্নতির পরিবর্তে ব্যাপক অবনতি হলেও কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনা থেমে নেই। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিবহন শাখার এক কর্মকর্তা জানান, দুই করপোরেশনে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার চেয়ে গাড়ির সংখ্যা এমনিতেই বেশি ছিল। তা সত্ত্বেও বিভাজনের পর কোনো প্রয়োজন ছাড়াই ডজনখানেক বিলাসবহুল জিপ কেনা হয়েছে। অভিযোগ আছে যে, এসব গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম-নীতি অনুসরণ করা হয়নি। এ পর্যায়ে আরো ১৮টি গাড়ি কেনার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে অনুমোদন নেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় প্রাধিকারপ্রাপ্ত নয়, এমন কর্মকর্তারাও দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন। অথচ নগরীতে রাস্তাঘাটের রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নয়ন ও মেরামত, মশক নিধন, সড়কের বিদ্যুতায়ন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, সড়ক আলোকিতকরণের ক্ষেত্রে ২০ বছরেও এমন দৈন্য দেখা যায়নি। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন বিভক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত ওয়ার্ড কাউন্সিলরগণ ভালমন্দ মিলিয়ে একটা ভূমিকা রেখেছেন। নগরীর কোনো এলাকায় রাস্তাঘাট বা ফুটপাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে, সড়কবাতি না থাকলে বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে তারা বিষয়টি সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দৃষ্টিতে নিয়েছেন; কিন্তু এখন তো খবর নেয়ারও কেউ নেই। এসব বিষয়ের প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক নজমুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্বে এসেছি বেশিদিন হয়নি। তবে করপোরেশনের নাগরিক সেবা ও সব ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা বছরের শুরুতেই ঠিক করা হয়। এরপর সারা বছর ধরে সেটি বাস্তবায়ন করা হয়। সুতরাং নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে উদাসীনতার অভিযোগ যথার্থ নয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, অনির্বাচিত প্রশাসক হলেও তার দরজা সব সময় নাগরিকদের জন্য খোলা থাকে। সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচিত মেয়র সাদেক হোসেন খোকা বলেন, সরকার নগরবাসীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং বিশেষজ্ঞদের প্রতিবাদের মুখে খামখেয়ালি কায়দায় ঢাকাকে দুই ভাগ করেছে। এর ফলে সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে তা আগেই অনুমান করা হয়েছিল; কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি। তা ছাড়া গত দুই বছর ধরে ঢাকায় কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। এ অবস্থায় নানা রকম সেবা ও উন্নয়নের প্রশ্নে নগরবাসী রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়েছে।