শিবগঞ্জ, গোদাগাড়ীর দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫৩
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ও রাজশাহীর গোদাগারীতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। সেখানে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত বা ভাঙ্গনের শিকার হচ্ছে। এতে ওই দুই উপজেলার কমপক্ষে দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে বর্তমানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত ত্রাণ, নেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কোন উদ্যোগ। শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, বন্যা পরিস্থিতি অবনতির ফলে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বন্ধ হয়ে গেছে এলাকার শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত। এছাড়া সর্বনাশা পদ্মার ভাঙ্গনের ফলে নিঃস্ব হচ্ছে একের পর এক পরিবার । সরজমিনে পাকা, উজিরপুর, দুর্লভপুর, মনাকষা, ছত্রাজিতপুর ও ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, পাকার ১২টি, দুর্লভপুরের ১০টি, মনকষার ১৫টিসহ প্রায় ৬০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাকার ৩ টি, দুর্লভপুরের ৩টি, মনকষার ৪টিসহ প্রায় ২০টি উচ্চ বিদ্যালয় এবং বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় ১০ টি মাদ্রাসাসহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এসব ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি গ্রামের প্রায় এক লাখ মানুষ কলা গাছের ভেলা ও বাঁশের মাচার উপর বা অন্য কোন স্থানে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাছাড়া এলাকার ছোট বড় ১৫/২০টি কালভার্ট ও কয়েক কিলোমিটার রাস্তা ভেঙ্গে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এপর্যন্ত কোন দলের কোন নেতাই বন্যা ও ভাঙ্গন কবলিত এলাকার জনগণের সাথে দেখা করেননি। হাসানপুরের সাদিকুল জানান, আমাদের গ্রামের প্রায় ১শ’ পরিবার গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। আমি বাড়ির মধ্যে বাঁশের মাচার উপর একাই আছি। তিনি আরো জানান, ‘কোন কোন এলাকা ইউএনও স্যার পরিদর্শন করেছেন। তারা সামান্য ত্রাণ পেয়েছে।’ এ ব্যাপারে পাকার চেয়ারম্যান আ. মালেক জানান, এ পর্যন্ত ৫শ পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। বর্তমানে কট্টাপাড়া গ্রামে নতুন করে ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় প্রায় ১০ টি পরিবার ভিটেমাটি ছাড়া হয়েছে এবং আগে ৭০টি পরিবার ভিটেমাটি ছাড়া হয়েছে। বর্তমানে আড়াই রশিয়া গ্রাম হুমকির মুখে রয়েছে। তিনি আরো জানান, পদ্মার পানি বর্তমানে বিপদসীমার ১৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মনকষা ইউপি চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন জানান, বর্তমানে আমার ইউনিয়নের ৫০ ভাগ মানুষই পানিবন্দি। গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, গোদাগাড়ীতে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার ৩ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হওয়ায় ২৪ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। গতকাল সকালে শিল্প প্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুক চৌধুরী চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। তবে বন্যা দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি দেখা দিয়েছে চরম খাদ্য সংকট। পর্যাপ্ত ত্রাণ না পাওয়ায় বন্যা দুর্গতরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। ক্রমেই বন্যা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় বাড়ি-ঘর ছেড়ে লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে যাচ্ছে। অনেকে উঁচু জায়গায় খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুনার রশীদ বলেন, উত্তর ভারতে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে বিভিন্ন নদীর বাঁধ খুলে দেয়ায় পদ্মায় পানি বাড়ছে। তবে আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। মধুখালীতে ৪০ বাড়ি নদীতে বিলীন মধুখালী (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, হঠাত্ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গড়াই ও মধুমতি নদীর ভাঙ্গনে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নে চরগয়েশপুর, গয়েশপুর, ফুলবাড়িয়াসহ কয়েকটি গ্রামের ৪০টি বসত বাড়ি, একটি মাদ্রাসা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কামারখালী বাজার ও বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ স্মৃতি যাদুঘর সড়কটি নদীতে বিলীন হওয়ার পথে। বিশেষ করে কামারখালীর গড়াই নদীর পাশ দিয়ে গয়েশপুর অভিমুখে প্রধান সড়কটি বিলীন হওয়ার আশংকা রয়েছে। সড়কটি রক্ষার জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যান জনগণের সহায়তায় ভাঙ্গন রোধে প্রাথমিক ব্যবস্থা নিয়েছেন। রাস্তাটির ভাঙ্গন দ্রুত রোধ করতে না পারলে এলাকার প্রায় ৩০ গ্রামের জনগণের যোগাযোগের একমাত্র পথটি বন্ধ হয়ে যাবে। মাওয়ায় পদ্মার ভাঙ্গন অব্যাহত মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শুক্রবারও মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মার ভাঙ্গন অব্যাহত ছিল। তবে গতি ছিল মন্থর। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় ৮ ফুট এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। আরো ১২ ফুট এলাকায় এদিন নতুন করে ফাটল দেখা দেয়। যে কোন সময় এই অংশও নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আরিফুর রহমান জানান, পদ্মার পানি বৃদ্ধি আরো ৩ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তবে এখনও পদ্মা বিপদসীমার ১৯ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। ভাঙ্গন রোধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।