বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিলাম অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামীকাল রবিবার। এই নিলামে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকার স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেয়া হবে চারটি মোবাইল ফোন অপারেটরকে। তবে অপারেটররা বেশি স্পেকট্রাম নিলে টাকার অংক ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর রাষ্ট্রীয় মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটককে ইতিমধ্যে যে স্পেকট্রাম দেয়া হয়েছে তার দাম ভ্যাটসহ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। টেলিটক এই নিলামে অংশ না নিলেও নিলামে ওঠা দাম তাদের পরিশোধ করতে হবে। এই নিলামের মাধ্যমে উন্মুক্ত হচ্ছে বহু প্রত্যাশিত থ্রিজি সার্ভিস। হোটেল রূপসী বাংলায় অনুষ্ঠিত হবে উন্মুক্ত এই নিলাম। এতে অংশ নেবে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেল। আর টেলিটক বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে থ্রিজি সেবা দিচ্ছে।
গত ৫ বছর ধরে থ্রিজি’র নিলাম করার চেষ্টা করে আসছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। ২০০৮ সালে গাইডলাইন তৈরির পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে এই নিলাম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা পেছাতে পেছাতে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এসে ঠেকেছে। তারপরও থ্রিজি উন্মুক্ত হওয়ায় খুশি মোবাইল ফোন অপারেটর ও গ্রাহকরা। থ্রিজিতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা মিলবে ইন্টারনেট সেবায়। এর গতি বাড়বে কয়েকগুণ।
গাইডলাইন অনুযায়ী থ্রিজির সঙ্গে ফোরজি ও এলটিই সার্ভিস দিতে পারবে মোবাইল ফোন অপারেটররা। তার জন্য এখনই তাদের স্পেকট্রাম নিতে হবে। কারণ ফোরজি ও এলটিই’র জন্য নতুন করে স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেবে না বিটিআরসি। একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় অপারেটর টেলিটকসহ ৫টি প্রতিষ্ঠানকে থ্রিজির লাইসেন্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি। কিন্তু কোন বিদেশি প্রতিষ্ঠান আসতে আগ্রহ না দেখানোয় গাইডলাইন সংশোধন করে সেই জায়গায় বর্তমানে বাংলাদেশে সেবা দেয়া অপর একটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় অপারেটর টেলিটকসহ ৬টি অপারেটর সেবা দিচ্ছে। এরমধ্যে এখন লাইসেন্স পাচ্ছে ৫টি প্রতিষ্ঠান। শুধু সিটিসেল থ্রিজির লাইসেন্স পাচ্ছে না। তারা নিলামে অংশ নিতে আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত জামানতের টাকা জমা দেয়নি। ফলে নিলামে তারা অংশ নিতে পারছে না।
থ্রিজির এই নিলামে অংশ নিচ্ছে চারটি মোবাইল ফোন অপারেটর। প্রত্যেকেই লাইসেন্স পাবে। তাহলে নিলাম কার্যত আনুষ্ঠানিকতা মাত্র— এমন প্রশ্নের জবাবে বিটিআরসি চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস বলেন, নিলামে প্রতিযোগিতা হবে। কারণ অপারেটরদের ফোরজি ও এলটিই’র জন্য এখনই স্পেকট্রাম নিতে হবে। হাতে আছে মাত্র ৪০ মেগাহার্টস স্পেকট্রাম। এখন না নিলে নতুন করে আর তাদের স্পেকট্রাম দেয়া হবে না। তাছাড়া নিলামে অপারেটরদের অন্তত একটি ডাক দিতেই হবে। তাতে প্রতি মেগাহার্জ স্পেকট্রাম ২০ মিলিয়ন ডলারের সঙ্গে অন্তত এক মিলিয়ন ডলার যোগ হবে। কারণ এক মিলিয়নের কম ডাকার কোন সুযোগ নেই। বিটিআরসি চেয়ারম্যানের মতে, গাইডলাইন অনুযায়ী সর্বনিম্ন দাম প্রতি মেগাহার্জ ২০ মিলিয়ন বা ২ কোটি ডলার ধরা হয়েছে তা একেবারে কম নয়। তাই সকলের অংশগ্রহণে নিলাম সফল হবে বলেই মনে করেন তিনি।
থ্রিজির গাইডলাইন অনুযায়ী নিলামে অংশ নিতে প্রতি মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের (তরঙ্গ) ফ্লোর প্রাইস (সর্বনিম্ন মূল্য) নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কোটি মার্কিন ডলার। আবেদনপত্র ফি ৫ লাখ টাকা। লাইসেন্স নিতে ১০ কোটি টাকা, আর বার্ষিক লাইসেন্স ফি ৫ কোটি টাকা। নিলামে বিজয়ী প্রতিষ্ঠানকে মোট তরঙ্গ ফি’র ৬০ শতাংশ ৩০ কার্যদিবস ও ৪০ শতাংশ পরবর্তী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দিতে হবে। ১৫ বছরের জন্য দেয়া হবে এই লাইসেন্স। পরবর্তী সময়ে প্রতি পাঁচ বছরের জন্য নবায়নের সুযোগ থাকবে। আয়ের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বিটিআরসিকে জমা দিতে হবে। সোস্যাল অবলিগেশন ফি ধরা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষিত মোট আয়ের এক শতাংশ।
জানা গেছে, থ্রিজি সার্ভিসের জন্য প্রত্যেক অপারেটরকে কমপক্ষে ৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম নিতে হবে। কেউ চাইলে বেশিও নিতে পারেন। ইতিমধ্যে টেলিটককে থ্রিজির জন্য ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তারা পরীক্ষামূলক থ্রিজি সেবা দিচ্ছে। এখনও বিটিআরসির হাতে রয়েছে ৪০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম। এক ডাকেও যদি অপারেটররা স্পেকট্রাম পান তাহলে প্রতি মেগাহার্টজের দাম হবে ২১ মিলিয়ন বা ২ কোটি ১০ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় ১৬৮ কোটি (এক ডলার ৮০ টাকা ডলার হিসেবে) টাকা। ৪০ মেগাহার্টস স্পেকট্রামই যদি অপারেটররা নিয়ে নেয় তাহলে এই হিসেবে বিটিআরসি পাবে ৬ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। এই দামে টেলিটককেও দিতে হবে ভ্যাট ছাড়া এক হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। এর আগে গত ২৯ আগস্ট জামানত হিসেবে চারটি মোবাইল ফোন অপারেটর ৬২২ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। সব মিলিয়ে আগামীকাল ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিলাম।
