পাসপোর্ট ও ডাক্তারি ব্যবস্থাপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার অভাবী মানুষে আবারও বিক্রি করতে শুরু করেছে তাদের দেহের মূল্যবান অঙ্গ কিডনি। প্রশাসনের যথাযথ মনিটরিং না থাকায় জামিনে থাকা কিডনি বিক্রির দালাল চক্রের মূল হোতাসহ নতুন নতুন দালাল চক্রের বিরুদ্ধে অভিনব কৌশলে কিডনি কেনা-বেচার অভিযোগ উঠেছে। আগের চেয়ে বেশি দামে কিডনি ক্রয়ের লোভ দেখিয়ে দালালরা গোপনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম-মহল্লার অভাবী ও খেটে খাওয়া মানুষের কাছ থেকে কিডনি কেনার অপতত্পরতা চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাংবাদিকসহ একটি পর্যবেক্ষক দল ‘কিডনি বিক্রিপ্রবণ’ এলাকা পরিদর্শন করেন এবং কিডনি বেচাকেনায় জড়িত দুই দালালকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠান।
এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০১১ সালে জেলার কালাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অন্তত ২ শতাধিক অভাবী মানুষের কিডনি হাতিয়ে নেয় দালাল চক্র। মাঝে কিছুটা কমলেও সম্প্রতি ফের শুরু হয়েছে মানব দেহের মূল্যবান অঙ্গ কিডনি কেনাবেচা। কিডনি বিক্রির তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে উপজেলার বোড়াই গ্রামের বেলাল উদ্দীন ও তার স্ত্রী জোসনা বেগম, উলিপুর গ্রামের আজাদুল ইসলাম ও ছারভানু, কুসুমসাড়া গ্রামের মোস্তফা, জয়পুর বহুঁতি গ্রামের গোলাম হোসেনের মেয়ে শাবানা ও খাদিজা, শিমরাইল গ্রামের ছাকোয়াত ও এনামুল, ফুলপুকুরিয়া গ্রামের মুসা, সুড়াইল গ্রামের সাইফুল এবং কালাই পৌরসভার থুপসাড়া মহল্লার বিপ্লব হোসেন ফকিরসহ ১৮ অভাবী মানুষের নাম।
পাসপোর্ট ও ডাক্তারি ব্যবস্থাপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে কৌশলে এখন বিক্রি হচ্ছে কিডনি। কিডনি বিক্রি করে ফিরে আসা কয়েকজনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট পরীক্ষা করে এই জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। কালাই উপজেলার উলিপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা আজাদুলের পাসপোর্টে ছবি ঠিক থাকলেও প্রকৃত নাম-ঠিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে। পাসপোর্টে আজাদুলের পরিবর্তে মো. আজাদ হোসেন এবং স্থায়ী ঠিকানা দেখানো হয়েছে— জাপান গার্ডেন সিটি বাংলাদেশ-০১। এছাড়া কালাই উপজেলার বোড়াই গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা জোসনা বেগমের পাসপোর্টে ও ডাক্তারি ব্যবস্থাপত্রে তার প্রকৃত নাম ও ঠিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে। নাম ব্যবহার করা হয়েছে মাহফুজা বেগম, স্থায়ী ঠিকানা দেখানো হয়েছে— সালামাইদ, গুলশান, ভাটারা, ঢাকা-১২১২ ।
গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুল আহসান তালুকদার রেজা, ইন্সপেক্টর (তদন্ত) রকিবুল ইসলাম, কালাই দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (দুপ্রক) ও কালাই প্রেস ক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত একটি পর্যবেক্ষক দল নতুন কিডনি বিক্রেতাদের সম্পর্কে খোঁজ নিতে উপজেলার বোড়াই, উলিপুর, বহুঁতি, জয়পুর বহুঁতি, দুর্গাপুরসহ অন্যান্য গ্রাম পরিদর্শনে যান। কথা বলেন কিডনি বিক্রেতাদের সাথে। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলার বহুঁতি গ্রামের কিডনি বিক্রি চক্রের দালাল আব্দুস সাত্তার, জয়পুর বহুঁতি গ্রামের মিজানুর রহমান মিজান, জয়পুর বহুঁতি গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে জাকারিয়া এবং দুর্গাপুরের গোলাম মোস্তফার ছেলে রনিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শুক্রবার রনি ও জাকারিয়াকে ছেড়ে দেয়া হলেও আব্দুস সাত্তার ও মিজানকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে কালাই থানার এএসআই মানিকুল ইসলাম মানিক বাদি হয়ে সংশ্লিষ্ট আইনে দালাল চক্রের স্থানীয় হোতা আব্দুস সাত্তার, মিজানুর রহমান মিজান, আব্দুল মান্নান, নূরনবী, রেজাউল ইসলাম, বাগেরহাটের সাইফুল ইসলাম দাউদ এবং ঢাকার তারেক আজম, নাফিজ মাহমুদসহ ৮ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এদের মধ্যে মিজান ও নূরনবী ছাড়া সকলেই পূর্বের কিডনি মামলার আসামি।
কালাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন বলেন, ‘অভাবী মানুষে কিডনি বিক্রির ভয়ংকর পেশায় যেন সোনার হরিণ খুঁজে পেয়েছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে স্বেচ্ছায় অঙ্গহানী ঘটিয়ে তারা বাড়ি ফিরছে। অভাব তাড়াতে এই আত্মঘাতী পথ বেছে নিলেও মুক্তি মিলছে না কারোরই। উল্টো অল্প বয়সে অসুস্থ-কর্মহীন হয়ে পড়ছে এসব মানুষ। এটি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
