প্রয়োজনের তিনভাগের একভাগ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে সাভার শিল্প এলাকায়। মাত্র ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা কারখানা পূর্ণভাবে চালু থাকে। বাকি সময়টা চলে নামকা ওয়াস্তে। গত কয়েক মাসে এই সমস্যা বেড়েছে। সমস্যা থেকে উত্তরণের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোন আশার আলো দেখাতে পারেননি।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দিনের বেলা সারাদিনই শিল্প-কারখানাগুলো বন্ধ থাকে অথবা উত্পাদন ক্ষমতার তিনভাগের একভাগ চালু রাখা হয়। কিছু সময় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে চালু রাখা হয়। কিন্তু তাতে খরচ বাড়ে দ্বিগুণ। বছর জুড়ে এই সমস্যা। মাঝে মাঝে এক বা দুই মাস গ্যাসের চাপ ভালো থাকে। কিন্তু তাও টানা ২৪ ঘণ্টা নয়। সমপ্রতি এই সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ঐ এলাকার শিল্প মালিকরা।
তিতাসের সাভার আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জয়নাল আবেদীন ইত্তেফাককে বলেন, আমরা যে গ্যাস পাই তা-ই সরবরাহ করি। চাহিদার চেয়ে এখানে সরবরাহ কম। তিনি বলেন, গ্রাহক বাড়ছে কিন্তু সরবরাহ বাড়ছে না। ফলে সবাইকে চাহিদামত দিতে পারছি না। কেন্দ্রীয়ভাবে গ্যাস সরবরাহ না করলে আমাদের এখানে কিছুই করার নেই।
সাভার এলাকা সরেজমিন ঘুরে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূল সঞ্চালন লাইনে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৫০ পিএসআই (পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চি) চাপে গ্যাস আসার কথা। কিন্তু গ্যাস পাওয়া যায় মাত্র ১০ অথবা ১৫ পিএসআই চাপে। গাজীপুর হয়ে সাভার আসতে আসতে চাপ কমতে থাকে। আবার সাভার হয়ে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত যেতে যেতে গ্যাসের চাপ একেবারে কমে যায়। মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জে গ্যাস নেই বললেই চলে। এখানে গ্যাস নিয়ন্ত্রণেরও তেমন কোন সুযোগ নেই। যে কারণে যেদিক থেকে গ্যাস আসে, তার শুরুর দিকে গ্রাহকরা একটু ভাল চাপে গ্যাস পায়। পরের গ্রাহকদের গ্যাসের চাপ একেবারে কম।
সমপ্রতি সাভার গাজীপুরের কয়েকটি বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, দিনের বেলা সেখানে উত্পাদন প্রায় হচ্ছেই না। কারখানার চাকা প্রায় বন্ধ। ২রা সেপ্টেম্বর একটি কারখানার দিনরাতের হিসাব নিয়ে দেখা গেল, রাতের কয়েক ঘণ্টা ভালোভাবে তারা গ্যাস পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবে তারা ১০ পিএসআই চাপে গ্যাস নিয়ে থাকে। এই চাপে গ্যাস আসলে কারখানা পুরো চলতে পারে। রাত আড়াইটা থেকে সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় চাপে গ্যাস পেয়েছে তারা। কিন্তু সকাল ৮টাতেই চাপ অর্ধেক কমেছে। সকাল ৮টায় গ্যাসের চাপ ছিল ৫ পিএসআই। এরপর চাপ আরো কমতে থাকে। সারাদিনই গড়ে দুই পিএসআই করে গ্যাস এসেছে। সকাল সাড়ে ৮টায় এক দশমিক ৮ পিএসআই, ৯টায় ২ পিএসআই, ৯টা ৩০ মিনিটে এক দশমিক ৮ পিএসআই, ১০টায় এক দশমিক ৮ পিএসআই, ১০টা ৩০ মিনিট থেকে ১২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত একটানা দুই পিএসআই করে গ্যাস পেয়েছে। দুপুর একটায় দুই দশমিক এক পিএসআই, ১টা ৩০ মিনিটে দুই দশমিক ৮ এবং ২টায় তিন পিএসআই চাপে গ্যাস পেয়েছে। আড়াইটায় আবার কমে এক দশমিক ৬ পিএসআই হয়। এভাবে রাত যত বাড়ে গ্যাসের চাপও তত বাড়তে থাকে। রাত দুইটা-আড়াইটায় গিয়ে স্বাভাবিক চাপে গ্যাস আসে।
এই এলাকার বড় একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান স্কয়ার স্পিনিং। স্কয়ার স্পিনিং-এর ডেপুটি ম্যানেজার (ইলেক্ট্রিক) আলমগীর হোসেন বলেন, আমাদের কারখানা ১৬ ঘণ্টা বন্ধ থাকে গ্যাসের অভাবে। মোট উত্পাদন ক্ষমতার ২৫ শতাংশ উত্পাদন করতে পারি আমরা। আট ঘণ্টা কারখানায় পুরো উত্পাদন হয়। বিকল্প হিসাবে ডিজেলে চালাতে হয়। কিন্তু তাতে উত্পাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়। ২০০৮ সাল থেকে এই সমস্যার শুরু হয়েছে। আর গত ৩/৪ মাস সমস্যা বেড়েছে বহুগুণ। আগে এখনকার মত এত বেশি সমস্যা ছিল না।
গাজীপুরের ছোট গোবিন্দপুর মাদার টেক্সটাইল মিলস্ লিমিটেডে গিয়েও দেখা গেল একই অবস্থা। গ্যাস লাগে ১৫ পিএসআই। দিনের বেলা পাওয়া যায় এক পিএসআই চাপ। মাদার টেক্সটাইলের এসিসট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আবু সাঈদ খান বলেন, ঈদের পর থেকে সমস্যা অনেক বেড়েছে। রাতে দুইটার পরে গ্যাসের চাপ ভাল হয়। সকাল ৬টা পর্যন্ত এই ভাল পরিস্থিতি থাকে। তারপর অবস্থা আবার খারাপ হয়ে যায়।
ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় অবস্থিত বিদ্যুত্ কেন্দ্রে প্রতিদিন ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হতো। এ কেন্দ্রে গ্যাসের চাহিদা ১০০-১৭০ পিএসআই। বর্তমানে ৫০-৬০ পিএসআই চাপে গ্যাস পায়। ফলে বিদ্যুত্ উত্পাদন হয় ২০ মেগাওয়াট। ঢাকা পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি-১ এর আশুলিয়া বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে ৪৫ মেগাওয়াটের পরিবর্তে গ্যাসের অভাবে ২০ মেগাওয়াট উত্পাদন হচ্ছে।
তিতাস গ্যাসের সাভার কার্যালয়সূত্র জানায়, সাভার এলাকায় গ্যাসের চাহিদা প্রতি ঘণ্টায় ৯৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫৩ ঘনফুট। এরমধ্যে শিল্পকারখানার চাহিদা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৮২ লাখ ঘনফুট। এছাড়া আবাসিক এলাকায় ১৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮৭ ঘনফুট, বাণিজ্যিক ২৫ হাজার ৮৯৭ ঘনফুট। মোট চাহিদার মধ্যে ডিইপিজেডেই প্রতি ঘণ্টায় ১৪ লাখ ৫৫ হাজার ৮০৯ ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে।
