হঠাত্ চিত্কার দিয়ে সুমির ঘুম ভেঙ্গে যায়। স্বপ্নে সুমি দেখেছে এক মরুভূমিতে ও হারিয়ে গেছে। হাঁটছে আর হাঁটছে, কিন্তু কোন ফেরার পথই খুঁজে পাচ্ছে না। তার স্বামী অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। পরদিন সে আবার অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে। সুমির বিয়ে হয়েছে দুই মাস হল। অচেনা ঘরে ঘুম থেকে উঠেই তার মন খারাপ হয়ে যায়। ওর মনে হচ্ছে এ কোন্ ভুবনে সে এসে পড়েছে। বিয়ের পর বাবার বাসায় গিয়েছে, তবে খুব কম। ওদের বিয়ে পারিবারিকভাবেই ঠিক করা। শ্বশুরবাড়ির অচেনা অনভ্যস্ত পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। এই নতুন বিভূঁইয়ে তাকে স্বামীবিহীন একাই দিন কাটাতে হবে, যতদিন না তার ভিসা হয়। অনার্স, মাস্টার্স পরীক্ষাকেও এমন কঠিন পরীক্ষা মনে হয়নি, যতখানি তার আগামী দিনগুলোকে মনে হচ্ছে।
বর্তমানে অনেকেরই এমন কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে জীবনের প্রথম ধাপ অতিক্রম করতে হয়। বিয়ের পর নতুন এক পরিবেশে মানিয়ে চলাই কঠিন। সেখানে অনেক সময় বিবাহ-উত্তর পর্বটি একজন মেয়েকে একাই পার করতে হয়। সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে, নতুন জীবনের শুরুতে একাকী জীবন কাটানোর অভিজ্ঞতা জানতে কথা হচ্ছিল দুজনার সাথে।
এষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার মাষ্টার্স সম্পন্ন করেছে। ভবিষ্যতে বিদেশে পড়তে যাবার ইচ্ছাও আছে। তার স্বামী আমেরিকায় পিএইচডি করছে। বিয়ের আগে থেকেই তারা একে অপরকে জানত। বিয়ের পর পরই পিএইচডি থিসিসের কাজে তার স্বামীকে চলে যেতে হয়েছে। এষা বলেন, এখনও আমি শ্বশুরবাড়িতেই আছি। নতুন জায়গায় মন বসানো খুব কঠিন, তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছি। ফোন, কম্পিউটার স্কাইপি থাকায় আগের তুলনায় আমাদের যোগাযোগের প্রচুর সুযোগ আছে তারপরও নতুন বাসা। আমার বাবার বাসা শান্তিনগর আর শ্বশুরবাড়ি গুলশান। দূরত্ব এখানে এক বড় সমস্যা। কোন কাজেই মন বসে না। মেয়েদের জীবনে এ ধরনের পরীক্ষার কী সমাধান, এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এষা বলেন, এ ধরনের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই দেখা যায় বহুদিন ধরে ভিসা না হলে স্ত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। পরিবারের সকলের সাথে মানিয়ে চলতে জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে মানসিকভাবে যে সাহায্যের প্রয়োজন, তা না পাওয়ায় স্ত্রী আরও বেশি আরও বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রবাসী স্বামীকে সব কাজের মাঝেও স্ত্রীর জন্য আলাদা সময় রাখতে হবে। তাকে নতুন পরিবেশে মানাতে, পরিবারের সদস্যদের মন-মানসিকতা বুঝতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে । তবুও স্বামীর সাথে পূর্বপরিচয় থাকলে তা স্ত্রীকে নতুন জীবন একাকী শুরু করতে সাহায্য করে।
রুমাতার বিয়ের পরের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান, আমি মার্কেটিং-এ আমার মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি। স্বামী থাকেন কানাডায়। সেখানে চাকরি করেন। আমার বিয়ে দুই বছর হতে চলল। এখনও আমার ভিসা হয়নি। কয়েক মাস শ্বশুর বাড়ি, কিছুদিন বাবার বাড়ি, এভাবেই আমার দিন চলছে। বিয়ের পর মাত্র তিন সপ্তাহ পরই আমার স্বামী কানাডা চলে যায়। তখন আমি মাস্টার্স পড়ছি। শ্বশুর বাড়ি থেকেই ক্লাস করা শুরু করি। একা একা খুবই খারাপ লাগে আমার। বিয়ে ও তার পরে কিছুদিন আমাদের তোলা ছবি দেখতে দেখতেই সময় পার করতাম।
এদিকে শ্বশুর-শাশুড়ি যেন না বোঝেন সেজন্য ননদ, দেবর সকলের সাথে হাসিমুখে গল্পও করতে হত। নতুন বাড়িতে যতবার ঢুকতাম মন খারাপ লাগত। এতদিনের অভ্যাস কি একদিনে বদলানো যায়। আমাদের বিয়ে পারিবারিকভাবেই ঠিক হয়। আমি বিয়ের আগে তাকে চিনতাম না। তাই তার সাথেও যে খুব খোলামনে গল্প করব সেটিও ছিল না। মাত্র কয়েকদিনে কতখানি বন্ধুত্ব আর হয়? তবে তার সহযোগিতা আমাকে সে দুর্যোগ মোকাবিলায় অনেক সাহায্য করেছে। ধীরে ধীরে সেই অচেনা মানুষগুলো খুব আপন হয়ে গেছে। এখনও আমার ভিসা হয়নি। সাময়িক সময়ের জন্য হলেও চাকরি খুঁজছি। মানসিক দৃৃঢ়তাই আমার বর্তমান অবস্থানে একমাত্র সহায়। নতুন দিনের স্বপ্নই আমার মনকে উত্ফুল্ল রাখতে পারে।
