জিস্যাট-সেভেন, ভারতের প্রথম প্রতিরক্ষা স্যাটেলাইট। গোয়েন্দা স্যাটেলাইটও বলা যেতে পারে একে। সরকারি ভাষ্য মতে, সম্পূর্ণ সামরিক কাজে ব্যবহূত হবে জিস্যাট-সেভেন। সম্প্রতি আটলান্টিক তীরবর্তী ফ্রেঞ্চ গায়ানার কৌরু মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র থেকে স্যাটেলাইটটি সফলভাবে কক্ষপথে উেক্ষপন করা হয়। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা-আইএসআরও জানিয়েছে, জিস্যাট-সেভেন তৈরি করতে ব্যয় হয়েছে একশ’ পঁচাশি কোটি রুপি।
সরকারি বিবৃতি অনুসারে, জিস্যাট-সেভেন ভারতের বিশেষ করে নৌবাহিনীর গোয়েন্দা সক্ষমতা আরো বাড়াবে। এর কাজ হবে গোটা প্রশান্ত মহাসাগরে নজরদারি করা এবং এর অতি গোপনীয় সাংকেতিক কোড পদ্ধতিতে (টপ সিক্রেট এনক্রিপ্টেড সিস্টেম) তথ্য সংগ্রহ করে তা ভারতীয় নৌবাহিনীকে সরবরাহ করা। মহাসাগরে ভারতীয় নৌবাহিনীর সব জাহাজই জিস্যাট-সেভেনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা বা তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে। বিশেষ করে সাগরে শত্রু জাহাজ ও সাবমেরিনের অবস্থান নির্ভুলভাবে দিতে পারবে এই কৃত্রিম উপগ্রহ। প্রতিটা জাহাজই পাবে মিত্র ও শত্রু বাহিনীর অবস্থানের বিস্তারিত ডিজিটাল মানচিত্র। এটা হলো জিস্যাট-সেভেন নিয়ে ভারত সরকারের দলিলি ভাষ্য। কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে এর চেয়েও বেশি কিছু। আইএসআরও’র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা এনডিটিভিকে জানিয়েছেন, শুধুমাত্র ভারতীয় ভূ-খন্ড নয়, বরং এর আশপাশের সমুদ্র এলাকাতেও নজরদারি করতে পারবে এই স্যাটেলাইট। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের তথ্য দেবে জিস্যাট-সেভেন। পারস্য উপাসাগর থেকে মালাক্কা প্রণালী পর্যন্ত ভারত মহাসাগরের সত্তর শতাংশ এলাকা জুড়ে বাজপাখির দৃষ্টি রাখবে কৃত্রিম উপগ্রহটি। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নজরদারির স্বার্থে এই স্যাটেলাইটের গুরুত্ব তাই অপরিসীম বলেই মনে করছেন সবাই। এক্সক্লুসিভ ব্যবহারের জন্য ভারতে অবশ্যই একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম আছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, শুধুমাত্র নৌবাহিনীর জাহাজ নয়, বরং সাবমেরিন ও বিমানও এই স্যাটেলাইটের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। তবে এর জন্য উপকূলীয় কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হবে। জিস্যাট-সেভেন নিজের সৌর প্যানেল থেকেই ২৯শ’ ওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনে সক্ষম। ভারতীয় জাহাজগুলো আগে স্যাটেলাইট যোগাযোগ রক্ষা করতো বিশ্বের প্রধান মোবাইল স্যাটেলাইট যোগাযোগ সেবা প্রতিষ্ঠান ইনমারস্যাটের মাধ্যমে। কিন্তু এখন নিজস্ব প্রযুক্তিতে একই কাজ করতে পারায় ইনমারস্যাটের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে এসেছে।
উেক্ষপণের প্রায় ৩৪ মিনিট পরই জিস্যাট-সেভেন কক্ষপথ এলাকায় (জিওসিনক্রোনাস ট্রান্সফার অরবিট-জিটিও) প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। নিজেদের রকেট যান জিএসএলভি থাকলেও তা নির্ভরযোগ্য নয়। বিশেষ করে একাধিক দুর্ঘটনার শিকার ঐ ভারি মহাকাশ যান। সম্প্রতি জ্বালানি নির্গত হবার ঘটনায় মহাকাশে প্রায় আগুনই ধরে গিয়েছিলো জিএসএলভিতে। এ কারণে ফরাসি মহাকাশ যান ভাড়া করতে হয় ভারতকে। কৃত্রিম উপগ্রহ উেক্ষপণ করতে যেতে হয় অন্তত দুই হাজার নটিক্যাল মাইল দূরে। সেখানে ফরাসি রকেট ভাড়া করে তবে জিস্যাট সেভেনকে মহাশূন্যে পাঠানো হয়েছে। মিশনে মোট ব্যয় হয়েছে ছয়শ’ পঞ্চান্ন কোটি রুপি। রকেট ভাড়া ও ইন্সুরেন্সের খরচ মেটাতেই এত ব্যয়।
জিস্যাট-সেভেনের ওজন আড়াই টন যা পূর্ণবয়স্ক পাঁচটি হাতির সমান। সামরিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তিধর সিলেক্ট ক্লাবের অন্যতম সদস্য এখন ভারত। ঐ ক্লাবে অন্যরা হলো যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ব্রিটেনসহ অনেকে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সামরিক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী বৈরী দেশ পাকিস্তানকে মোটেই প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে না ভারত। বরং বৈরী দেশ পাকিস্তানের সাথে প্রতিযোগিতা করছেন না। বরং চীনের সাথেই ভারতে পাল্লা চলছে। চীন যদিও সামরিক মহাকাশ গবেষণায় বেশ এগিয়ে। কারণ ২০০৭ সাল থেকেই এস্যাট বা স্যাটেলাইট বিধ্বংসী অস্ত্রের অধিকারী চীন। এছাড়াও লেজার অস্ত্র ও ন্যানো-স্যাটেলাইট প্রযুক্তিও রয়েছে বেইজিংয়ের।
মহাকাশে প্রায় তিনশ’টি স্যাটেলাইট সামরিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এর পঞ্চাশ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের। এরপর রাশিয়া ও চীনের। কিন্তু সেখানে ভারতের সবেমাত্র একটি যোগ হলো। তবে মহাকাশে ভারতের মোট স্যাটেলাইট রয়েছে কমপক্ষে ১২টি। এগুলো আবহাওয়া সতর্কবার্তার জন্য কাজে লাগছে। সশস্ত্র বাহিনী বহুদিন ধরেই মহাশূন্যে ভারতের পূর্ণ সক্ষমতা আনার ব্যয়বহুল প্রস্তাব দিয়ে আসছিলো। কিন্তু এতদিন সরকার তা গ্রহণ করেনি। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সবশেষ ২০১০ সালে ১৫ বছরব্যাপী প্রযুক্তি সম্ভাবনা ও সক্ষমতা রোডম্যাপ নেয়। এর আওতায় এস্যাট অস্ত্র প্রযুক্তিরও উন্নয়ন করার কথা রয়েছে ভারতের।
