রাজনৈতিক বিবেচনায় গঠন করা দেশের ৮৬টি পৌরসভা এখন নাগরিকদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৌরসভা গঠনের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নাগরিকদের উপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপলেও সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি একটুও। পয়:নিষ্কাশন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ বেশিরভাগ পৌরসভাতেই নেই। নেই সড়ক বাতি। অনেক জায়গায় পৌর ভবনও নেই। যেখানে আছে সেগুলোর কিছু আবার যে দলের মেয়র সে দলের রাজনৈতিক কার্যালয় হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে।
নিয়ম বা আইনের তোয়াক্কা না করে গত সাড়ে ৯ বছরে দেশে এসব পৌরসভা গঠন করা হয়। এর মধ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে (২০০১-২০০৬) ৬৫টি এবং বর্তমান সরকারের সময়ে (২০০৯-আগস্ট-২০১৩) ২১টি পৌরসভা গঠন করা হয়।
প্রসঙ্গত, দেশে এখন মোট ৩২১টি পৌরসভা রয়েছে। এর মধ্যে ক-শ্রেণির ১১৯টি, খ-শ্রেণির ১১৬টি আর গ-শ্রেণির ৮৬টি। এই ৮৬টিই রাজনৈতিক বিবেচনায় গঠিত।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু আলম শহীদ খান ইত্তেফাককে বলেন, অতীতে শুধু ভোটের প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য পৌরসভা গঠন করা হয়েছে। এখনো যে সেই প্রবণতা নেই তা নয়। তবে এখন শর্তগুলো মোটামুটিভাবে পূরণ না হলে অনুমোদন দেয়া হয় না। তিনি স্বীকার করেন, কমবেশি ৮৬ পৌরসভা রয়েছে যেখানে নাগরিক সেবা বলতে কিছুই নেই। বার বার তাগিদ দিয়েও এগুলোর সেবার মান উন্নয়ন করানো যাচ্ছে না।
জানা যায়, ২০০৭ সালে সর্বশেষ জরিপে নাগরিক সেবাহীন পৌরসভা চিহ্নিত করা হয় ১৭৬টি। আর ২০০২ সালে সরকারি ব্যয় পর্যালোচনা কমিশন রাজনৈতিক তদ্বিরে গঠিত পৌরসভা চিহ্নিত করেছিল ৮৮টি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সূত্র জানায়, বেশিরভাগ পৌরসভা গঠন করতে হয় সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য। ভোটের আগে পৌরসভা গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়, আর ভোটে সরকার গঠন করার পর শুরু হয় পৌরসভা গঠনের প্রতিযোগিতা। একের পর এক মন্ত্রী-এমপির সুপারিশ-তদ্বিরে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে হয় মন্ত্রণালয়কে।
এ রকম বাস্তবতায় পৌরসভা গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে ২০০২ সালে গঠিত সরকারের ব্যয় পর্যালোচনা কমিশন প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। এ কমিটির প্রধান সাবেক সচিব এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার মতো সামর্থ্য না থাকলে কোনো এলাকায় পৌরসভা গঠন করা ঠিক নয়। শুধু সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে নিজস্ব আয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার। তিনি বলেন, সেবা না দিয়ে সে বাবদ অর্থ নেয়া শুধু গর্হিত নয়, অনৈতিকও বটে। সে কারণে রাজনৈতিক বিবেচনায় গঠন করা পৌরসভা বাতিল এবং এভাবে পৌরসভা গঠন না করতে সুপারিশ করেছিল কমিশন। কিন্তু বিএনপি আমলে গঠিত এ কমিশনের সুপারিশ অগ্রাহ্যই হয়নি, উল্টো আরও বেশি পৌরসভা গঠন করা হয়েছে।
যেভাবে পৌরসভা গঠনের নিয়ম: স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন অনুযায়ী জনসংখ্যা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, স্থানীয় আয়ের উত্স, অকৃষি পেশার শতকরা হার এবং এলাকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে সরকার কোনো পল্লী এলাকাকে শহর এলাকা ঘোষণা করবে।
ঘোষিত শহর এলাকায় তিন-চতুর্থাংশ ব্যক্তিকে অকৃষি পেশায় নিয়োজিত থাকতে হবে, মোট ভূমির শতকরা ৩৩ ভাগ অকৃষি শ্রেণির হবে, প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব দেড় হাজারের কম নয় এবং মোট জনসংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হাজার হতে হবে। এছাড়া যে এলাকা নিয়ে পৌরসভাটি গঠন করা হবে সে এলাকার মধ্যে পৌরসভা গঠনের অব্যবহিত পূর্বের তিন বছরের রাজস্ব আয় ২০ লাখ টাকা হতে হবে।
কয়েকটি পৌরসভার দুর্দশার চিত্র : আমাদের জয়পুরহাট প্রতিনিধি এসএম মাহমুদুল হক দুলাল জানান, অর্থের অভাবে উন্নয়ন কাজ হচ্ছে না জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল পৌরসভার। আদায়কৃত রাজস্বের বেশিরভাগই খরচ হচ্ছে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানে।
২০০৪ সালে বিএনপি আমলে তত্কালীন সংসদ সদস্য আবু ইউসুফ মোঃ খলিলুর রহমানের তদ্বিরে উপজেলার বরাইল ইউপির ৩টি, বড়তার ইউপির ১৩টি এবং ক্ষেতলাল সদর ইউপির ২৪টি মোট ৪০টি গ্রাম ও প্রায় ১৪ হাজার ভোটার নিয়ে ক্ষেতলাল পৌরসভা ঘোষণার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। তখন এলাকার বিএনপি সমর্থক নবিউল ইসলাম ক্ষেতলাল পৌরসভা ঘোষণা না করার জন্য জনস্বার্থে হাইকোর্টে একটি রিট করলে পৌরসভা ঘোষণা বন্ধ হয়ে যায়। নবিউল ইসলাম পরে কোর্টে যোগাযোগ না করায় ২০১০ সালে রিটের নিষ্পত্তি হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ২০১০ সালের ৯ ডিসেম্বর ক্ষেতলাল পৌরসভার ঘোষণা দেন।
২০১১ সালের ৩ জুন নির্বাচনে ক্ষেতলাল উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান মোল্লা মেয়র নির্বাচিত হন।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বললে তারা পৌরসভা নিয়ে নিজেদের তিক্ততার কথাই তুলে ধরেন।
নির্বাচনের আগে পৌরসভায় ১ কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছিল যা দিয়ে সামান্য কিছু উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। পৌর মেয়র আব্দুল মান্নান মোল্লা বলেন, ‘আমি বিএনপির লোক হওয়ায় বিশেষ বরাদ্দের টাকা পাচ্ছি না। ইচ্ছা থাকলেও পৌরসভার কোন উন্নয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।’
পৌরসভার কর্মচারী নিয়োগ বিষয়ে তিনি বলেন, ক্ষেতলাল পৌরসভার পক্ষ থেকে কোন কর্মচারী নিয়োগ করা হয়নি। ২০১২ সালের ৫ জুলাই পার্শ্ববর্তী কালাই পৌরসভার ৯ জন কর্মচারীকে মন্ত্রণালয়ের একটি আদেশের প্রেক্ষিতে এখানে যোগদান করানো হয়েছে। যা নিয়ম বহির্ভূত।
হাইকোর্টে রিটকারী নবিউল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকার ৯৫ ভাগ মানুষ কৃষক। ৯৫ ভাগ মানুষ কৃষক হলে সেই এলাকায় পৌরসভা বাস্তবায়নের কোন বিধান নেই।
ক্ষেতলাল উপজেলা চেয়ারম্যান তাইফুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ক্ষেতলাল পৌরসভা হওয়ার কারণে উপজেলা পরিষদের রাজস্ব অনেক কমে গেছে। এই গ্রামাঞ্চলে পৌরসভা করার কোন যৌক্তিকতা নেই।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি তাজুল ইসলাম রেজা জানান, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা সদর পলাশবাড়ী ইউনিয়নকে পৌরসভা ঘোষণার ২ বছর পরও সেখানে পৌরসভার কোন কার্যক্রম শুরু হয়নি। এমনকি পৌর প্রশাসক ও নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ১৯টি, কিশোরগাড়ি ইউনিয়নের ৪টি ও বরিশাল ইউনিয়নের ১টিসহ ২৪টি মৌজা নিয়ে গত ২০১১ সালের ১৬ জুলাই পলাশবাড়ি পৌরসভার গেজেট ঘোষণা করা হয়।
পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানান, পৌরসভার গেজেট প্রকাশ হওয়ার পর তত্কালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে পৌর প্রশাসক পদে নিয়োগ করা হয়। ঠিক সে মুহূর্তে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আরো জানান, পৌরসভায় অন্তর্ভুক্ত ২টি ইউনিয়নের ৫টি মৌজা গ্রামীণ জনপদ। ওই এলাকা পৌরসভা হওয়ার মত নয়—এই কারণ দেখিয়ে এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করেন। বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতার নিষ্পত্তি হয়নি।
বরিশাল ইউনিয়নের শফিকুল ইসলাম স্বাধীন জানান, ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল পলাশবাড়ি সদর ইউপি ব্যতীত বাকি ৮টি ইউনিয়নের নির্বাচন তফসিল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পলাশবাড়ি পৌরসভা সংক্রান্ত আইনগত জটিলতায় কিশোরগাড়ি ও বরিশাল ইউনিয়নের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ফলে ২০০৩ সালে নির্বাচনের দীর্ঘ ১০ বছর পরও কিশোরগাড়ি ও বরিশাল ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় ওই ২টি ইউনিয়নের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ অবিলম্বে নির্বাচনের দাবিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি খান মোহাম্মদ খালেদ জানান, জেলার কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা ইউনিয়নকে পৌরসভায় উন্নীত করা হলেও নাগরিকরা কোন পৌর সুবিধা পাচ্ছে না। এই ইউনিয়ন পরিষদের সাথে পার্শ্ববর্তী বাংড়া ইউনিয়নের রাজাবাড়ি গ্রামকে সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ৭ এপ্রিল এলেঙ্গাকে পৌরসভায় উন্নীত করা হয়। এক একর ১২ শতাংশ ভূমির উপর নির্মিত ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সটি এখন পৌরভবন হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।
মোট ২৩ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এলেঙ্গা পৌরসভার লোকসংখ্যা ৫৫ হাজার। পৌরসভা গঠিত হওয়ার পর এ বছরই প্রথম ১ দশমিক ৭ কিলোমিটার রাস্তা পাকা করা হয়েছে এবং ১০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা সংস্কার করা হয়েছে। বরাদ্দের অভাবে আর কোন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়নি। পৌর এলাকায় সড়ক বাতির ব্যবস্থা নেই, নেই কোন পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। পানি সরবরাহেরও ব্যবস্থা নেই। নাগরিক সুবিধা বলতে কিছুই সৃষ্টি করা হয়নি। শুধু বেড়েছে ট্যাক্সের বোঝা।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ থাকা অবস্থায় অধিবাসীদের কাছ থেকে ইউনিয়ন কর হিসেবে আদায় হতো বছরে প্রায় দুই লাখ টাকা। পৌরসভায় উন্নীত হওয়ার পর যে হোল্ডিং ট্যাক্স ধরা হয়েছে তাতে বছরে প্রায় কোটি টাকা আদায় হওয়ার কথা।
