জামদানি শাড়ির প্রতি বাঙালি নারীর আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। অন্য আর যে শাড়িই হোক না কেন সবকিছু ছাপিয়ে জামদানি শাড়ির প্রতি নারীর টান দুর্নিবার। জামদানি শাড়ি বাংলার এক অনবদ্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন। এর নকশার ছন্দে, রঙের বিন্যাসে যেন ফুটে ওঠে তাঁতে লেখা কবিতা।
জামদানি পৃথিবীর বয়নশিল্পের ধারাবাহিকতায় আধুনিক যুগে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। ইউনেস্কো জামদানিকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের গর্ব জামদানি প্রথম ভৌগোলিক পণ্য হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। এই কারুশিল্পের সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন ও কারুশিল্পীদের অনুপ্রাণিত করতে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। জামদানির জ্যামিতিক নকশার এই কাজ ফুটিয়ে তোলা খুব পরিশ্রমের এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। তাই তার দামটাও তুলনামূলক বেশি।
ঈদে তাই জামদানি শাড়ির বিক্রিও কম নয়। বরং ঈদের সময় জামদানির নতুন নতুন নকশা নিয়ে হাজির হন তাঁতিরা। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় প্রদর্শনী। সব শাড়ির দোকানেই জামদানি পাওয়া যায়। তবে, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, বেইলি রোডে জামদানির কালেকশন বেশি। এর পাশাপাশি ঈদ উপলক্ষে রাজধানীতে শুরু হওয়া প্রদর্শনীতে থেকেও শাড়ি সংগ্রহ করেন নারীরা।
বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য মসলিনের মতোই জামদানিও খুব স্পর্শকাতর। এমনকি শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে বিশেষ পরিবেশ ও পানির লবণাক্ততার পরিমাণটিও এই জামদানির সুতা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো উপাদান কমবেশী হলে জামদানি সুতার মান ঠিক থাকে না। জামদানির নকশাও খুব চমকপ্রদ। এসবের ডিজাইনও শত শত বছর ধরে টিকে রয়েছে বাংলার ঘরে ঘরে। এসবের নামগুলোও খুব আকর্ষণীয়। বট পাতা বুটি, ইয়ারিং বুটি, আঙুল লতা পাড়, বাঘের পাড় বুটি, গোলাপ ছড় পাড়, ইঞ্চি পাড়-করাত তেছরি।
প্রাচীনকালে তাঁত বুনন প্রক্রিয়ায় কার্পাস তুলার সুতা দিয়ে মসলিন নামে সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরি হতো এবং মসলিনের উপর যে জ্যামিতিক নকশাদার বা বুটিদার বস্ত্র বোনা হতো তারই নাম জামদানি। জামদানি বলতে সাধারণত শাড়ি বোঝানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যবাহী নকশায় সমৃদ্ধ ওড়না, কুর্তা, পাগড়ি, ঘাগরা, রুমাল, পর্দা, টেবিল ক্লথ সবই জামদানির আওতায় পড়ে। সপ্তদশ শতাব্দীতে জামদানি নকশার কুর্তা ও শেরওয়ানির ব্যবহার ছিল।
ঈদ উপলক্ষে এরই মধ্যে রাজধানীতে শুরু হয়ে গেছে জামদানি প্রদর্শনী। গতকাল শিল্পকলা একাডেমিতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) আয়োজনে শুরু হয়েছে এ প্রদর্শনী। এছাড়া জাতীয় সংসদের সামনেও চলছে জামদানি প্রদর্শনী। শিল্পকলা একাডেমির জামদানি প্রদর্শনী দশ দিন চলবে। শিল্পকলা একাডেমিতে জামদানি প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী (বীরপ্রতীক), শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, শিল্প সচিব মোঃ আব্দুল হালিম। সভাপতিত্ব করেন বিসিক-এর চেয়ারম্যান মোঃ মোশতাক হাসান।
