দেশের সর্ববৃহত্ সরকারি চিকিত্সাসেবা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সংঘটিত ৯ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের সুরাহা গত চার বছরেও হয়নি। ২০০৯ সালের শেষের দিকে এখানে তৃতীয় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে এই বাণিজ্য হয়। নিয়োগ নিয়ে ওই সময় তোলপাড় হলে মন্ত্রণালয় নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বাতিল করে দেয়। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে গড়ালেও এখন পর্যন্ত কোন চূড়ান্ত আদেশ হয়নি।
এদিকে এই নিয়োগ বাণিজ্যের সুরাহা না হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ঢামেক কর্তৃপক্ষ। লোকবলের অভাব থাকলেও আইনী জটিলতার কারণে তারা নতুন করে জনবল নিয়োগ করতে পারছেন না। এতে ‘গরীব মানুষের হাসপাতাল’ হিসাবে পরিচিত এই হাসপাতালে স্বাভাবিক চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
জানা গেছে, সে সময় মন্ত্রণালয় থেকে হাসপাতালকে ১৭১ জন কর্মচারী নিয়োগের ছাড়পত্র দেয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ১৭১ জনের কথাই উল্লেখ করেন। কিন্তু নিয়োগ বাণিজ্যের হোতারা সেখানে আরও বাড়তি ১৮৩ জন কর্মচারী নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা নেন। এই নিয়োগ বাণিজ্যে হাসপাতালের কতিপয় কর্মচারী নেতা এবং এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতা জড়িত। প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা তিন থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রার্থীদের কাছ থেকে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কয়েকজন নিয়োগ প্রার্থী ইত্তেফাককে জানান, ‘দুই নম্বরী’ নেতা ও কর্মকর্তারা ঘুষ নিয়েছেন। ১৭১ জনের স্বাভাবিক তালিকা হওয়ার পর ওই সব নেতা নিজেরাই হাসপাতাল পরিচালকের স্বাক্ষর নিয়ে পছন্দের প্রার্থীর নাম নিয়োগ পত্রে বসিয়েছেন। এরকম ১৮৩ জনের নামে তারা নিয়োগপত্র জারি করেন। তত্কালীন পরিচালক ‘ব্লাংক’ নিয়োগ পত্রে সই করেন বলে তারা অভিযোগ করেন।
হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, দলীয় পরিচয় প্রদানকারী ওই সব নেতা ও কর্মকর্তার কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে শুধু যে হাসপাতালের ক্ষতি হয়েছে তা নয়, সরকারের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাদের দলীয়ভাবে বয়কট করে আইনের হাতে তুলে দেয়ার দাবি করেছেন ওই কর্মকর্তা। হাসপাতালের চিকিত্সকরাও একই দাবি করেছেন। তারা বলেছেন, এ সকল নেতার কাছে হাসপাতাল প্রশাসন জিম্মি। চারদলীয় জোট সরকারের আমলেও নিয়োগ নিয়ে একই অবস্থা হয়েছে বলে তারা জানান।
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, জনবল সংকট এই হাসপাতালের অন্যতম প্রধান সমস্যা। সময়মত নিয়োগ না হলে এর প্রভাব সরাসরি চিকিত্সাসেবার ওপরই পড়ে। সূত্র জানায়, ৮শ বেডের বৃহত্ হাসপাতালটি বর্তমানে ২৩শ’ বেডে উন্নীত করা হলেও কোন জনবল ও স্থায়ী অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। প্রতিদিন এখানে চিকিত্সার জন্য আসেন ৪ সহস াধিক রোগী। জরুরি বিভাগে ৫ শতাধিক মুমূর্ষু রোগী চিকিত্সার জন্য আসেন প্রতিদিন। এতো বিশাল সংখ্যক রোগীকে সামাল দিতে চিকিত্সক, নার্স ও কর্মচারীরা প্রতিনিয়ত হিমশিম খান।
গত ৬ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত থেকে ভোর পর্যন্ত হাসপাতালটির সার্জারি বিভাগে অবস্থান করে এই প্রতিনিধি বিষয়টির সত্যতা পেয়েছেন। ওই রাতে শল্যবিদ ডা. তপন কুমার সাহার অধীনে সার্জারি বিভাগে ভর্তির তারিখ নির্ধারিত ছিল। রাত গভীর হতে না হতেই বিভিন্ন এলাকা থেকে নানান জটিল সমস্যা নিয়ে সংকটাপন্ন রোগীরা হাসপাতালে আসতে শুরু করেন। এর মধ্যে এক ডজন রোগীকে রাতেই জরুরি অপারেশনের জন্য নির্বাচিত করা হয়। কর্তব্যরত চিকিত্সকরা জানান, ‘জনবলের অনেক অভাব রয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে অপারেশন না করলে এ সব সংকটাপন্ন রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত।’ পরে চিকিত্সকরা রাত ৮টার পর থেকে একের পর এক অপারেশন শুরু করেন। পর দিন সকাল ১০টা পর্যন্ত তারা টানা অপারেশন করে রোগীদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন।
জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সীমিত সম্পদ দিয়েও তারা সফলভাবে চিকিত্সাসেবা করে যাচ্ছেন। এটা ডাক্তার, নার্স, কর্মচারীদের নিষ্ঠা ও সততার ফসল। স্থায়ী বরাদ্দ না বাড়ালেও সময় সময় থোক আর্থিক বরাদ্দ চাইলে সরকার হাসপাতালের জন্য ‘না’ বলে না। নিয়োগ বাণিজ্য সম্পর্কে পরিচালক বলেন, এ ব্যাপারে আমরা আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি। চিকিত্সার বৃহত্তর স্বার্থে বিষয়টির দ্রুত সমাধান ও হাসপাতালে জনবলের এই তীব্র সংকট নিরসন হওয়া জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
