‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এই কথাগুলো যিনি মনে প্রাণে বিশ্বাসী হয়ে আজীবন মানুষের খেদমত করে গেছেন সেই কর্মবীর হচ্ছেন-জামালপুর তথা বাংলাদেশের কৃতি সন্তান, মানব হিতৈষী, দেশপ্রেমিক, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি, আলোর দিশারী, কাজে বিশ্বাসী একজন ধর্মপ্রাণ সূফী বরেণ্য মানুষ, জামালপুর সমিতি ঢাকার সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ সরকারের সুদক্ষ সচিব মরহুম আলহাজ্ব এম.এ রশীদ। তিনি কর্মজীবনে, ব্যক্তি জীবনে ও সমাজ জীবনে ছিলেন ধ্রুবতারার মত উজ্জল এবং অনেকের প্রেরণার উত্স।
আলহাজ এম, এ রশীদ জামালপুর জেলার মেলান্দহ থানার মালঞ্চ গ্রামে ১৯৩১ সালের ৪ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আলহাজ্ব আব্দুল গফুর মন্ডল ছিলেন নয়ানগর ইউনিয়ন বোর্ডের দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট ও চেয়ারম্যান এবং জনদরদী, ন্যায় বিচারক। মাতা উম্মে কুলসুম ছিলেন পর্দানশীন সুগৃহিনী। মরহুম আব্দুল গফুর এর ২ ছেলে ও ৪ মেয়ে। এম এ রশীদ ছিলেন ভাইদের মধ্যে বড়।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় দাগী জালালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এরপর জামালপুর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে (বর্তমান জিলা স্কুল) ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। তিনি ১৯৪৭ সালে এসএসসি, ১৯৪৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৫২ সালে সম্মান কোর্সে ১ম শ্রেণীতে ১ম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করেন।
আলহাজ্ব এম.এ.রশীদ ১৯৫৪ সালে বেগম সুলতানা জাহানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ৩ পুত্র ১ কন্যা। বড় ছেলে ছিলেন আলহাজ্ব মোঃ সুলতান মাহমুদ রাজা পেশায় ডাক্তার। দ্ব্বিতীয় ছেলে আলহাজ্ব হাসান মাহমুদ রাজা একজন সফল ব্যবসায়ী ও তৃতীয় ছেলে আকতার মাহমুদ রানা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। একমাত্র কণ্যা ফাতেমা রশীদ।
আলহাজ্ব এম.এ.রশীদ এর কর্ম জীবন শুরু হয় শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। তিনি এম.এ পাশ করার পর ঢাকা জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। পরে সিএসপি পরীক্ষায় উত্তীর্ন হলে ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান ট্যাক্সেশন সার্ভিসে যোগদান করেন। দক্ষতা, সততা ও একনিষ্ঠতার দরুণ তিনি ধাপে ধাপে প্রমোশন পেয়ে ১৯৭০ সালে অর্থ মন্ত্রনালয়ের যুগ্ম সচিব পদে অধিষ্ঠিত হন সেসময় যোগ্যতা এবং সততার জন্য তত্কালীন কেন্দ্রীয় সরকার বাঙালী অফিসারদের মধ্যে মাত্র ১৪ বছরে যুগ্ম সচিব পদে পদন্নতি পান যা সে সময় এক বিরল ঘটনা। ১৯৭৪ সালে অতিরিক্ত সচিব পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি কিছু দিন বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। তার কর্ম দক্ষতার দরুন বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৮২ সালে সচিব পদে নিযুক্ত করেন। তিনি প্রথমে ত্রাণ ও পূনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের ও পরে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। আলহাজ্ব এম.এ.রশীদ লেখালেখিও করতেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থেও মধ্যে ‘থিউরি অব পলিটিক্স’ এবং ইন্টারমিডিয়েট সিভিকস ও ইকোনোমিকস ছাত্র-ছাত্রীদের সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশ সরকারের একজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তা হয়েও মরহুম আলহাজ্ব এম.এ.রশীদ সরকারী কাজের পাশাপাশি ইসলাম ধর্মের আহকামগুলো গুরুত্বের সাথে পালন করতেন। তিনি শুধু নামাজ, রোজা নিয়েই ব্যস্ত থাকেননি, আধ্যাতিক চিন্তাতেও মগ্ন থাকতেন। এদিক থেকে তাকে একজন সূফী কামেল বলা যেতে পারে। তিনি পীরে কামেল শাহ সূফী সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল বারী আল হাসানী ওয়াল হুসাইনী রহ. ও পীরে কামেল হাফেজ মুহা. জমির উদ্দিন চিশতী রহ. এর সোহবত লাভ সহ সৈয়দ আব্দুল বারী শাহ সাহেবের বাইয়াত গ্রহণ করেন ও পরে তার খলিফা হবার মর্যাদা লাভ করেন। তিনি সব সময় টুপি পরতেন এবং তার মুখমন্ডলে শ্মশ্রু শোভা পেত। মরহুম আলহাজ্ব এম.এ.রশীদ দীর্ঘদিন জামালপুর সমিতি ঢাকার সভাপতি ছিলেন। তিনি সমিতিতে অনেক অবদান রেখে গেছেন। তার স্বপ্ন ছিল জামালপুর সমিতির একটি ভবন। যেখানে জামালপুরের মানুষজন কারীগরী শিক্ষা অর্জন করবে এবং যাদের ঢাকায় থাকার জায়গা নেই তারা আশ্রয় নিয়ে কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করবে।
আলহাজ্ব এম.এ.রশীদ বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যানের ও বাংলাদেশ সরকারের সচিব থাকাকালে জামালপুরের বহু লোককে চাকুরী দিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। তিনি গরীব মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের সাহায্য করা ছাড়াও গরীব দুঃখী মানুষের প্রচুর দান-খয়রাত করতেন। তিনি নিজ এলাকায় বহু স্কুুল, কলেজ, মাদ্রাসা, এতিমখানা প্রতিষ্ঠা ও সংস্কার করেন। এর মধ্যে মেলান্দহ কলেজ, মালঞ্চ হাই স্কুল, মালঞ্চ আল-আমিন জমিরিয়া মাদ্রাসা, এতিমখানা হাসপাতাল, মহিলা সেলাই প্রশিক্ষন কেন্দ্র, নওমুসলিম পূর্নবাসন কেন্দ্র ও জমিরিয়া কমপ্লেক্স ইত্যাদি। এছাড়া মেলান্দহ থানার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুতায়নের জন্যও প্রয়াস চালিয়েছিলেন।এই মহত্প্রাণ, ক্ষনজন্মা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকা অবস্থায় ১৯৮৮ সালের ৫ অক্টোবর ঢাকায় নিজ বাস ভবনে ৫৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
