সাদা গোলাপের দল গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। দলটির সামনে স্কুলের প্রধান শিক্ষক শুভ্রকান্ত। স্কুল থেকে বের হবার সময়ে শুভ্রকান্ত দুই লাইনে গোলাপদের দাঁড় করিয়ে বলেছেন, বাছারা আমরা যাচ্ছি বড় কাছে, মহত্ উদ্দেশ্যে। পথে কোনো গোলমাল করবে না। তোমাদের দেখে অন্য ফুলেরাও যেন শিখতে পারে, কেমন?
সাদা গোলাপ দলের ক্যাপ্টেন লীলানাগ বললে, ঠিক আছে স্যার। আমরা পথে কোনো গোলমাল করবো না।
এইইতো চাই। চলো।
স্কুল থেকে সবাই দল বেঁধে রাস্তায় নামে। রাস্তাটা খুব ভালো বলা যাবে না। এখানে ওখানে গর্ত। নরম আর কোমল গোলাপদের জন্য এই রকম পথে চলতে কষ্টই হয়। তবুও যেতে হবে— কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর ডানে বাঁক নিতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেলো স্কুলের প্রধান শিক্ষক শুভ্রকান্ত। তার চোখ সামনে। ঘটনা কী? সাদা গোলাপের ক্যাপ্টেন দুই পায়ের মাথায় ভর করে দাঁড়ায়। দেখে বাম পাশের বাঁক দিয়ে কালো গোলাপেরা যাচ্ছে।
আমরা আগে যাবো— সাদা গোলাপের কয়েকজন ছাত্র গুনুগুন করে, কালো গোলাপেরাতো কখন ফুল দিতে যায় না।
ঘটনাটা জানে শুভ্রকান্তও। অনেক অনেক বছর আগে কালো আর সাদা গোলাপের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে দুই পক্ষেই প্রচুর সৈন্য মারা গিয়েছিল। অবস্থা যখন মারাত্মক আকার ধারণ করে ঠিক তখনই গোলাপদের রাজা লাল গোলাপ এসে দাঁড়ায় যুদ্ধের মাঝখানে।
লাল গোলাপ যেহেতু গোলাপের রাজা, সমস্ত ফুলদেরও রাজা, সুতরাং আর যুদ্ধ না করে দুই পক্ষ সন্ধি করে ফিরে যায় যার যার দেশে। কালো গোলাপের এমনিই বদনাম— ওরা বেদনা, দুঃখ আর কষ্টের প্রতীক। সেই বদনাম ঘোচানোর অনেক চেষ্টাও করেছে। যেমন কালো গোলাপেরা লাল পোষাক পরতে শুরু করেছিল। কিন্তু যারা পোষাক তৈরী করে, সেই কারিকরেরা ওদের আর লাল পোশাক দিতে চায়নি।
বলেছে— আমাদের বানানো লাল পোষাক পড়লে অন্য গোলাপেরা আমাদের পোষাক কিনবে না। আমরা না খেয়ে মারা যাবো।
কি আর করা, লাল পোষাক ছেড়ে কালো গোলাপেরা শরীরে লাল রঙ মাখা শুরু করেছিল। সেখানেই বাধা পায় রঙ কারিকরদের। তখন কালো গোলাপেরা রঙ কারিকরদের মারতে গিয়েছিল। কয়েকজনকে ধরে বন্দি করেছিল অন্ধকার ঘরে। খবর পেয়ে আবার ছুটে আসে লাল গোলাপের রাজা—জয়বাংলা এসে দাঁড়ায় সামনে।
জয়বাংলা কালো গোলাপদের বুজিয়ে বলে— প্রকৃতি যাকে যেভাবে বানিয়েছে তাকে সেভাবেই সন্তষ্ট থাকা উচিত্। অন্যর রঙ চুরি করে মহত্ হওয়া যায় না। বরং সবার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করো, বিপদে কাছে আসো, দেখবে সবাই ভালোবাসবে। কালো রঙ তখন আর কারো মনে থাকবে না। বুঝেছো?
কালো গোলাপদের প্রধান মি ইয়াহিয়া মোটা গর্দান নেড়ে সাড়া দেয়— আচ্ছা।
লাল গোলাপের রাজা জয়বাংলাকে স্যালুট করে দলবল নিয়ে চলে যায় মি. ইয়াহিয়া। তখন লাল গোলাপের শিক্ষক শুভ্রকান্ত বলেছিল, কয়লার স্বভাব যায় না ধুইলেও।
তুমি ঠিকই বলেছো শুভ্রকান্ত, জবাব দেয় জয়বাংলা—কিন্তু সবাইকে ভালো হওয়ার, সুন্দর হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত্।
শুভ্রকান্ত এগিয়ে যায় কালো গোলাপদের দিকে, এ্যাই তোমরা কোথায় যাচ্ছো?
কালো গোলাপেরা ভ্রুক্ষেপই করে না। তারা মার্চপাস্ট করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ তাকায় বাঁকা চোখে।
স্যার! আমাদের আদেশ করেন, কালোদের মাটিতে মিশিয়ে দিই— বলে ক্যাপ্টেন লীলা।
আরে না, আমরা যাচ্ছি একটি মহত্ কাজে। পথে ঝগড়া করা ঠিক হবে না। দেখি আমি কী করা যায়? বলতে বলতে শুভ্রকান্ত দেখে জবা ফুলেরাও দল বেঁধে আসছে। তারা কোনো শৃংখলা মানছে না। সারাটা পথ দখল করে গান গাইতে গাইতে আসছে।
এখন কী হবে? ভাবছে শুভ্রকান্ত। একটু ভেবে বলেন— তোমরা একটুও গোলমাল করবে না। চুপচাপ আমার পিছনে পিছনে আসতে থাকো। ওরা, মানে জবা বা কালো গোলাপ যদি পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাঁধাতে চায়, তোমরা কিচ্ছুটি বলবে না। মনে রেখো— আমরা সাদা গোলাপেরা যাচ্ছি একটি মহত্ কাজে।
সাদা গোলাপেরা হাঁটতে শুরু করে সামনের দিকে। কিন্তু পথে বাঁধার সৃষ্টি করে কালো গোলাপেরা। কালো গোলাপদের সঙ্গে যোগ দেয় জবারাও। কিন্তু সাদা গোলাপেরা একটু তিক্ততা সৃষ্টি না করে ধীরে ধীরে যেতে থাকে। তাদের মুখে শোক থৈ থৈ করছে। কোনো কোনো সাদা গোলাপ কাঁদছেও। সাদা গোলাপদের শিক্ষক শুভ্রকান্ত নীরবে হাঁটছে। তার মুখও গম্ভীর। বেশি পথ বাকি নেই। আর একটা বাঁক পেরুলেই সেই সমাধী।
ওমা, বাঁকটা পার হতেই দেখে শুভ্রকান্ত—বেলি, জুই, বকুল, শাপলা, জলপদ্ম,দোপাটি, রজনীগন্ধা, টগর, গাধা ফুলেরা জটলা পাকাচ্ছে সমাধীর পাশে। একে অপরের উপর হামলে পরতে চায়। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে ফুলের মাঝখানে ঢুকেছে শাপলা।
আমি এ দেশের জাতীয় ফুল। আমি আগে আমাকে নিবেদন করবো।
শাপলা ফুলকে কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে এগিয়ে যায় টগর—বললেই হলো! আমি এসেছি সেই তালদীঘি থেকে। সবার আগে আমি আমাকে বিলিয়ে দেবো তাঁর সমাধীতে,তারপর অন্যরা— বলতে বলতে টগর এগিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু সমাধীর কাছে পৌঁছাবার আগেই পেছন থেকে টগর ফুলকে টেনে ধরে গান্ধা ফুলের একটি দল, অতো দূর থেকে কে তোমকে আসতে বলেছে হে? আগেতো তোমাকে দেখিনি বাপু। তাঁর প্রতি মৃত্যদিবসে আমাদের দিয়েই শুরু হয় মালা দেওয়া। দেখো নাই টিভিতে? শত শত মানুষ, লাখ লাখ মানুষ আমাদের হাতে নিয়ে ছুটে আসে।
পাশ থেকে আর একটি গাধা ফুল ফোড়ন কাটে—দেখবে কী করে? থাকোতো দীঘিতে। আমাদেরকে কি সুন্দর করে বেঁধে মালার ডালা সাজিয়ে ওনার পায়ের কাছে রাখে। যখনই আমরা তাঁর পায়ের সান্নিধ্য পাই, আমাদের জন্ম স্বার্থক হয়ে ওঠে। তুমি পরে এসো— আমরা যাই আগে—বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছিলো গান্ধা ফুলের দল।
কিন্তু গাধা ফুলের সামনে এসে দাঁড়ায় রজনীগন্ধা,দোলায় সাদা কেশর, কেশরে ফুটেছে পাপড়ির পেখম। মিহি গন্ধ বেরুচ্ছে রজনীগন্ধার শরীর থেকে। পাপড়ির কেশর দোলাতে দোলাতে ঝাঁকে ঝাঁকে রজনীগন্ধারা দেয়াল তুলে দাঁড়ায় গাধা ফুলদের সামনে—শুধু তোমাদের দিয়েই মালা দেয় নেতার চরণে? আমাদের দেখো নাই? আমাদের সুন্দর প্যাকেটে সাজিয়ে তাঁর সমাধীতে থোকায় থোকায় দেয় না? কেবল নিজেদেরই দেখো? স্বার্থপর কোথাকার?
কী? আমাদের স্বার্থপর বলা হচ্ছে? ভীষণ ক্ষেপে ওঠে গাধা ফুলেরা।
ওদিকে পেছনে জমা হচ্ছে একেক দল ফুল। সামনে এগোয় জুইতো পেছন থেকে টেনে ধরে জবা। জবা টেনেটুনে সামনে এগুলে বাধা দেয় দোপাটি। দোপাটি শরীরের জামা খুলে এগুলে পা টেরে ধরে বকুল। ফুলদের চাপে, প্রতিযোগিতায় গোটা এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। কেউ আর যেতে পারছে না সমাধীর কাছে। সমাধীর কাছে সবার আগে নিজেদের নিবেদন করতে না পারায় রেগেমেগে কালো গোলাপেরা তাদের কোমড় থেকে বের করে ছুরি।
কালো গোলাপদের হাতে চকচকে ছুড়ি দেখে সব ফুলেরা কান্নায় ভেঙ্গে পরে। ফুলদের কান্না দেখে দাঁত বের করে হাসে কালো গোলাপের নেতা ইয়াহিয়া। কালো গোলাপদের ঠেকাতে বুক চিতিয়ে এগিয়ে আসে এতোক্ষণ চুপচাপ থাকা নীলপদ্মরা। নীলপদ্মরা সংখ্যায় আবার কম।
তোমরা আমাদের কী করবে? দাঁত বের করে বিশ্রীরকমে হামে ইয়াহিয়া।
খুব শান্ত স্বরে জবাব দেয় জলপদ্মের রানী প্রীতিলতা- আমরা সংথ্যায় কম ঠিক কিন্তু আমাদের শক্তি তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ আমরা জলে বাস করি। জল আমাদের শক্তি জোগায়। জল ও মাটির শক্তিকে সামনে রেখে তোমাদের বলছি, আমাদের সকলকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে দাও।
যদি না দিই? কদাকার মুখে প্রশ্ন করে ইয়াহিয়া।
হঠাত্ জলপদ্ম আর কালোগোলাপদের মাঝে এসে উপস্থিত হয় লালগোলাপের রাজা জয়বাংলা। তাকে দেখে সব ফুলেরা মাথা নীচু করে থাকে। একে একে সমবেত সকল ফুলের দিকে তাকায়। কালো গোলাপেরা চকচকে ছুরি লুকিয়ে ফেলে।
আমরা না ফুল? আমাদের দুনিয়ার মানুষ ভালোবাসে। সকল মহত্ কাজে আমাদের উপহার দেয়। আমরা মানব সমাজে ভালোবাসার প্রতীক। সেই আমরা আজ একি করছি? লাল গোলাপদের রাজা জয়বাংলা একটু বিরতি নিয়ে প্রশ্ন করে— আমরা এখানে কেনো এসেছি?
শেখ মুজিবের সমাধীতে আমাদের নিবেদন করতে— ফুলদের কোরাস।
তার সমাধীতে নিজেদের নিবেদন না করে মারামারি করছো কেনো? সবাই নীরব।
লাল গোলাপের রাজা ধীরে ধীরে হাঁটে ফুলদের মধ্যে, আমি আমাদের নিয়ে গর্ব করতাম। আমরা দুনিয়ায় শান্তির প্রতীক। আমরা এসেছি শোকে বিহব্বল বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ নেতার মৃত্যদিনে তাঁর সমাধীতে নিবেদন করতে। অথচ—
আমরা লজ্জিত— বলে সাদা গোলাপ দলের শিক্ষক শুভ্রকান্ত।
দেখো তোমরা, শেখো তোমরা সাদা গোলাপদের কাছ থেকে। তোমরা যখন শেখ মুজিবের সমাধীতে নিজেদের সবার আগে নিবেদন করার জন্য মারামারি করছো তখন এই সাদা গোলাপেরা দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছে আর হতাশায় কষ্ট পেয়েছে। কারণ— সাদা গোলাপ শান্তিতে বিশ্বাসী। আর শান্তিতে আস্থা ছিল শেখ মুজিবের। তিনিও ভালোবাসতেন সা্দা গোলাপদের। অথচ সেই তাঁকেও হত্যা করেছিল ঘাতকেরা। এসো, আমরা তাঁর সমাধীতে একে একে লাইন ধরে আমাদের নিবেদন করে ঘাতক মানুষদের দেখিয়ে যাই— আমরা ফুলেরা শেখ মুজিবকে কতোটা ভালোবাসি!
লাইন ধরে বকুল, জলপদ্ম, টগর, দোপাটি, রজনীগন্ধা, বেলি, জুঁই, গাধা ফুলেরা পনেরোই আগস্ট ভোরে শেখ মুজিবের সমাধীর দিকে এগিয়ে যায়। টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর সমাধী ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। সেই ফুল থেকে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে সারা বাংলায়।
