১৫ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার অন্যতম প্রধান একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে গুগল। বলতে গেলে ‘ইন্টারনেট সার্চ’ শব্দগুচ্ছের সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে গুগল। ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার জন্য গুগল ছাড়াও সেবা প্রদান করে আসছে ইয়াহু, বিংসহ আরও বেশকিছু সেবা। এদের সাধারণ নাম হচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন। সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এসব সেবা এখন সকলের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হলেও এই প্রযুক্তির বয়স খুব বেশিদিন নয়। বছর বিশেক হলো আগমন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব বা ইন্টারনেটের। আর তখন থেকেই মূলত সার্চ ইঞ্জিনের যাত্রা শুরু। আর এই যাত্রার অন্যতম একজন পথিকৃত্ হলেন জোনাথন ফ্লেচার, যদিও এই সংশ্লিষ্ট আলোচনায় তিনি খুব বেশি একটা আসেননি প্রযুক্তি বিশ্বে। তবে আধুনিক সার্চ ইঞ্জিনের জনক হিসেবে তাকে অভিহিত করা হলেও খুব বেশি বলা হয় না। এই স্বীকৃতি তার মেলেনি অবশ্য। তিনিই আজ থেকে বিশ বছর আগে স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব স্টার্লিংয়ের একটি গবেষণাগারে তৈরি করেছিলেন বিশ্বের প্রথম ওয়েব-ক্রলিং সার্চ ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিনটির মূল প্রযুক্তিই মূলত ব্যবহূত হয়ে থাকে ইয়াহু, গুগল, বিং এবং অন্যান্য সার্চ ইঞ্জিনে।
ওয়েব সার্চের প্রাথমিক পর্যায়
আজকের দিনে ওয়েব সার্চকে যতটা সহজ এবং স্বাভাবিক মনে হয়, ইন্টারনেটের শুরুর দিনগুলোতে এটি এত সহজ ছিল না। ১৯৯৩ সালেই মূলত আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (ডাব্লিউ ডাব্লিউ ডাব্লিউ)-এর যাত্রা। সেই সময়ের প্রথম ওয়েব ব্রাউজার হলো মোজাইক। আজকের দিনে যেসব ওয়েব ব্রাউজার আমরা ব্যবহার করে থাকি, মোজাইক অনেকটা সেরকমই ছিল। তখন বিশ্বব্যাপী ওয়েবপেজের সংখ্যাই ছিল সবমিলিয়ে হাজারের ঘরে। কিন্তু এত অল্পসংখ্যক ওয়েবপেজ থেকেই প্রয়োজনীয় ওয়েবপেজটি খুঁজে বের করার কোনো প্রযুক্তি তখনও জানা ছিল না বিজ্ঞানীদের।
ওই সময়ে মোজাইকে একটি পেজ ছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘হোয়াটস নিউ’। ইন্টারনেটে নতুন নতুন যুক্ত হওয়া ওয়েবপেজের খবর মিলত এই পেজটিতে গেলে। তবে এই পেজে নতুন কোনো ওয়েবসাইটকে যুক্ত করার প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন তৈরি হওয়া ওয়েবপেজ যুক্ত হয়ে যেত না এতে। এতে যুক্ত হওয়ার জন্য ওয়েবপেজ নির্মাতাকে আবেদন করতে হত ন্যাশনাল সেন্টার ফর সুপারকম্পিউটিং অ্যাপ্লিকেশন (এনসিএসএ) বরাবর। মোজাইক ব্রাউজারের নির্মাতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ দলের কাছে এই আবেদন এসে পৌঁছালে তারপর ওই ওয়েবপেজটির খবর তুলে দেওয়া হত মোজাইকের ‘হোয়াটস নিউ’ পেজটিতে।
ঠিক এই সময়টিতে জোনাথন ফ্লেচার ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব স্টার্লিংয়ের একজন স্নাতক। স্টার্লিং থেকে স্নাতক পর্যায়ের পড়ালেখা শেষ করে তিনি পিএইচডি করার অফার পেয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগোতে। মাঝের সময়টাতে তিনি প্রায় বসেই ছিলেন বলা যায়। ওই সময়ে অর্থ সংস্থানের জন্যই কোনো কাজ খুঁজছিলেন। সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে জোনাথন বলেন, ‘হঠাত্ করেই ওই সময়ে অর্থ উপার্জনের জন্য আমার কাজের খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় আমি ফিরে যাই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সেখানকার প্রযুক্তি বিভাগের জন্য আমি কাজ পেয়ে যাই।’ এই কাজের সূত্রেই জোনাথন ফ্লেচার পরিচিত হন ডাব্লিউ ডাব্লিউ ডাব্লিউ এবং মোজাইক ব্রাউজারের সাথে। ‘হোয়াটস নিউ’ পেজটি সম্পর্কেও প্রথম জানতে পারেন তখনই।
উন্নত সার্চ ইঞ্জিন
কাজ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ওয়েব সার্ভার তৈরির দায়িত্ব পড়ে ফ্লেচারের উপর। তবে কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, মোজাইক ব্রাউজারের ‘হোয়াটস নিউ’ পেজটিতে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছিল, সেটি সঠিক নয়। কারণ এই পেজটিতে সম্পূর্ণ হাতে-কলমে ওয়েবসাইট কিংবা ওয়েবপেজ যুক্ত করা হত। আর কোনো ওয়েবসাইট কিংবা ওয়েবপেজে পরিবর্তন করা হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই পেজে আপডেট দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে ব্রাউজারের নতুন সাইটের সন্ধান দেওয়ার পেজটিতে যেসব পেজ বা সাইটের খবর দেওয়া থাকত, সেগুলো খুব দ্রুত পুরোনো হয়ে যেত এবং হালনাগাদ খবর মিলত না।
এই অবস্থাতে ফ্লেচার সিদ্ধান্ত নেন, তিনি এমন একটি প্রোগ্রাম লিখবেন, যেটি তার হয়ে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে যুক্ত বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং ওয়েবপেজের খবর খুঁজে এনে দিবে। কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের এই ছাত্র তখন যে প্রোগ্রামটি নিয়ে কাজ শুরু করেন, সেটিই হচ্ছে বিশ্বের প্রথম ওয়েব সার্চ ইঞ্জিন। এই প্রযুক্তিকে বলা হয়ে থাকে ‘ওয়েব ক্রলার’। আর ফ্লেচার তার উদ্ভাবনের নাম দেন ‘জাম্পস্টেশন’। তিনি প্রথমে ওয়েবপেজগুলোর একটি ইনডেক্স তৈরি করেন এবং ওয়েব ক্রলারটি এই ইনডেক্স থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য খুঁজে বের করতে সক্ষম ছিল। প্রক্রিয়াটি ছিল স্বয়ংক্রিয় এবং এই প্রোগ্রামটি যতগুলো ওয়েবসাইট কিংবা ওয়েবপেজ ভিজিট করত, তার সবগুলোকে ইনডেক্সিং করত। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে তখন পর্যন্ত যতগুলো ওয়েবসাইট ও পেজ ছিল, তার সবগুলোকেই ইনডেক্সিং করতে সক্ষম হয় জাম্পস্টেশন। একটা পর্যায়ে গিয়ে জাম্পস্টেশনের আর ভিজিট করে ইনডেক্সিং করার কিছু ছিল না। ১৯৯৩ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাম্পস্টেশনে ২৫ হাজার ওয়েবপেজ ইনডেক্সিং করা ছিল।
সার্চ ইঞ্জিনের জন্ম
ইন্টারনেটের জন্য সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে জোনাথন ফ্লেচারের জাম্পস্টেশনই প্রথম। ইন্টারনেটে তথ্য অনুসন্ধান বিষয় গবেষক রয়্যাল মেলবোর্ন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক মার্ক স্যান্ডারসন এ সম্পর্কে বলেন, ‘আমি বলব ফ্লেচারই ওয়েব সার্চ ইঞ্জিনের জনক। কম্পিউটার তো তথ্য অনুসন্ধান করতেই পারে। আবার ওয়েব যুগের আগেও সার্চ ইঞ্জিনের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু এখন আমরা যেসব আধুনিক সার্চ ইঞ্জিন সম্পর্কে জানি, তার সব উপাদান প্রথম ফ্লেচারের সার্চ ইঞ্জিনেই পাওয়া যায়।’
বর্তমান সময়ে গুগল’র ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন কিংবা ইয়াহু’র জেরি ইয়াংকে বিশ্ব যেভাবে চেনে, সেই তুলনায় ফ্লেচার বলা যায় বিশ্ববাসীর কাছে অচেনাই রয়ে গেছেন। বর্তমানে হংকংয়ে বসবাসরত ফ্লেচারকে ইন্টারনেটের এই অগ্রযাত্রায় খুব বেশি স্বীকৃতিও দেওয়া হয় না। ওই সময়ে অবশ্য বিনিয়োগের অভাবেই তার জাম্পস্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময়ের কথা বলতে গিয়ে ফ্লেচার জানান, ‘আসলে জাম্পস্টেশনকে কার্যকর রাখতে আরও অনেক বেশি টাকার প্রয়োজন ছিল। ওই সময়ে হার্ডডিস্কের স্টোরেজ যেমন কম ছিল, দামও ছিল তেমন বেশি। স্টার্লিং আর এতে বিনিয়োগে উত্সাহী ছিল না। ফলে এটি বন্ধ করে দিতে হয়।
১৯৯৪ সালের জুন মাস নাগাদ ২ লক্ষ ৭৫ হাজার ওয়েবপেজের ইনডেক্স করতে সক্ষম হয় জাম্পস্টেশন। তবে হার্ডডিস্কে জায়গার অভাবে তাকে সেই সময়ে ওয়েবপেজের হেডার আর টাইটেল ইনডেক্স করেই ক্ষান্ত থাকতে হয়। তারপরেও অতিরিক্ত লোডের কারণে জাম্পস্টেশন প্রায়ই কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়ত। এমন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার প্রকল্পে বিনিয়োগ না করায় তিনি আর সামনে এগুতে পারেননি। জাপানে ভালো একটি চাকরির অফার আর তাই তিনি ফেরাতে পারেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ও জাম্পস্টেশনের সম্ভাবনা বুঝতে পারেনি পুরোপুরি। ফ্লেচার বলেন, ‘আমি নিজেই হয়ত বিশ্ববিদ্যালয়কে বুঝাতে পারিনি এর সম্ভাবনা এবং গুরুত্ব। ওই সময়ে জাপানে চলে যাওয়াকেই আমি ভালো মনে করেছি এবং তাই করেছি। তবে পরে আজ ২০ বছর পরে এসে বুঝতে পারি, হয়ত জাপানে না গিয়ে জাম্পস্টেশন নিয়েই আরও অনেক বেশি দৌড়-ঝাঁপ করলে ভালো হত।
এতদিন ধরে নজরের বাইরে থাকা ফ্লেচার আবারও আলোচনায় এসেছেন কিছুদিন আগে ডাবলিনে এক অনুষ্ঠানে তাকে সম্মাননা দেওয়ায়, যেখানে মাইক্রোসফট, ইয়াহু এবং গুগল’র কিছু মুখপাত্রের সাথে একই কাতারে ছিলেন ফ্লেচার। সেখানে অবশ্য তিনি ভবিষ্যতের দিকেই মনোযোগ দিতে বলেছেন সকলকে। তিনি বলেন, ‘তথ্যের অনুসন্ধান আসলে কোনো ধরনের মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল নয়। মানুষ যতদিন রয়েছে, ততদিন ধরেই তথ্যের অনুসন্ধান চলবে। তাই একে উন্নত করা দরকার সবাই মিলে। আর আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমার পরিবার গর্বিত। এটা আমার কাছে কম প্রাপ্তির নয়। ওয়েব সার্চের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলুক আর নাই মিলুক, আমি যা করেছি তাতে আমি খুশি।’
