তিলোত্তমা রাজধানীর স্বপ্ন ও বাস্তবতা

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৮
রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন জনসংখ্যা বাড়ছে। আনুপাতিক হারে গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও একটি যানজটমুক্ত রাস্তা নিশ্চিত করা যায়নি। ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন মানুষের কত কর্মসময় নষ্ট হয় তার কোনো হিসেব নেই। দীর্ঘ সময় গাড়ির জটে আটকে থেকে অনেকেই বিরক্ত এই মেগা সিটির ওপর। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের কোনো পথ আপাতত বোধহয় খোলা নেই। আবার রাজধানীতে প্রতিদিন কী পরিমাণ গাড়ি চলাচল করছে, তার সংখ্যাও নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। প্রতিদিনই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানীতে দূরপাল্লার বাস আসছে। বাড়ছে ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়িও। প্রতিদিন বাইরে থেকে অনেক গাড়ি ঢাকার ভেতরে প্রবেশ করে। যানজটমুক্ত মেগা সিটির জন্য যে কোনো শহরের মোট আয়তনের ২০ শতাংশ সড়ক থাকা প্রয়োজন। সেদিক বিবেচনায় ঢাকা শহরে মোট আয়তনের সাত শতাংশেরও কম সড়ক রয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন গাড়ি পথে নামায় শহরের যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ছে এই মহানগরীর পরিধি। ফলে বাড়ছে পথের দৈর্ঘ্য। রাজধানীকে তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন অনেক দিনের। অনেকেই সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। পরিবেশবান্ধব ঢাকা মহানগরী গড়ে তোলা যায়নি। পরিকল্পনার অভাব সর্বত্রই পরিলক্ষিত। এই রাজধানীকে যানজটমুক্ত করতে হলে ফ্লাইওভারের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা মহানগরীর অসহনীয় যানজট সমস্যার সমাধানে অনেকগুলো ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা ও কাজ শুরু করে। ফ্লাইওভারগুলোর বেশ কয়েকটি ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। ফলে যানজট কিছুটা হলেও কমেছে। এই ফ্লাইওভারের সঙ্গে আর বাকিগুলো চালু হলে আশা করা যায় যানজট সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে ঢাকাবাসীর। তিন দশমিক এক কিলোমিটার দীর্ঘ কুড়িল ফ্লাইওভার দিয়ে পূর্বাচল থেকে প্রগতি সরণি হয়ে রামপুরা, বনানী, নিকুঞ্জ এবং উত্তরা আবাসিক এলাকায় একমুখী যান চলাচল করছে। একদিকে যান চলাচল উপযোগী ফ্লাইওভারটি একস্তর বিশিষ্ট। পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য রয়েছে দুটি ফুটওভার। প্রতিদিন কুড়িল আন্তঃসংযোগ পথে প্রায় ২ লাখ যানবাহন এবং কুড়িল লেভেলক্রসিং দিয়ে আটানব্বইটিরও বেশি ট্রেন চলাচল করে। দেশের বিভিন্ন গন্তব্যমুখী এসব ট্রেনের জন্য সৃষ্ট যানজটের কারণে প্রায় আট কর্মঘণ্টা নষ্ট হতো রাজধানীর মানুষের। কুড়িল লেভেলক্রসিংয়ের যানজট দূর হওয়ার পাশাপাশি এই ফ্লাইওভারের মাধ্যমে পূর্বাচল নতুন শহরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবে। কুড়িল ফ্লাইওভার ছাড়াও রাজউকের শান্তিনগর থেকে ঝিলমিল প্রকল্প পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ, মৌচাক-মগবাজার-সাতরাস্তা-বাংলামোটর প্রভৃতি ফ্লাইওভার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহরের যানজট কমবে বলে আশা করা সঙ্গত। ঢাকার সঙ্গে সঙ্গে রাজউকের পূর্বাচল নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের যে কাজ চলছে সেই শহরটিও প্রায় আরেকটি ঢাকা। যাত্রাবাড়ি-গুলিস্তান ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ চলছে। সঙ্কুচিত হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি রাস্তা। অথচ বিকল্প পথে চলার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে একই রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয় যাত্রীদের। অন্য রাস্তায়ও যানজট তীব্র। বিশাল এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট— দিবারাত্রির এ যানজটে ভোগান্তি বেড়েছে সাধারণ মানুষ ও যাত্রীদের। যাত্রাবাড়ি-গুলিস্তান ফ্লাইওভার নির্মাণকে কেন্দ্রে করে ডিসিসি এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ একটু সচেতন হলেই ভোগান্তি অনেকটা কমতো। ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে রাস্তা সঙ্কুচিত হওয়া এবং যানবাহন চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হওয়া নিয়ে ট্রাফিক পুলিশও বিব্রত। একদিকে ফ্লাইওভারের কাজ চলছে অন্যদিকে গোটা ফুটপাত দখলে রয়েছে হকার ও দোকানদারদের। রাস্তায় গাড়ি চলাচলেও কোনো শৃঙ্খলা নেই। দেশের পূর্বাঞ্চলের ১৮টি জেলা থেকে ঢাকায় আসার পথে হাজার হাজার গাড়ি আটকে যাচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। যাত্রাবাড়ি-কুতুবখালী এলাকায় ফ্লাইওভারের কাজ চলছে রাস্তার মাঝখানে। সে কারণে ওই এলাকার রাস্তা সঙ্কুচিত হয়ে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ মহাসড়কের দুদিকে বিশাল জায়গা বেদখল হয়ে আছে। মহাসড়ক সংলগ্ন সড়ক দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে মার্কেট, পাইকারি শাকসবজি, মাছের বাজার, ট্রাকস্ট্যান্ড ও দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এগুলো দখলমুক্ত করে বিকল্প রাস্তা তৈরি করে দিলে অনায়াসে যানবাহন চলতে পারতো। মহাসড়ক দখলের মহোত্সব চোখে পড়ে যাত্রাবাড়ি থানা থেকে কাচপুর ব্রিজ পর্যন্ত পুরো ১৪ কিলোমিটার এলাকায়। যানজটের কারণগুলোর মধ্যে সড়ক ও ফুটপাত দখল একটি। সরকারের উচিত যানজট নিরসনে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া। যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ চলাকালীন আন্তঃজেলা বাসগুলো শহরের মধ্যে যাতে ঢুকতে না পারে কিংবা সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ি রুট দখলমুক্ত করে অন্য রুটে নিয়ে যাওয়া হলে এ রাস্তায় যেমন যানজট কমবে তেমনি ফ্লাইওভারের কাজও নির্বিঘ্নে করা সম্ভব হবে। ফ্লাইওভার নির্মাণের পরে একটি বিষয় বরাবরই লক্ষ করা গেছে— সেটি হলো ফ্লাইওভার ঠিকই চলাচলের যোগ্য হয়। কিন্তু অযোগ্য হয়ে পড়ে ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তা। যদি ফ্লাইওভারের পাশাপাশি ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তাগুলোর সংস্কার করা হয় তাহলে তা মানুষের জন্য মঙ্গলজনক হবে। ফ্লাইওভারের ওপর এবং নিচ দিয়ে যদি একইভাবে গাড়ি চলতে পারে তাহলে তা হবে যানজট নিরসনের জন্য সহায়ক। আশা করি ফ্লাইওভার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সে বিষয়ে দৃষ্টি দেবে। ঢাকা