প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সকল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে জনগণের কাছে গিয়ে নৌকা প্রতীকে ভোট চাওয়ার জন্য দলের তৃণমূল নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমরা যাকে প্রার্থী দেব তার পক্ষে সব ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। দলের প্রার্থীকে পছন্দ না হলে তার মুখের দিকে না তাকিয়ে সবাই নৌকাকে বিজয়ী করতে কাজ করবেন। এবার আমরা আগেই দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের কাজ শেষ করতে চাই, যাতে নির্বাচনের সময় একাধিক প্রার্থী নিয়ে কোন ধরনের জটিলতার সৃষ্টি না হয়।’
তিনি দলের তৃণমূল নেতাদের প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে আরো বলেন, ‘যদি মনে করেন অন্য জায়গায় আওয়ামী লীগ বিজয়ী হবে, নিজের প্রার্থী পছন্দ না হওয়ায় তাকে হারিয়ে দেবেন এসব করলে শুধু দলেরই নয়, দেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হবে। তাই প্রার্থী নয়, নির্বাচনের সময় শুধুমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও নৌকার দিকে তাকিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
গতকাল বুধবার বিকালে গণভবনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠকের তৃতীয় পর্যায়ে সিলেট মহানগর, সিলেট জেলা, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা মহানগর ও খুলনা জেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে আরেকবার বিজয়ী করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সরকারের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। তাই আবারও নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করুন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই দেশ উন্নয়নের আলোয় উদ্ভাসিত হয়, আর বিএনপি আসে দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে।
বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকতে বলতেন পাগল আর শিশু ছাড়া নাকি কেউই নিরপেক্ষ নন। এবার তিনি হয়তো পাগল ও শিশু খুঁজে পেয়েছেন বলেই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করছেন।
উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় নৌকা মার্কায় ভোট চাইতে প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা রূপকল্প-২০২১ দিয়েছি। আমাদের বিশ্বাস আছে, একমাত্র আওয়ামী লীগই তা বাস্তবায়ন করতে পারবে। আমার তো এতো কষ্ট করার দরকার ছিল না। আমি বাবা-মা-ভাই সব হারিয়েছি। আমি চাই বাংলাদেশের মানুষ উন্নত জীবন পাবে, ক্ষুধা-দারিদ্র্য থাকবে না, সবাই শান্তিতে থাকবে-এ লক্ষ্য নিয়েই আমি রাজনীতি করি। ইনশাল্লাহ আমরা দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলবোই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না বলেই স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সবদিক থেকে বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দিতে চায়। হত্যা, ক্যু, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অর্থ পাচার আর জঙ্গিবাদ সৃষ্টি-এ সবই তাদের নীতি। তাদের কাছে দেশের জনগণের ভোট, জানমাল কোনকিছুই নিরাপদ নয়।
বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে বিরোধী দলীয় নেত্রী জড়িত ছিলেন অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনা সম্পর্কে বিরোধী দলীয় নেত্রীর অবস্থান জাতির সামনে পরিষ্কার করতে হবে। বলতে হবে বিডিআর বিদ্রোহের আগে খালেদা জিয়া পালালেন কেন? কেমন করে আগেই জানলেন বিদ্রোহ ঘটবে? এখন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের হত্যার সঙ্গে জড়িত খুনিদের রক্ষার করার জন্য এতো চেষ্টা করছেন কেন? এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কি? এসবের জবাব বিরোধী দলীয় নেত্রীকে জাতির সামনে একদিন ঠিকই দিতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, এখন যখন আমরা ওই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার করছি, তখন খুনিদের রক্ষায় বিনা পয়সায় বিএনপি-জামায়াতের আইনজীবীরা খুনিদের পক্ষে কাজ করছে, বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে নানা ষড়যন্ত্র করছে। এটিও বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে। আর বিরোধী দলীয় নেত্রীর কাছে আমার প্রশ্ন-সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের হত্যার সঙ্গে জড়িত খুনিদের রক্ষায় আপনার এতো চেষ্টা কেন? এ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী কে-তার জবাব দিন। কেন আপনি পালিয়ে গেলেন?
বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন নিয়ে যখন আমরা আলোচনার আহ্বান জানালাম, তখন বিরোধী দলীয় নেত্রী সরকার উত্খাতের ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বললেন আমরা নাকি পালাবারও পথ খুঁজে পাব না। আসলে ’৯৬ সালে দেশের জনগণ তাঁকে (খালেদা জিয়া) ক্ষমতা থেকে উত্খাত করেছিল। সেই জ্বালা থেকেই তিনি আলোচনার পরিবর্তে সরকার উত্খাতের হুমকি দিলেন। কিন্তু ঢাকাবাসীসহ দেশের জনগণ তাঁর ডাকে সাড়া দেননি।
ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়গুলো ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ঠেকাতে নেতাকর্মীদের আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ঘটনার পর বিরোধী দলীয় নেত্রী বললেন ওই রাতে নাকি দেড় লাখ গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। উনি তো একজন সামরিক অফিসারের স্ত্রী, উনার তো জানার কথা দেড় লাখ গুলি হলে পুরো মতিঝিলের বাড়ি-মার্কেট, অফিস-আদালতের কী অবস্থা হতো? একটি চিহ্নও তো কেউ দেখাতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর তৃণমূল নেতাদের কাছে ১০টি প্রশ্ন সংবলিত একটি ফরম দেয়া হয়। সেখানে তারা তাদের পছন্দের তিনজন প্রার্থীর নাম লিখে এবং পছন্দের তিন প্রার্থীর সম্পর্কে কিছু প্রশ্নের উত্তর লিখে জমা দেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় বলেন, সবাইকে তিনজন প্রার্থীর নাম লিখতে হবে। একজনের নাম লিখে জমা দিলে সে ফরম বাতিল বলে গণ্য হবে। তিনি বলেন, আমাদের ভেবেচিন্তে প্রার্থী দিতে হবে। তৃণমূলের মতামত ও আমাদের জরিপ পর্যালোচনা করেই প্রার্থী দেয়া হবে। তিনি বলেন, এবার নির্বাচনের বেশকিছু সময় আগেই প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে। আমরা প্রার্থীদের সঙ্গেও বসব। তারপর মনোনয়ন দেব। একজনকে মনোনয়ন দেব, আর একজন বিকল্প হিসাবে থাকবে। কিন্তু মনোনয়ন চাইতে আসবে তো পাঁচজন। যারা মনোনয়ন পাবেন না, তাদের মান ভাঙ্গাতেও সময় লাগবে।
মতবিনিময় সভায় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, কাজী জাফর উল্লাহ, সতীশ চন্দ্র রায়, অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন আহমেদ, মাহবুবউল আলম হানিফ, ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি, আহমদ হোসেন, আবদুল মতিন খসরু, অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি, সুজিত রায় নন্দী, আমিনুল ইসলাম আমিন, এস এম কামাল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর ৭ দিনের
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিউইয়র্ক সফরসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের ৬৮তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে তিনি ৭ দিনের সফরে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর রাতে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করবেন। দুবাই হয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে নিউইয়র্ক জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছাবেন তিনি। জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। অধিবেশনে যোগদান শেষে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। পরদিন বিকাল ৫টায় প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় পৌঁছাবেন।
