আমি প্রথম হজ্বে গিয়েছি ১৯৮০ সালে। সেসময় আমার মন মানষিকতায় পরোয়ার দেগার ও তাঁর পবিত্র ভূমির প্রতি এক অকৃত্রিম ভালোবাসার অনুরনন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। যে অনুভূতি জীবনে কখনো অনুভব করিনি তাই আমার শয়নে স্বপনে জাগরণে অহর্নিশ স্ফুরণ সৃষ্টি করে যাচ্ছিল। আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলাম। যেই কাবা গৃহ জগতের সকল নবী রসূল আল্লাহর প্রেরিত দূতগণের পদচারনায় মুখরিত হয়েছে। সিজদায় ধন্য হয়েছে। সেই স্থানে আমার মত অধমের পা পড়বে মস্তক সিজদায় লুটিয়ে পড়বে। আরাফা, মুজদালেফা, মিনা, জাবালে নূর, জাবালে সওর, জান্নাতুল মুয়াল্লা, মদীনায় প্রিয় নবীজীর রওজা মোবারক, জান্নাতুল বাকী, ওহুদ পাহাড়, বদরের প্রান্তরসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত স্থানে যাবো। সারা জীবন যা ছিল শুধুই কল্পনা তা বাস্তবে দেখবো এটা ভাবতেই যেন হূদয়ের মণিকোঠায় এক অজানা প্রশান্তির সমীরণ প্রবাহিত হচ্ছিল। অবশেষে সফরের সময় নির্ধারিত হলো আমি সবার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে সম্পূর্ণরূপে প্রভু পারোয়ার দেগারের কাছে নিজকে সপে দেয়ার মানসে বের হয়ে পড়লাম। নির্দিষ্ট সময়ে আমরা নবী রসূলদের স্মৃতি বিজড়িত ভূমি পবিত্র মক্কা মুকাররমায় পৌঁছলাম। আর প্রথম যেদিন কাবাঘরে প্রবেশ করলাম ও রাববুল আলামীনের দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়লাম সেদিনের সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। এটা একমাত্র যারা হজ্বে গিয়েছেন তাঁরাই অনুভব করে থাকেন। এরপর প্রতিদিন নামাজ পড়তাম আর হূদয়ে অমীয় প্রশান্তি অনুভব করতাম। এক সময় হজ্বের দিন সমাগত হলো। আমরা মিনার সেই ঐতিহাসিক প্রান্তরে গেলাম যেখানে মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)কে কুরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। সারা রাত মিনায় থেকে ৯ই জিলহজ্ব প্রত্যুষে আরাফায় রওয়ানা দিলাম। আর যখন মুসলিম জাহানের খতিব (কাবার ইমাম যিনি আরাফা ময়দানে ভাষন দেন) আসলেন তখন গোটা আরাফা ময়দানের মানুষগুলো খুত্বা শোনার জন্য দূর দূরান্ত থেকে জমায়েত হলো। ভাষণের সময় বারবার মনে হচ্ছিল ১৪ শত বত্সর পূর্বে এই জাবালে রহমতে দাঁড়িয়ে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) তাঁর বিদায়ী ভাষণ প্রদান করেছিলেন, যা ছিল সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য শান্তির বার্তাবাহী। সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে থেকে মুজদালেফায় চলে গেলাম। সেখানে রাত্রি যাপন করলাম। লক্ষ লক্ষ মানুষের খোলা আকাশের নীচে এভাবে রাত্রি যাপনের দৃশ্য আর কোথাও নেই। সকাল বেলা আবার মিনায় প্রত্যাবর্তন করলাম। সেখানে শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করলাম। মাথা মন্ডন ও কুরবানী করলাম। তারপর কাবাঘর তাওয়াফ করতে এলাম। কালো পাথর চুম্বন করলাম। সবশেষে মদীনায় রওয়ানা হলাম। মদীনায় যাওয়ার পর সেখানেরও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ মনে প্রশান্তি এনে দিল। রসূলের (স.) জামানয়ই কেবল মদীনা প্রশান্ত ছিল তাইই নয় আজো সেই বেহেশিত আবহ বিরাজমান। যে রসূলের জন্য হূদয় আমার ব্যাকুল, যে রসূলের জন্য হূদয়ের জমিনে একটি ভালোবাসার বৃক্ষ পত্র-পল্লবে ছেয়ে গেছে, ফুলে ফলে সুশোভিত করছে, সেই নবী মুহাম্মদ (স.) এর পবিত্র রওজা মোবারক দেখার সৌভাগ্য হলো। রসূলের পাশে যাওয়ার নছিব হলো। ছালাম জানানোর সেই দুর্লভ সুযোগ হলো। তখন মনের অজান্তে কখন যে, আবেগ্রাপ্লুত হয়ে পড়লাম, আর কখন যে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লাম বুঝতে পারিনি। নিশ্চয়ই এটা আনন্দ অশ্রু। শোকের বা দুঃখের নয়। তারপর রসূলের খুত্বা দেয়ার জায়গা রিয়াজুল জান্নায় নামাজ পড়লাম। মসজিদে নববীতে ৮ দিনে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ পড়লাম। এর মধ্যে রসূলের ঈদগাহ শিবে আখবারে গেলাম। মসজিদে জুমআ, মজসজিদে কুব্বা, বদরের প্রান্তর ও ওহুদের প্রান্তর ইত্যাদি জায়গাগুলি দর্শন করলাম। মক্কায়ও সব দর্শনীয় জায়গা ভ্রমণ করলাম। সব শেষে যখন বিদায়ের দিন এলো, মন তখন এক অব্যক্ত বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়লো। সেই যে চলে এসেছিলাম তারপর ১৯৯৭ সালে আবার গিয়েছি। তারপর বহুবার ওমরা হজ্ব সম্পন্ন করেছি। যতবার এই পবিত্র ভূমিতে যাই ততোবারই যেন মনে হয় নতুন এলাম। এই পবিত্র ভূমির প্রতি এক অকৃত্রিম ভালোবাসার আকর্ষণ কখনো শেষ হবার নয়। তাই বারবার যেতে ইচ্ছা করে আমার প্রিয় নবীজীর স্মৃতিবিজড়িত সোনার মদীনা ও মক্কায়। কেননা এ হূদয়তো পড়ে আছে সেই ধূ-ধূ মরুভূমির দেশ নবীজীর শহরে।
—লেখক :সাবেক ভিসি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটি
