আড়তদারদের দাদন-কমিশন চক্রে বন্দী মনপুরার জেলেরা

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:২২
মনপুরার শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মত্স্য সম্পদের উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ইলিশের মৌসুম আসার আগ দিয়ে এই অঞ্চলে শুরু হয়ে যায় জাল, নৌকা ও ট্রলার বানানোর হিড়িক। এখানকার জেলেরা অত্যন্ত গরীব। জাল, নৌকা বা ট্রলার বানানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। তাই বাধ্য হয়ে মহাজন বা আড়তদারদের নিকট থেকে নগদ টাকা দাদন নিয়ে জাল, নৌকা, ট্রলার তৈরি করে তারা। বাড়তি মুনাফার আশায় আড়তদাররাও জেলে, মাঝি, নৌকা ও ট্রলারের মালিকদের দাদন দিয়ে থাকেন। চুক্তি থাকে যেসব নৌকা ও ট্রলারের মালিক আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে মাছ শিকার করে সেসব নৌকা ট্রলারের মাছ সেই আড়তদারদের কাছেই বিক্রি করতে হবে। দাদন দেয়া আড়তদার ছাড়া অন্য কারো কাছে মাছ বিক্রি করা যাবে না। জেলেরা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে দিনরাত মেঘনায় মাছ শিকার করে দাদন ব্যবসায়ীদের গদি ঘরে যখন মাছ বিক্রি করতে আসে তখন ডাকে যত টাকার মাছ বিক্রি হয় তত টাকা বিক্রয়ের উপর আড়তদার শতকরা ১৫ টাকা হারে কমিশন পায়। তবে এতে জেলেদের দাদনের পরিমাণ কিন্তু কমে না। অর্থাত্ জেলেদের দাদন নেয়ার কারণে একদিকে যেমন নির্দিষ্ট আড়তদারের কাছে মাছ বিক্রি করতে হয়, সেই সঙ্গে তাকে দিতে হয় কমিশন। যখন মেঘনায় মাছের আকাল চলে তখনও আড়তদারেরা কমিশন পেতে থাকে। মাছ পড়ুক বা নাই পড়ুক তাদের কমিশন কখনও বন্ধ হয় না। এতে জেলেদের চেয়ে আড়তদার লাভজনক অবস্থানে থাকে সবসময়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি ছোট নৌকা ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা, মাঝারি ট্রলার প্রতি ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ টাকা এবং বড় ফিশিং বোট ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ টাকা দাদন নিয়ে থাকে জেলেরা। দাদনের এত টাকা পরিশোধ করা তাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ। ফলে বাধ্য হয়ে আড়তদার বা মহাজনদের কাছে জিম্মি থাকতে হয় জেলেদের। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সাকুচিয়া ইউনিয়নের মাস্টার হাট, খাড়ির খাল, লতাখালী, তালতলা, সূর্যমুখী, জনতা বাজার, মাঝের ঘাট, চরপিয়াল মত্স্য ঘাটে মাছ বিক্রি হচ্ছে প্রতি হালি ছোট ইলিশ ৮শ’ টাকা, মাঝারি ইলিশ ১২শ’ টাকা এবং বড় ইলিশ ১৪শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা। হাজির হাট ইউনিয়নের নাইবের হাট, হাজির হাট, জংলার খাল, রিজির খাল, সুইজের খাল ঘাটে মাছ বিক্রি হচ্ছে প্রতি হালি ছোট ইলিশ ১ হাজার থেকে ১২শ’ টাকা, মাঝারি ইলিশ ১৪শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা, বড় ইলিশ ১৮শ’ থেকে ২২শ’ টাকা এবং মনপুরা ইউনিয়নের রামনেওয়াজ বাজার ঘাট, কাটাখাল, ফকিরের দোন, বেতুয়া খাল, কলাতলী চরে মসজিদ খাল ঘাটে বিক্রি হচ্ছে ছোট ইলিশ প্রতি হালি ১ হাজার থেকে ১৩শ’ টাকা, মাঝারি ইলিশ ১২শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা, বড় ইলিশ ১৮শ’ থেকে ২৪শ’ টাকায়। জেলেরা ইলিশ ধরে প্রথমে দাদন নেয়া আড়তদারের গদি ঘরে মাছ তোলার পর মাছ বেপারি ও পাইকারি ব্যাবসায়ীরা মাছগুলো ডাক হাঁকিয়ে ক্রয় করে। এতে যত টাকার মাছ গদি ঘরে বিক্রয় হয় তার উপর আড়তদার কমিশন পায়। আবার বেপারি ও পাইকারি ব্যবসায়ী ঢাকার আড়তদারের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা দাদন নিয়ে ব্যবসা করেন। এরপর বেপারি সংগৃহিত মাছ ঢাকার আড়তদারের নিকট বিক্রি করেন এবং একই নিয়মে দাদন নেয়া মত্স্য বেপারি ঢাকার আড়তদারগুলোকে কমিশন দিয়ে থাকে। মনপুরা থেকে মাছে বরফ দিয়ে ঝুড়িতে করে পাঠানো মাছ এভাবেই প্রতিদিন যাচ্ছে চাঁদপুর এবং ঢাকার সদর ঘাট, কাওরান বাজার, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। মোছলেউদ্দিন মাঝি, জসিম মাঝি, কালাম মাঝি বলেন, ‘ভাই আমরা গরীব মানুষ। মেঘনায় মাছ ধরতে গেলে জাল, নৌকাসহ ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ টাকা চালান লাগে। এত টাকা জোগাড় করা আমাদের মত গরীব জেলেদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে আড়তদারের কাছ থেকে দাদন নিয়ে মেঘনায় মাছ ধরে ৭/৮ জনের সংসার চালাই। কমিশন নেয়া প্রসঙ্গে আড়তদার নিজামউদ্দিন হাওলাদার, কামাল, মিজানসহ কয়েকজন আড়তদার বলেন, গরীব জেলেরা যাতে মাছ শিকার করতে পারে সেজন্য জাল, নৌকা বা ট্রলার বানানোর জন্য টাকা দিয়ে আমরা তাদের সহযোগিতা করি। আর এজন্য আমরা জেলেদের কাছ থেকে মুনাফা (কমিশন) বাবদ নির্ধারিত হারে কিছু টাকা পেয়ে থাকি।’