ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না মানুষের আয়

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:০১
দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয় না বাড়ায় দেশে সঞ্চয়প্রবণতা কমে গেছে। ফলে গত তিন বছর ধরে জিডিপিতে (মোট দেশজ উত্পাদন) দেশজ সঞ্চয়ের (অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়) অবদান স্থির হয়ে পড়েছে। সঞ্চয় কমার সাথে কমে গেছে বিনিয়োগ প্রবণতাও। গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কট আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় বিনিয়োগ করে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ফলে নতুন উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে ভরসা পাচ্ছেন না। এতে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের অবদান কমতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (বিবিএস) তথ্যে দেখা গেছে, গেল অর্থবছরে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের অবদান আগের বছরের তুলনায় কমে গেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে জিডিপিতে বিনিয়োগের অবদান ছিল ২০ শতাংশ। যা গেল অর্থবছরে কমে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জিডিপিতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অর্থ হলো-বিনিয়োগ কমে গেছে তা নয়, তবে কাঙ্ক্ষিত হারে বিনিয়োগ বাড়ছে না। এর কারণ জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট শেকিল চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তাছাড়া দেশে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কটতো রয়েছেই। তিনি বলেন, যারা বিনিয়োগ করেছেন তারা সঠিকভাবে গ্যাস-বিদ্যুত্ না পাওয়ায় ভালোভাবে উত্পাদন করতে পারছেন না। এ অবস্থায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও অবকাঠামো সুবিধা দিতে পারলে বাংলাদেশ বিনিয়োগের উত্কৃষ্ট স্থান হতে পারে। এদিকে গত অর্থবছরে তেল ও গ্যাসের ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে। জিডিপিতেও সরকারি বিনিয়োগের অবদান বেড়েছে। তথ্যে দেখা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে জিডিপিতে সরকারি বিনিয়োগের অবদান ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। যা ২০১২-১৩ তে বেড়ে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে পরোক্ষভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ উত্সাহিত হয়। কিন্তু তা হয়নি। উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারি বিনিয়োগ বাড়ায় গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নতি হয়েছে। কিন্তু শিল্প-বাণিজ্যের সহায়ক রাস্তাঘাট, অবকাঠামো ও দীর্ঘ মেয়াদে গ্যাস-বিদ্যুত্ পরিস্থিতির উন্নয়ন তেমন দেখা যাচ্ছে না। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে দেখা গেছে, গত তিন অর্থবছর ধরে জিডিপিতে দেশজ সঞ্চয়ের অবদান ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে স্থির হয়ে আছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জিডিপির শতকরা হারে দেশজ সঞ্চয় ছিল ২০ দশমিক ১ শতাংশ। এরপর থেকে এ হার কমে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে স্থির হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় সঞ্চয়ের (অভ্যন্তরীণ ও প্রবাসীদের মোট সঞ্চয়) অবদানও কমতে শুরু করেছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয় ছিল জিডিপি’র ৩০ শতাংশ। যা ২০১২-১৩ তে সাড়ে ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সঞ্চয়প্রবণতা কমে যাওয়ায় ব্যাংকের আমানত ও সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগে প্রভাব পড়ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধির (৭ দশমিক ২ শতাংশ) জন্য যে পরিমাণ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের প্রয়োজন তা অর্জন হচ্ছে না। এর কারণ হিসাবে তারা বলছেন, দ্রব্যমূল্য বাড়ায় অনেক মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে সঞ্চয় কমে যাচ্ছে। আর বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণ হলো-গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবকাঠামোগত সমস্যা ও ব্যাংকের অর্থায়ন সংক্রান্ত সমস্যা। এসব সমস্যা স্থায়ী সমাধানে সরকারের যথেষ্ট পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে না। ফলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের ভরসা করতে পারছেন না। এদিকে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে না বাড়ায় দেশে কর্মসংস্থান তৈরি ও প্রত্যাশিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন শঙ্কার মুখে পড়েছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাক’কে বলেন, বর্তমানে দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটই বিনিয়োগের অনুকূল মনে করছেন না উদ্যোক্তারা। ফলে বিনিয়োগ কমছে। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো উন্নতি, দুর্নীতি রোধ এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট দূর করতে পারলে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। বিনিয়োগের স্বার্থে উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারকে জমির ব্যবস্থা করতে হবে বলেও তাগিদ দেন এ অর্থনীতিবিদ। ড. আহসান মনসুর আরো বলেন, বিনিয়োগ সমপ্রসারিত করতে না পারলে গোটা অর্থনীতিতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ এর সাথে কর্মসংস্থান, জিডিপিসহ বিভিন্ন বিষয় জড়িত। ব্যাংকের আমানত ও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মূল্যস্ফীতির সাথে সমানতালে বাড়েনি মানুষের আয়। ফলে মানুষের সঞ্চয়ের উপর প্রভাব পড়েছে। যা ব্যাংকের আমানত ও সঞ্চয়পত্র বিক্রির উপর প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরে যথেষ্ট তারল্য রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিনিয়োগের যথেষ্ট পরিবেশ না থাকায় ব্যাংকে টাকা অলস পড়ে আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গেল অর্থবছরে দেশের আমানত বেড়েছে ১৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অথচ আগের অর্থবছরে আমানত বেড়েছিল ১৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগে দেখা গেছে আরও হতাশাজনক চিত্র। সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের শুরুতে এ খাতের মাধ্যমে সরকার ৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। পরবর্তীতে নিট বিক্রি কম হওয়ার প্রেক্ষিতে বছরের শেষদিকে এসে সংশোধন করে লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। বছর শেষে দেখা গেছে, এ খাতে নিট বিক্রি হয়েছে ৭৭৩ কোটি টাকা। অর্থাত্ প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১০ শতাংশ বিক্রি হয়েছে।