রক্তস্বল্পতা ও প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৫৪
বাংলাদেশে ৫ বছরের কমবয়সী শিশুদের শতকরা প্রায় ৫৫ ভাগ রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। রক্তস্বল্পতা অতি সহজে নিরাময়যোগ্য অপুষ্টিজনিত রোগের একটি। শিশুরা, বিশেষত; বৃদ্ধিরত সময়ে অপুষ্টি বা রক্তস্বল্পতা সমস্যা অতি ঝুঁকিপূর্ণ। শৈশবজীবনে রক্তস্বল্পতা স্বাভাবিক দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধিতে মারাত্মক বিরুপ প্রতিক্রিয়া ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ প্রদত্ত এক সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায় বিশ্বে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন শিশু রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিশু কিশোরদের রক্তস্বল্পতার সমস্যা সবচেয়ে বেশী এবং তা মোট সংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগকেও ছাড়িয়ে যাবে। ন্যাশনাল সার্ভিলেন্স প্রজেক্ট কর্তৃক প্রকাশিত এক তথ্য মতে বাংলাদেশের ২-৬ বছর বয়সী স্কুল পূর্ববর্তী শিশুদের অর্ধেকের এবং স্কুুলে যায় এমন শিশুদের এক তৃতীয়াংশের রক্তস্বল্পতাজনিত সমস্যা বিদ্যমান। এই সংস্থার প্রকাশিত অন্য এক তথ্যে দেখা যায় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের প্রায় ২৩ মিলিয়ন শিশু রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। রক্তস্বল্পতা ইংরেজী শব্দ এনিমিয়া-এর বাংলা রুপ যার উত্পত্তি প্রাচীন গ্রীক শব্দ অ্যানাইমিয়া থেকে যার অর্থ রক্তের ঘাটতি। রক্তস্বল্পতা বলতে বুঝায় রক্তে স্বাভাবিকের চাইতে কম পরিমাণ লোহিত কনিকা বা হিমোগ্লোবিন থাকা। হিমোগ্লোবিনের অক্সিজেন আকর্ষণের ক্ষমতা কমে গেলেও তাকে রক্তস্বল্পতা বলা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হিমোগ্লোবিন থাকে লোহিত রক্ত কনিকার মধ্যে এবং তা ফুসফুস থেকে অক্সিজেন বহন করে টিস্যু/কলায় পৌছায়। হিমোগ্লোবিনের গঠনের জন্য লৌহ অপরিহার্য। যেহেতু দেহের প্রতিটি কোষ বাঁচার জন্য অক্সিজেনের উপর নির্ভরশীল, তাই রক্তস্বল্পতায় কোষে কম পরিমাণ অক্সিজেন পৌছানোয় নানান ধরণের সমস্যার সৃষ্টি হয়। ক্ষুধামান্দ্য, শরীর ক্লান্তি বোধ করা, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা, সর্বদা অস্বস্তি বোধ করা, অস্বাভাবিক হূদকম্পন, নখের আশে-পাশের জায়গার বর্ণ পরিবর্তন প্রভৃতি রক্তস্বল্পতার প্রধান লক্ষণ। রক্তস্বল্পতার কিছু অপ্রধান লক্ষণ হলো হাত/পা ফুলে যাওয়া, বুক জ্বালা করা, বমিবমি ভাব/বমি হওয়া, বেশী বেশী ঘাম ঝড়া, মলের সাথে রক্ত যাওয়া প্রভৃতি। রক্তস্বল্পতার নানা শ্রেণী বিভাজন থাকলেও বাংলাদেশর শিশুদের ক্ষেত্রে লৌহের অভাজনিত (Iron deficiency) Amenia-র প্রকোপ সবচেয়ে বেশী এবং তা মারাত্মকও বটে। রক্তস্বল্পতার কারণ অনুসন্ধান করলে যে জিনিসগুলি প্রথমেই উঠে আসে তা’হলো খাবারে পরিমাণ মত লৌহ, ফলিক এসিড, ভিটামিন বি-১২ এর অভাব, বেশী বেশী চা/কফি পান করা, খাবারের লৌহ শরীরে ঠিকমত শোষিত না হওয়া, কৃমির সংক্রমণ প্রভৃতি। গরুর দুধ বাচ্চাদের জন্য উপকারী হলেও তাতে লৌহের পরিমাণ খুবই কম এবং তা লৌহ শোষণ কমিয়ে দেয়। শৈশব বা কৈশরে কোন শিশুর রক্তস্বল্পতা দেখা দিলে তার স্বভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি, বুদ্ধিমত্তার বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হাঁড় গঠন, স্বাভাবিক আচার-আচরণ প্রভৃতি বাধাগ্রস্ত হয়। রক্তস্বল্পতার কারণে কখনও কখনও আবার অনিয়মিত হূদকম্পন, বুকে ব্যথা, হূিপন্ডের অস্বভাবিক বৃদ্ধি, হূদক্রিয়া বন্ধ হওয়া প্রভৃতিও হতে পারে। কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশু এবং বাড়ন্ত সময়ের শিশুদের লৌহের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশী। কারণ এসময় শরীরে লৌহের স্বল্পতা জনিত রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি থাকে। সামপ্রতিক এক তথ্যে দেখা যায় সে সব শিশুর রক্তস্বল্পতার সমস্যা আছে তাদের শ্রেণী কক্ষে মনোনিবেশ ও শিক্ষা গ্রহণ ক্ষমতা অন্য যাদের রক্তস্বল্পতা নেই তাদের চেয়ে অনেক কম। বয়স অনুপাতে মানব দেহে ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণে লৌহের প্রয়োজন হয়। ১-৮ বছর বয়সী শিশুদের দৈনিক ৭-১০ মি.গ্রা, ৯-১৮ বছর বয়সী (বালক) ৮-১১ মি.গ্রা, ৯-১৮ বছর বয়সী (বালিকা) ৮-১৫ মি.গ্রা, পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ ৮ মি.গ্রা এবং পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ ৮ মি.গ্রা এবং পূর্ণ বয়স্ক স্ত্রী লোক ১৮ মি.গ্রা লৌহ প্রয়োজন। বিশেষ ক্ষেত্রে দৈনিক সর্বোচ্চ ৪৫ মি.গ্রা পর্যন্ত লৌহ সেবন করা যেতে পারে। আমরা যে সমস্ত খাবার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লৌহ পাই সেগুলি হলো বৃক্ক, যকৃত, মাংস, কার্প জাতীয় মাছ, সামুদ্রিক মাছ, শুকনা ফল, কমলা লেবু, স্ট্রবেরী, টমেটো, ব্রোক্কলী, বিভিন্ন শস্য (গম, যব, ভূট্টা প্রভৃতি), সীম, কাঁচকলা এবং ডিম। পরিমাণ হিসাবে বিবেচনা করলে ১০ গ্রাম মুরগীর মাংশ/যকৃত থেকে ৮.৮ মি.গ্রা, ১৫ গ্রাম গরুর মাংস থেকে ৫.৫ মি.গ্রা, ১টি বড় মাপের ডিম থেকে ০.৭ মি.গ্রা লৌহ পাওয়া যায়। তবে এও মনে রাখা জরুরী যে, আমরা খাবারে যে পরিমাণ লৌহ খাই তার মাত্র ১৫% দেহে শোষিত হয়। শিশু জন্মের ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ লৌহসহ যাবতীয় খনিজের যোগানদাতা হিসাবে যথেষ্ট। তারপর শরীরে লৌহের চাহিদা অনেক বাড়াতে অন্য উত্স থেকে লৌহ সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়। সময়মত খাবার না খাওয়া, অল্প পরিমাণ খাবার খাওয়া, বিভিন্ন রকমের পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া/ খাওয়া, খাবারের প্রতি অরুচি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কারণে শিশুদের লৌহের অভাব একটি সমন্বিত পুষ্টি পরিপূরক বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। একটি সমন্বিত পুষ্টি পরিপূরকে প্রয়োজনমত নানা ধরণের ভিটামিন ও মিনারেল থাকে যা শিশুর সকল ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব পূরণ করে। আর রক্ত স্বল্পতার চিকিত্সায় মুখে খাওয়ার লৌহ পরিপূরক ব্যবহার সারা বিশ্বে স্বীকৃত ও সমাদৃত।