হাওর এক্সপ্রেস বনাম যাত্রীসেবা

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪১
মোহনগঞ্জ-ঢাকা-মোহনগঞ্জ রুটে সদ্য চলাচল শুরু করেছে হাওর এক্সপ্রেস। দীর্ঘদিনের দাবিপূরণ, স্বপ্নপূরণ, চাহিদাপূরণ যেভাবেই বলি না কেন এটি চালু হওয়াতে বৃহত্তর ময়মনসিংহ এমনকি সিলেটের একাংশের জনগণ বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছে। রেলের এরকম একটা সার্ভিস স্বভাবতই প্রশংসার দাবি রাখে। সঠিক সময়ে ট্রেনের ছেড়ে যাওয়া এবং গন্তব্যে পৌঁছার কাজটিও সময়মতো হয় যদি সংশ্লিষ্ট সবাই সহযোগিতা করে। এজন্য রেল কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি দায়বদ্ধ। ‘ন’টার ট্রেন ক’টায় ছাড়ে’— এরকম একটি প্রচলিত বাক্য আমরা শুনে অভ্যস্ত। যথাসময়ে ট্রেন আসবে, ছেড়ে যাবে এবং গন্তব্যে পৌঁছুলে যাত্রী সাধারণ হয়রানিতে পড়বে না— এই নিশ্চয়তা বিধানই রেলসেবার প্রথম কথা। রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, রেলের কর্মচারী বিশেষভাবে স্টেশন মাস্টার, বুকিং মাস্টার, গার্ড, টিকেট চেকার সবার ওপরই রেল বিষয়ক কতিপয় দুর্বলতা নির্ভরশীল। দুর্নীতিকে সবাই চিহ্নিত করতে পারি, দেখিয়ে দিতে পারি কিন্তু সমাধানেই যত আলস্য। বিনা টিকেটে ট্রেনে চড়া নিয়ে একটি ছড়া পড়েছিলাম ছোটবেলায়— মামুদ মিয়া বেকার/ তাই বলে কি সাধ নাই তার/ বিশ্ব ঘুরে দেখার? /আসলে পরে চেকার/ বললে হেসে মামুদ মিয়া/ ট্রেন কি তোমার একার? কাউকে বলতে শুনেছি— সরকারকে কয়টি টাকা নাইবা দিলাম। সরকারের ট্রেনে চড়বো অথচ ন্যূনতম একটা অর্থ সরকারকে দিতে (এটা কিন্তু জনগণেরই ফান্ড) পারবো না? তাহলে রেলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে কী করে? আবার রেলে এমন সব খাত আছে যেগুলোতে বাস্তবভিত্তিক কোনো পদক্ষেপ নেই। অনেক অনুত্পাদনশীল খাত আছে দেদার টাকা খরচ হচ্ছে। অনেক অফিসার কর্মচারীর পদ আছে বেতন দেওয়া হচ্ছে— চেয়ার-টেবিল-ফ্যান সবই আছে; কর্মকর্তা বা কর্মচারী সশরীরে নেই। লক্ষ কোটি টাকার রেল যন্ত্রপাতি বৃষ্টিতে ভিজছে, রোদে ফাটছে, চুরি হচ্ছে তেল, বেহাত হচ্ছে যন্ত্রপাতি— কোনো তদারকি নেই। জনগণের বিরাট একটি অংশ তাই একটা ধারণা পেয়ে বসেছে— দুর্নীতিবাজ এদের কয়টা টাকার টিকেট না কাটলে কীইবা আসে যায়। কখনো কিছু শক্তিশালী লোক রাজনৈতিক সফরের নামে লাখ লাখ টাকার ভাড়া বকেয়া রেখেছেন এমন খবরও পড়েছি পত্রিকায়। সড়কপথে বিগত দিনগুলোতে যথেষ্ট উন্নতি হলেও কিছু কিছু জনপদ আছে রেলপথই ভরসা। হাওর এক্সপ্রেসের মতো আন্তঃনগর ট্রেনটি তার বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রম অটুট রাখবে বলে আমরা আশাবাদী। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে ট্রেনটির বিষয়ে কিছু সমস্যা তুলে ধরছি— ক) ট্রেনটি ঢাকায় পৌঁছার পর ফিরতে সময় রাত বারোটার দিকে থাকার ফলে যারা নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, পশ্চিম সিলেটের অধিবাসী তাদের জন্য সমস্যা তৈরি হয়েছে। প্রথমত, নারী ও শিশুদের জন্য নৈশকালীন ট্রেনভ্রমণে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। টিকেট কেটেও সিট না পেলে অবস্থা আরো বেগতিক। দ্বিতীয়ত, ভোর চারটার দিকে যখন শ্যামগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছায় তখন এ এলাকার ঢাকায় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী, অসুস্থ যাত্রীরা না পান রিকশা, বাস কিংবা কোনো বাহন। ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত স্টেশনে বসে থাকতে হয় অনিরাপদ একটা অবস্থায়। নারীদের দুরবস্থা তো সহজেই অনুমেয়। খ) শ্যামগঞ্জ অঞ্চলে মইলাকান্দা রেলক্রসিংয়ে ক্রসিংবার থাকার পরও এটি যান্ত্রিকভাবে অচল এবং গেটম্যান নেই। দুর্ঘটনা যে কোনো সময়ই ঘটে যেতে পারে। গ) গত ঈদে টিকেটের তুলনায় অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানোর ফলে ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যায় এবং টিকেটধারী অনেকেই দাঁড়িয়ে ঢাকা পৌঁছেন। ছাদে উঠেও যাত্রীদের চলাচল করতে হয়েছে। এতে আন্তঃনগর ট্রেনের চরিত্র হারিয়ে যায়। এই সমস্যাগুলো সমাধানে কিছু সুপারিশ করছি— অ) ঢাকা থেকে ফেরার সময়সূচি পরিবর্তন করে সন্ধ্যা ছয়টায় করা যেতে পারে। প্রয়োজনবোধে বাড়তি ট্রেন দেওয়া। আ) ট্রেনে বগি সংখ্যা বাড়ানো। ই) দাঁড়িয়ে যাওয়ার টিকেট না দেওয়া। প্রতিটি স্টপেজে বরাদ্দকৃত টিকেটের সংখ্যা বাড়ানো। ঈ) বিনা টিকেটের যাত্রীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের তত্পরতা বাড়ানো। এক্ষেত্রে টুপাইস কামিয়ে বিনাটিকেটের যাত্রীদের সুবিধে করে দিতে জড়িত রেল কর্মচারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা। উ) সার্বক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়োজিত রাখা। ঊ) ব্লাকে টিকেট বিক্রি নিষিদ্ধ করা। একজন যাত্রী সর্বোচ্চ দুটি টিকেট সংগ্রহ করতে পারবে এরকম ব্যবস্থার সুফল পরীক্ষা করা যেতে পারে। অবশ্য পারিবারিকভাবে দুয়ের অধিক টিকেট কাটা হতে পারে— এক্ষেত্রে স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে সরাসরি আলাপ করা যেতে পারে। ঋ) টিকেটের ক্ষেত্রে কোটা নিয়ম চালু থাকার ফলে অনেকে সেই সুযোগ গ্রহণ করে কোনো প্রমাণপত্র দাখিল ছাড়াই। প্রভাবশালী, ভিআইপির নামে, রাজনৈতিক পরিচয়ে কিছু টিকেট গায়েব হয়ে যায় আগেই; এটা বাঞ্ছনীয় নয়। এক্ষেত্রে সবার জন্য সমান আইন— বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। সাধারণ যাত্রীরা রেলের সেবা প্রত্যাশী, ভুক্তভোগী। এদের বিষয়টিকেই বিবেচনা করা উচিত। এ) রেল কর্তৃপক্ষ প্রতিটি স্টপেজে প্রতি বছর সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার ব্যবস্থা করতে পারেন। যাত্রীসাধারণের দেওয়া মত ও প্রস্তাবের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায় এরকম সিদ্ধান্তই কার্যকর করতে পারলে সমস্যাগুলো কিছুটা লাঘব হতে পারে। ঐ) বিনাটিকেটের যাত্রীর মতো অপরাধীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে টিকেট চেকারের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। প্রতি কামরায় সার্বক্ষণিক দুইজন চেকার দেওয়া উচিত। সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের তত্পর থাকতে হবে। দেখা যায় টিকেট চেক করতে গিয়ে বিনাটিকেটের কিছু অসাধু প্রভাবশালী যাত্রীদের দ্বারা হেনস্তা হয়ে থাকেন টিকেট চেকাররা। যদিও এটি কারোরই কাম্য নয়। প্রসঙ্গত, ট্রেনে ঢিল ছোড়ার পরিণাম ভয়াবহ। এটি সম্প্রতি একজন নববধূর করুণ মৃত্যু সবাইকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বখাটেদের খামখেয়ালিপনার কারণে এ ধরনের অঘটন ঘটে। বিষয়টির ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা করা উচিত। সমাজের বিবেকবান প্রতিটি নাগরিকেরই এ ব্যাপারে সহযোগিতা করা বাঞ্ছনীয়। এ ব্যাপারে প্রতিটি রেলস্টেশন সংলগ্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রী, বস্তি, বাসাবাড়ি, কলোনিগুলোতে প্রচারণা চালানো দরকার। ময়মনসিংহ