পদ্মার নাব্যতা সংকট

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪১
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া এবং কাওড়াকান্দি-মাওয়া রুটের নৌপথ ফেরি ও লঞ্চ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ায় রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবহনব্যবস্থা প্রায় অচলাবস্থার শিকার। কাওড়াকান্দি ও মাওয়া নৌপথে প্রায়ই নাব্যতার অভাবে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকে। দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া রুটে ফেরি চলাচলও বন্ধ হওয়ার পথে। নৌপথে নাব্যতার অভাবে দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া এবং কাওড়াকান্দি-মাওয়া রুটের দুই পাড়ে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ফেরি ও যাত্রী পারাপারে সৃষ্টি হচ্ছে মহাসংকট। নাব্যতা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। পলি ও বালু জমে নৌচ্যানেল ভরাট ও সরু হয়ে গেছে। অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় চলাচলকারী ফেরিগুলো প্রায়ই সেখানে আটকে পড়ছে। সম্প্রতি ফেরি আমানত শাহ দৌলতদিয়া চ্যানেলে গিয়ে ডুবোচরে আটকে পড়লে সরু চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে টানা আট ঘণ্টা ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকে। এ সময় দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে নদী পারাপারের অপেক্ষায় আটকে থাকে শত শত যান। পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে পানি হ্রাস পাওয়ায় নৌপথে নাব্যতা সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্রোতের তোড়ে পলি ও বালু জমে দৌলতদিয়া চ্যানেলটি ভরাট হয়ে সেখানে অসংখ্য ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। চ্যানেলটি সরু হয়ে যাওয়ায় দুটি রো রো (বড়) ফেরি পাশাপাশি চলাচল করতে পারছে না। যানবোঝাই ফেরিগুলো দৌলতদিয়া চ্যানেল অতিক্রম করতে গিয়ে প্রায়ই ডুবোচরে গিয়ে আটকে পড়ছে। বিকল্প কোনো চ্যানেল না থাকায় এ সময় কর্তৃপক্ষ নৌপথের সব ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। একটি রো রো ফেরি স্বাভাবিক চলাচলের জন্য কমপক্ষে সাড়ে সাত ফিট পানির গভীরতা প্রয়োজন। অথচ এ নৌপথের দৌলতদিয়া চ্যানেলে বর্তমানে পানির গভীরতা রয়েছে মাত্র ছয় ফিট। এ কারণে ফেরিগুলো ধারণ ক্ষমতার অর্ধেক লোড নিয়ে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ধীরগতিতে চলাচল করছে। নৌরুটে পর্যাপ্ত মার্কার না থাকায় রাতে ফেরি চলাচলে ব্যাপক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। দৌলতদিয়া চ্যানেলের নাব্যতা সংকট দ্রুত নিরসন করা না হলে কিছুদিনের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ এ নৌরুটটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বর্ষায়ও নাব্যতা সংকটের কারণে মূলত মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে ফেরিসহ নৌচলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। একের পর এক ফেরি আটকে একদিকে ফেরি পারাপার হুমকির মুখে পড়েছে, অন্যদিকে ফেরিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ডুবোচর সাঙ্কেতিক মার্কিং না থাকায় পরিস্থিতি এ মুহূর্তে আরো জটিল হয়ে পড়েছে। ফলে উভয় ঘাট এলাকায় আটকে পড়েছে শত শত যানবাহন। নাব্যতা সংকটে ডুবোচরে ফেরি আটকানোর ঘটনা যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফেরিগুলো ধারণক্ষমতার কম যানবাহন নিয়ে পারাপার হয়েও বারবার ডুবোচরে আটকে যাচ্ছে। নাব্যতা সংকটকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে নদীতে অপ্রতুল মার্কিং ও সিগন্যাল বাতি সংকট। নির্দেশক মার্কিং না থাকায় ফেরিগুলো অল্পতেই ডুবোচরে আটকে যাচ্ছে। দ্রুত বড় আকারে ড্রেজিং শুরু না করলে আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে কী অবস্থা হবে তা ভাবাই যাচ্ছে না। উজান (ভারত) থেকে শুধু পানি কম পাওয়াই নয়, অতিরিক্ত পলি পড়ে ও পানি প্রবাহ কমের কারণে নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। এ হারে পানি কমতে থাকলে শুষ্ক মৌসুমে রুটটি ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন হবে। পদ্মা নদীতে সেতু না থাকায় দেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সড়কপথে সরাসরি যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাস-ট্রাকসহ সব ধরনের যানবাহন ফেরিতে পার হয়। নাব্যতা না থাকায় ফেরি চলাচলে সৃষ্টি হয়েছে প্রতিবন্ধকতা। বাসযাত্রীদের একটি বড় অংশ লঞ্চে নদী পার হয়ে একই পরিবহনের অন্য গাড়িতে করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাতায়াত করে। লঞ্চ চলাচল মাঝে মাঝে বন্ধ থাকায় হাজার হাজার যাত্রী নাকাল অবস্থার শিকার হন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কাওড়াকান্দি-মাওয়া এবং দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ার নৌচ্যানেলে নাব্যতা পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে। এই দুই রুটের মধ্যে ব্যাপক হারে চর পড়ায় নৌচলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন ঝুলে যাওয়ায় রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ কবে সম্ভব হবে কে জানে। রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা রয়েছে তা বন্ধ হয়ে গেলে গণমানুষের ক্ষোভই শুধু বাড়াবে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা দেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য বিড়ম্বনা সৃষ্টি করবে— যা কাম্য হওয়া উচিত নয়। রাজধানীর সঙ্গে পদ্মাপাড়ের বিশাল অঞ্চলের যোগাযোগ নির্বিঘ্ন করতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌচ্যানেলের নাব্যতার দিকে নজর দেওয়া উচিত। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে এ দুটি চ্যানেল সক্রিয় করতে কর্তৃপক্ষ নজর দেবে, আমরা তেমনটিই দেখতে চাই। ঢাকা