খণ্ডকালীন পেশায় আগ্রহী হচ্ছেন তরুণরা

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫৬
‘ছাত্র নং অধ্যায়নং তপ’ অর্থাত্ ছাত্র জীবনে পড়াশুনাই প্রধান তপস্যা। এই তপস্যাকে ঠিক রেখে ইন্টারনেট সুবিধার উপর ভর করে এই সময়ের শিক্ষার্থীরা আগ্রহী হচ্ছে দ্বিতীয় পেশায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে তারা ছাত্র জীবনেই আয়ের জগতে প্রবেশ করছে। একযুগ আগেও এদেশে খণ্ডকালীন কাজের তেমন সুযোগ না থাকলেও আজ তা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। তরুণরাই সমাজে খণ্ডকালীন কাজকে সম্মানের জায়গা করে দিচ্ছেন। এদিকে নিজের আয়ের তৃপ্তি, পেশাগত জীবনের শিক্ষা, আর অভিজ্ঞতা অর্জনকে স্বাগত জানালেও পড়াশুনা সম্পূর্ণ করা আর লক্ষ্যভ্রষ্ট না হওয়ার পরামর্শ সুধিজনের। আর অভিভাবকরা ভাবেন জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে। পড়াশুনার পাশাপাশি যেসব পেশাকে শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করছে, তার মধ্যে ফটোগ্রাফি, ইন্টোরিয়র ডিজাইনিং, ফ্যাশন ডিজাইনিং এবং ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্ট অন্যতম। তাদের পেশাকে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন গ্রাহদের কাছে। এই বিষয়ে ফেসবুকের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফটোগ্রাফি পেইজ ‘ড্রিম উইভার’ এর প্রধান চিত্রগ্রাহক এবং ইসলামিক ইউনির্ভাসিটি অব ট্যাকনোলজি’র ম্যাকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার জুবায়ের হোসেন শুভ বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আইইউটিপিএস’ ফটোগ্রফি ক্লাবের মাধ্যমে আমার এই বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ। তখন আমি বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজনদের অনুরোধে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি তুলি। এতে আমার পকেট খরচ ভালভাবেই চলে যায়। পরে আমি আরও বন্ধুদের নিয়ে ফেসবুকে ‘ড্রিম উইভার’ পেজ খুলি। অল্প সময়ে আমরা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। বর্তমানে আমাদের প্রায় ১ লক্ষ ৭৮ হাজার ফ্যানের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক আছে। জুবায়ের হোসেন শুভ বলেন, তাদের ২০ জন সহকর্মীর মধ্যে দুজন মেয়ে ফটোগ্রাফারও আছেন। আর তিনি ইঞ্জনিয়ার হলেও এ পেশা গ্রহণ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একইভাবে পেশা শুরু করেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়রিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফিন ইসলাম রাইয়াদ। রাইয়াদ জানান, ফটোগ্রফি প্রতিদিন থাকে না বলে পড়াশুনায় কোন ক্ষতি হয় না। আর পরিবারও তাকে বাধা দেয় না। ইঞ্জিনিয়ারিং এর পাশাপাশি ফটোগ্রাফিকেও পেশা হিসেবে রাখতে চান তিনি। তবে পরিবারকে না জানিয়েই নিজের দ্বিতীয় পেশা শুরু করেছেন বলে জানান ‘ইন্ট্রিগ ফ্যাশন’র স্বত্বাধিকারী রুবাবা মাহমুদ। তিনি বর্তমানে ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নবম সেমিস্টার বিবিএর শিক্ষার্থী। রুবাবা নিজে অনলাইনভিত্তিক কেনাকাটা করতে করতেই এই পেশায় আগ্রহী হন। পড়াশুনার ক্ষতি হবে বলে তখন পরিবারকে জানানো হয়নি। শুরুতে তার পড়াশুনার একটু ক্ষতি হলেও তা এখন পুষিয়ে নিয়েছেন। এখন বেশ সফলভাবেই তিনি ব্যবসা ও পড়াশুনা করছেন। আর এই ব্যবসায় পরিবারের সহযোগিতাও পাচ্ছেন। রুবাবা বলেন, পেশায় থাকতে চাইলে নিজেকে কঠিনভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করতে হবে। আমরা খুব অল্প মূলধনে এই পেশা শুরু করতে পারি। আমি মাত্র ৩৩ হাজার টাকা মূলধন খাটিয়ে আজ লাখ টাকা আয় করছি। তবে আমাদের কিছু প্রতিবন্ধকতাও আছে। রুরারা বলেন, আমাদের হোলসেলের ওয়েব সাইটের সংখ্যা অনেক কম। বাইরে থেকে পণ্য আনতে কাস্টমসের ঝামেলার সম্মুখিন হতে হয়। আবার কারো পছন্দের পণ্য আনলে তিনি যদি না নেন, তাহলে অন্য রকমের সমস্যা হয়। এক্ষেত্রে রুবাবা ৫০শতাংশ মূল্য আগে নিয়ে পরে পণ্য সাপ্লাই দেন। কেউ কুরিয়ারে, কেউ ব্যক্তিগতভাবে পণ্য গ্রহণ করেন। ফেসবুকে গিয়ে পছন্দ করা পণ্য সিলেক্ট করে তার একাউন্টে টাকা পাঠালেই হবে। রুবাবা বলেন, সপিংমল থেকে তাদের পণ্যের দাম কম। ফেসবুকভিত্তিক পেশা তাদের ইন্টারনেটের নেতিবাচক ব্যবহার থেকে দূরে রাখে বলে মনে করেন সিটি কলেজ থেকে সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা সুমাইয়া ইসলাম। সুমাইয়া ফটোগ্রাফির সাথে জড়িত। তার মতে অনেকে এই ব্যবসায় যুক্ত হওয়ায় ইন্টারনেটের নেতিবাচক ব্যবহার কমছে। নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত তারা। অন্য আর এক অসুবিধার কথা জানালেন আস্থা ইনটেরিয়রের কর্ণধার উম্মে কুলসুম কাকলি। কাকলি বলেন, এক্সিম ইনস্টিটিউট থেকে যখন তিনি এ বিষয় গ্রাজুয়েশন করে পেশা হিসেবে নেন, তখন পরিবার তাকে সহযোগিতা করেনি। তখন তার লেপটপও ছিল না। ফলে কোন গ্রাহক ডিজাইন দেখার নাম করে পেনড্রাইভে তার ডিজাইন নিয়ে পারিশ্রামিক দিতেন না। তাই নিজের পড়াশুনা আর কাজের প্রতি সততার স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন এক্সিম ব্যাংকের প্রধান শাখার ইন্টেরিয়র ডিজাইনার কাকলি। মেয়েদের সংসার করে অনেক ভালভাবে ফেসবুকভিত্তক ব্যবসা করা সম্ভব বলে তিনি জানান। অভিভাকরা যা বলেন পড়াশুনা করে একজন সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে কর্মজীবনে সন্তানদের সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখেন সব বাবা মা- বলেন, ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্ট পেশার সাথে জড়িত আরিফ আহসানের বাবা রকিবুল আহসান। ছেলে আয় করছে, এটা যতটা না স্বস্তি দিচ্ছে, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত টাকা পয়সা নিয়ে যেন সে কোন বিড়ম্বনায় না পড়ে। সুধিজনের মত আমাদের সময় ছাত্র জীবনে আয়ের সুযোগ বড় কম ছিল। শুধু প্রাইভেট পড়ানো আর সর্বসাকুল্যে দুই/চার টা পত্রিকায় লেখা। আজ তরুণরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রতিদিনই আয়ের নতুন দ্বার উন্মোচন করছে। এটি সত্যি প্রশংসার দাবিদার। নিজের সময়ের শিক্ষার্থীদের আয়ের প্রতিবন্ধকতা, আর বর্তমানে বিশ্বময় বিস্মৃত ইন্টরনেটভিত্তিক আয়ের সম্ভাবনাকে এভাবেই স্বগত জানান ‘আলোকিত মানুষ চাই’ এর স্বপ্নদ্রষ্ট্রা আব্দুল্লাহ আবু সাইদ। তিনি বলেন, আর্থিক মুক্তির যেমন প্রয়োজন, তেমনি মানুষ হওয়াও জরুরি। তার সাথে একমত ক্যাম্পাসে হিরো খুঁজে বের করার অনুসন্ধানী বিচারক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, সময়ের শর্তই হল সমাজের পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের হাত ধরে আজ শিক্ষার্থীরা পাড়াশুনার পাশাপাশি আয় করছে। তাদের ব্যয়ও অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন, আমাদের সমাজে ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিক মূল্যবোধটা আজও অনেক বেশি বলে একটা স্থিতিস্থাপকতা আছে। দ্বন্দ্ব আসবে এই দ্বন্দ্বের মধ্যে থেকেই তরুণরা পথ খুঁজে নিবে।