রাজশাহী মহানগরীতে অপহরণ ও ছিনতাইকারী চক্র আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মহানগরীর বিভিন্ন পাড়া মহল্লার বিত্তশালীরা এই চক্রের টার্গেট। সুযোগ বুঝে টার্গেট পরিবারের শিশুদের অপহরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়াও মহানগরবাসীকে দিনে দুপুরে পড়তে হচ্ছে মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীর কবলে। সব মিলিয়ে চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন মহানগরবাসী।
জানা গেছে, মহানগরীর নতুন বিলসিমলার বাসিন্দা ও রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিসক ডা. আনোয়ার হোসেন প্রতিদিন সকালে হাসপাতালে এবং তার স্ত্রী এক সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যান। বাড়িতে রেখে যান তার ৫ বছরের শিশুকন্যা জারিন ও গৃহপরিচারিকা সাড়ে ৬ বছরের শিশু আলপনাকে। গত মঙ্গলবার সকালে স্বামী-স্ত্রী নিজ নিজ কাজে বের হওয়ার পর দুই অপরিচিত ব্যক্তি ডা. আনোয়ারের বাসায় গিয়ে জারিন ও আলপনাকে বেড়াতে নিয়ে যাবার প্রস্তাব দেয়। তারা ঘরে প্রবেশ করে জারিনের কাপড়চোপড় গুছিয়ে নেয়। দুই অবুঝ শিশু তাদের কথামত বেরিয়ে পড়ে। অজ্ঞাত অপহরণকারীদ্বয় তাদের চকলেট খেতে দেয়। কিন্তু স্বাদ পছন্দ না হওয়ায় আলপনা চকলেট ফেলে দেয়। আর জারিন চকলেট জামার পকেটে রাখে। একপর্যায়ে ওই দুই ব্যক্তি জারিন ও আলপনাকে নিয়ে রেললাইন ধরে হাঁটতে থাকে। কিছু দূর যাওয়ার পর দুরন্ত জারিন তাদের জিজ্ঞাসা করে কোথায় যাচ্ছি? এক পর্যায়ে সে বেঁকে বসে। রেললাইনের অদূরে বর্ণালী মোড়ের রেল ক্রসিংয়ে এএসআই মুজাহিদের নেতৃত্বে টহল পুলিশ দেখে অপহরণকারীরা জারিন ও আলপনাকে সেখানে রেখে পালিয়ে যায়। এসময় জারিন ও আলপনা কান্নাকাটি শুরু করলে পুলিশের এএসআই এগিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত তারা অপহরণকারীদের হাত থেকে রেহাই পায়।
এদিকে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (ইউআইটিএস) নামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ’র ছাত্র দুর্বল হুদা (২০) নিখোঁজ হন গত ২৯ মে। এরপর তার পিতার কাছে মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করা হয় ৩৩ লাখ টাকা। এ ঘটনায় দুইজনকে আসামি করে পবা থানায় মামলা করেছেন দুর্বলের পিতা এনায়েতুল্লাহ। এরপর কেটে গেছে তিন মাসের বেশি সময়। পুলিশ এখনও দুর্বলকে উদ্ধার কিংবা মামলার দুই আসামিকে আটক করতে পারেনি। এনায়েতুল্লাহ বলেন, অপহরণকারীরা বারবার তার মোবাইলে টাকা চেয়ে ফোন করছে। মেসেজ দিচ্ছে। তারপরও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ছেলেকে যদি জীবিত উদ্ধার করে দিতে না পারে, যদি সে বেঁচে না থাকে, তাহলে তার লাশটা অন্তত এনে দিক বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
পবা থানায় দায়ের করা মামলা সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ মে দুপুর একটার দিকে গোদাগাড়ীর বিলির গ্রামের বাড়ি হতে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে দুর্বল হুদা। সন্ধ্যার মধ্যেই তার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। বিকাল চারটার দিকে শেষবারের মতো ছেলের সঙ্গে কথা হয় এনায়েতুল্লার। তখন দুর্বল বলেছিল, সে পবা উপজেলার বাগধানী এলাকায় আছে। বাড়ি ফিরতে রাত হবে। রাতে এনায়েতুল্লাহ আবারো ছেলের মোবাইলে ফোন করেন। তখন ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ওই রাতেই দুর্বল হুদার সহপাঠী রাজশাহী নগরীর উপশহর এলাকার আসফাকুর রহমান তুষার ও হেতেম খাঁ এলাকার তুষার দুর্বলের এক ভগ্নিপতিকে মোবাইল করে জানায়, তারা দুর্বল হুদাকে ফোন করে পাচ্ছে না। পরদিন এনায়েতুল্লাহ রাজশাহীতে এসে অমিত ও তুষারের সঙ্গে দেখা করলে তারা দুর্বল হুদার নিকট ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাবে বলে দাবি করে। এর মধ্যে তুষার ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং অমিত ১৩ লাখ টাকা দাবি করে। এরপর থেকেই তুষার ও অমিত বিভিন্ন সময়ে এনায়েতুল্লাহর মোবাইলে ফোন করে ওই টাকা দাবি করে। আর টাকা না দিলে ছেলে দুর্বল হুদাকে পাওয়া যাবে না বলেও মোবাইল ফোনে মেসেজ দিতে থাকে তারা।
এনায়েতুল্লা জানান, ছেলে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি গত ৩০ মে পবা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপরও ছেলেকে না পেয়ে তাকে অপহরণ করা হয়েছে মর্মে গত ৩ জুন তুষার ও অমিতকে আসামি করে পবা থানায় মামলা করেন। মামলার পর থেকেই টাকার দাবিতে একাধিকবার মেসেজ দিয়েছে দুই অপহরণকারী। গত ২৪ আগস্ট সর্বশেষ মেসেজ দেয় তারা। ওইদিন এনায়েতুল্লার মোবাইল ফোনে বিকাল ৫টা ৩৭ মিনিটে পাঠানো মেসেজে উল্লেখ করা হয়, আপনাকে যে সময় দেয়া হয়েছিল তা পার হয়ে গেছে। যার কারণে আপনার ছেলেকে আমরা আর ফেরত দিতে পারব না। ইচ্ছে করলে আমরা টাকাটা উঠাতে পারতাম, সেটা আমরা করি নাই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পবা থানার এসআই ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফয়সাল বিন আহসান বলেন, আমরা ছেলেটিকে উদ্ধারের জন্য জোর চেষ্টা চালিয়েছি। যে দুটি মোবাইল থেকে তার পিতাকে মেসেজ দেয়া হতো, সেগুলো খুঁজে বের করা হয়েছে। কিন্তু সবগুলোই ছিল ভুয়া ঠিকানায় উত্তোলন করা সিমকার্ড। ফলে প্রকৃত আসামিদের ধরা যাচ্ছে না। তবে পুলিশের চেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে। ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, এর মধ্যে তুষার আদালত থেকে জামিনে আছে। আর এখনো পলাতক রয়েছে অমিত। আমরা তাকে খুঁজছি। তাকে পেলেই হয়তো মামলার রহস্য উদঘাটন হতে পারে।
অন্যদিকে গত ৭ সেপ্টেম্বর মোহনপুর থেকে দোকানের মালামাল ক্রয় করতে রাজশাহী আসার পথে নিখোঁজ হন থাইগ্যাস ব্যবসায়ী মশিউর রহমান চন্দন। তার শ্বশুর নগরীর কুমারপাড়া এলাকার শামসুল হক জানান, ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে চন্দন তার বন্ধু সেলিমকে মোবাইল করে জানায়, সে একসিডেন্ট করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১৭ নং ওয়ার্ডে ভর্তি আছে। খবর পেয়ে চন্দনের আত্মীয়স্বজন হাসপাতালে গিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাকে পায়নি। এরপর থেকে চন্দনের ব্যবহূত মোবাইলও রয়েছে বন্ধ। গত ৮ সেপ্টেম্বর বোয়ালিয়া মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন চন্দনের শ্বশুর। বিষয়টি তিনি র্যাব-৫কেও জানিয়েছেন। এখন পর্যন্ত চন্দনের সন্ধান বের করতে পারেনি পুলিশ।
এছাড়াও নগরীতে আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। দিনে দুপুরে নগরীর বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ ছিনতাইকারীদের খপ্পড়ে পড়ছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। তারা যেখানে সেখানে পথচারীদের থামিয়ে কিংবা চলন্ত অবস্থায় ভ্যানিটি ব্যাগ, গলার স্বর্ণের চেইনসহ মূল্যবান মালামাল ছিনিয়ে নিচ্ছে। এসব ঘটনায় কেউ সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করছে আবার কেউ নিরব থেকে যাচ্ছে।
বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জিয়া জানান, চন্দনের নিখোঁজের ব্যাপারে করা জিডির বিষয়টি সব থানায় জানানো হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
