১২ মামলা নিয়ে পুলিশ বিপাকে

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:০৮
কক্সবাজার জেলার রামু ও উখিয়া উপজেলাসহ আশপাশে ১৯টি বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে গত বছর দুষ্কৃতকারীরা হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করে। মূল্যবান মূর্তিসহ অন্যান্য সামগ্রী হামলাকারীরা নিয়ে যায়। বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের ২৬টি বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে তারা। সেই হামলার নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। ঐ হামলায় কোন দল এককভাবে অংশগ্রহণ করেনি। স্থানীয় সকল রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে হামলা চালিয়েছে বলে ভিক্ষু ও ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা জানিয়েছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা জড়িত নেতা-কর্মীকে ১২টি মামলা থেকে বাদ দিয়ে পুলিশ প্রশাসনকে চার্জশিট প্রদানের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। জড়িত নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গত বুধবার সরেজমিনে রামু ও উখিয়া উপজেলার হামলার শিকার সেই বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে গিয়ে ভিক্ষু ও স্থানীয় বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ ধর্মান্ধ কিছু মানুষের উন্মত্ত সহিংসতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বর্ণনা দেন। তাদের চোখের সামনে স্থানীয় চেনাজানা রাজনৈতিক দলীয় নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বে ১৯টি বিহার গত বছর ২৯ সেপ্টেম্বর রাতভর হামলা চালিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। ঘটনার পর ১৯টি বিহারে হামলা, লুট, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনায় রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজার সদর থানায় ১৯টি মামলা দায়ের করা হয়। গত ১ ও ২ সেপ্টেম্বর ১৯টি মামলার মধ্যে পুলিশ প্রশাসন ৭টি মামলায় ৩৬৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে। বাকি ১২টি মামলার চার্জশিট প্রদান নিয়ে পুলিশ প্রশাসন বিপাকে পড়েছে। এ সব মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুব লীগ ও ছাত্রলীগ, বিএনপি ও জামায়াত নেতা-কর্মী জড়িত বলে বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। তারা এসব জড়িত নেতা-কর্মীর নামের তালিকা পুলিশ প্রশাসনের কাছে দিয়েছেন। ঐ সব জড়িত স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মী নাম বাদ দিয়ে মামলার চার্জশিট দেয়ার জন্য পুলিশকে চাপ দেয়া হচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সাফ বলা হয়, জড়িত নেতা-কর্মী যেই হউক তাদেরকে বাদ দিয়ে চার্জশিট প্রদান করা সম্ভব নয়। এ নিয়ে স্থানীয় নেতারা শীর্ষ নেতা ও প্রশাসনকে প্রকৃত তথ্য গোপন রেখে জড়িতদের নাম বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। স্থানীয় বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের নেতারা বলেন, জড়িত নেতারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাদের বাদ দিয়ে চার্জশিট প্রদান করা হলে তারা আন্দোলনের ডাক দিবেন বলে প্রশাসনকে সতর্ক করে দেন। রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের সত্যপ্রিয় মহাথেরো, রামু উপজেলা বৌদ্ধ ঐক্য ও কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তরুণ বড়ুয়া, মৈত্রী বিহার, লাল চিং ও সাদা চিং বিহারের ভক্ত অখিল বড়ুয়া ও অজিত বড়ুয়াসহ অর্ধ শতাধিক ভক্ত ইত্তেফাককে জানান, স্থানীয় জড়িত কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন একদল নেতা। তারা ঐ সব নেতাকর্মীকে দিয়ে এলাকায় দখল, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি, মাদকসহ নানা অপকর্ম করিয়ে আসছেন। বৌদ্ধ বিহারে হামলার সময় নেতৃত্ব দেয়া, মিছিল মিটিং করার প্রমাণ রয়েছে। কিছু সংখ্যক নেতা কর্মীকে রক্ষা করা হলে সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সরকার ১৯টি বিহার স্বল্প সময়ে আন্তর্জাতিকমানের দৃষ্টিনন্দন করে পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করেছে। তা বৌদ্ধ সমপ্রদায়কে অভিভূত করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সেনাবাহিনীর প্রতি তারা প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছেন। সরকারের সেই অবদানকে ভূলুণ্ঠিত করতে জড়িত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের নাম বাদ দিয়ে চার্জশিট প্রদানে ব্যস্ত কিছু নেতা। কয়েকজন নেতাকর্মীর জন্য বিহার ধ্বংসের পর সরকারের এ বিশাল অর্জন ধূলিসাত্ হোক, এটা বৌদ্ধ সম্প্রদায়সহ কারো কাম্য নয়। জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর হলে বৌদ্ধ সম্প্রদায়সহ সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা একশত ভাগ বৃদ্ধি পাবে বলে ভিক্ষু ও ধর্মীয় নেতারা জানান। জড়িত নেতারা যখন প্রকাশ্যে তাদের সামনে দিয়ে চলাফেরা করেন তখন বিহারের ধ্বংসলীলায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের হূদয়ে যে ক্ষত হয়েছিল সেই স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। কক্সবাজার পুলিশ সুপার আজাদ মিয়া বলেন, বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের পক্ষ থেকে দলীয় নেতা-কর্মীদের নাম উল্লেখ করে একটি তালিকা তার কাছে জমা দেয়া হয়েছে। তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্তে সাক্ষ্য-প্রমাণে জড়িত যার নামই আসবে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হবে। তবে নিরীহ লোক যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের তালিকাভুক্ত জড়িতরা হলেন কক্সবাজার মত্স্যজীবী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনছারুল হক ভুট্টো, বিএনপির নেতা আবু তাহের, শিবির কর্মী আব্দুল মুক্তাদির আলিফ (বর্তমানে জেলে), স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নূরুল ইসলাম, উত্তম বড়ুয়া, ব্যবসায়ী জহির উদ্দিন (বর্তমানে জেলে), জামায়াত নেতা তোফাইল আহমদ, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও রামু প্রেসক্লাবের সভাপতি নূরুল ইসলাম সেলিম, বিএনপি নেতা মিজান উদ্দিন, বিএনপি কর্মী মোঃ আব্দুল্লাহ ও মোঃ রফিক, বিএনপির নেতা লুত্ফর রহমান কাজল, শিবিরের সাবেক নেতা শহিদুল আলম বাহাদুর, আওয়ামী লীগ নেতার পুত্র সাইমুম সরওয়ার কমল, ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেন, রামু উপজেলার চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি সোহেল সরওয়ার কাজল, আওয়ামী লীগ নেতা হাফেজ আহমেদ ও জামায়াত নেতা হাফেজ মাওলানা আব্দুল হক এবং দোকানদার ওমর ফারুক, জ্বিন বাবু ও ইকবাল। সাবেক রামু থানা ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে মদদ দেয়ার অভিযোগ করা হয়। সরকারি তদন্তেও জড়িত নেতা-কর্মীদের নাম এসেছে। পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, জড়িতরা কারা এটা পুলিশের দেখার বিষয় নয়। স্থানীয় নেতাদের সম্পর্কে কোন ধরনের তদ্বিরও তার কাছে আসেনি। তদন্তে ও সাক্ষ্য প্রমাণে যারই নাম আসবে তাকে কোন অবস্থাতেই ছাড় দেয়া হবে না। ১২টি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। চার্জশিট সঠিকভাবে প্রদান করা হবে বলে তিনি জানান।