অনেকে বলেন, তিনি আফগানিস্তানের টেন্ডুলকার। আবার আফগানরা বলেন, তাদের আফ্রিদী। তবে তিনি নিজে টেন্ডুলকার বা আফ্রিদী হতে চান না; মোহাম্মদ নবী হয়েই থাকতে চান। আফগানিস্তানের কৌতূহল উদ্দীপক তারকা মোহাম্মদ নবী নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে, স্বপ্ন নিয়ে, ফেলে আসা উদ্বাস্তু শিবিরের জীবন নিয়ে এবং আফগানিস্তান নিয়ে কথা বলেছেন ইত্তেফাককে দেয়া একান্ত সাক্ষাত্কারে। অসাধারণ দেশপ্রেম ও স্বপ্নে ভরপুর এই আফগানিস্তান অধিনায়কের দীর্ঘ সাক্ষাত্কার নিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়—
নবী, প্রথমেই অসাধারণ এই সেঞ্চুরির জন্য আপনাকে অভিনন্দন।
অনেক ধন্যবাদ। আমাকে যারা সমর্থন দিয়েছেন, এখানে খেলার সুযোগ দিয়েছেন, সবাইকে ধন্যবাদ। এই সেঞ্চুরির ফলে মোহামেডানের হয়ে টুর্নামেন্টটা দারুণভাবে শুরু করতে পারলাম।
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলাটা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ আপনার জন্য?
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলাটা আমার জন্য এমনিতেই অনেক বড় একটা পাওয়া। সেই সঙ্গে তিলকরত্নে দিলশান, উপল থারাঙ্গা, মাশরাফির মতো খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই দলে খেলাটা আমার জন্য অনেক বড় একটা ব্যাপার। এটা আফগানিস্তানের হয়ে আমাকে আরও ভালো খেলতে সাহায্য করবে। সামনে কেনিয়ার বিপক্ষে আমাদের খেলা আছে। ওখানে জিততে পারলে ইনশাল্লাহ আমরা বিশ্বকাপে চলে যাবো।
লম্বা জার্নি করে এই ম্যাচে খেলতে নামলেন। তারপর এমন ইনিংস খেলা কীভাবে সম্ভব?
(হাসি) কীভাবে সম্ভব, তা তো বলা কঠিন। তবে হ্যাঁ, অনেক বড় জার্নি করে আসতে হয়েছে। প্রথমে তো দেশ থেকে দুবাই, তারপর দুবাই থেকে আবার বিমানে ঢাকায়। এরপর ঢাকা থেকে প্রায় সাত ঘণ্টা বাসে করে বগুড়া। বিমানবন্দরে ওয়াসিম ভাই (মোহামেডানের ম্যানেজার ওয়াসিম খান) আমাকে বলছিলেন, তুমি তো মাঠে নামার আগেই অনেক স্কোর করে ফেলেছ! উনি বললেন, দেখবে এই ম্যাচে সেঞ্চুরি পাবে। তাই হল কিন্তু!
আপনার শৈশব থেকে শুরু করি। পেশোয়ারে উদ্বাস্তু শিবিরে জন্ম আপনার। সেই ক্যাম্প জীবনের গল্প বলুন একটু...
হ্যাঁ, যুদ্ধের সময় আমার পরিবার এই রিফিউজি ক্যাম্পে চলে এসেছিল। খুব কঠিন জীবন ছিল ওখানে। বিদ্যুত্ ছিল না, ভালো খাবার পানি ছিল না; আসলে নিয়মিত ভালো খাবারেরই তো কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। তাঁবু দেখেছেন? শরণার্থীদের তাঁবু; যেমন সিনেমায় দেখা যায়। ওরকম তাঁবুতে ছিল আমাদের জীবন।
কখনো মনে হতো যে, স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন না?
তখন তো আসলে বুঝতাম না। অতো ছোট বয়সে তো জীবন যেমনই হোক, মজা লাগে। ওই বয়সে আসলে তুলনাটা করা যায় না। আমি জানতাম না, কোথায় অন্যরা থাকে, আর কোথায় আমি থাকি। এখন যখন পেছন ফিরে দেখি, বুঝতে পারি কী জীবন কাটিয়েছি তখন; আর এখন কী জীবন কাটাচ্ছি!
ক্রিকেটটা কিভাবে শুরু হল?
এমনিতে তো ক্যাম্পের বাচ্চাদের সঙ্গে বা মহল্লায় প্লাস্টিক বল, রাবার বল, টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতাম। পুরো পাকিস্তানের মতো পেশোয়ারেও সব জায়গায় এরকম খেলা হয়। আমার ওটা খুব ভালো লাগত; তাই খেলতাম। এরপর একটা ক্রিকেট ক্লাবে শুরু করে ফেললাম। ক্লাবটার নাম ছিল শিরি মহল ক্রিকেট ক্লাব। পেশোয়ারের বেশ জনপ্রিয় ক্লাব।
ওটা কি আফগান ক্রিকেটারদের নিজস্ব ক্লাব ছিল?
না, না। মূলত পাকিস্তানীরাই খেলত। উমর গুল, ইয়াসির হামিদ, আরশাদ খান; এরা এই ক্লাব থেকে এসেছে। গুলদের সঙ্গে আমি ওখানে একসঙ্গে খেলেছিও। ওদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। পরে ওখানে ইসলামিয়া ক্রিকেট অ্যাকাডেমি হল ওই একই ম্যানেজমেন্টের অধীনে। আমার এখনও ওদের সঙ্গে সম্পর্কটা আছে। আশরাদ খান ওখানে এখন কোচিংও করায়।
আফগানিস্তানের হয়ে খেলার লক্ষ্যটা কখন পরিষ্কার হল?
একদিন পত্রিকায় খবর বের হল, আফগানিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৭ ক্রিকেট টিমের ট্রায়াল হবে। আমাদের পরিচিত কিছু লোকজন ছিল, তারা পত্রিকায় দেখে এসে বললো। সেই প্রথম জানলাম, আফগানিস্তানের হয়ে খেলা সম্ভব। এরপর তো ট্রায়াল দিতে গিয়ে নির্বাচিত হয়ে গেলাম। আমাকে ক্যাপ্টেনই করে দেয়া হল। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
ট্রায়াল দিতে তো আফগানিস্তান গেলেন। প্রথম আফগানিস্তান দেখার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। আমি আসলেই প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। রাস্তা-ঘাট, বাড়ি-ঘর সব কেমন যেন বিধ্বস্ত হয়ে আছে। একটাও দেয়াল দেখিনি, যেখানে গুলি বিঁধে ছিল না। বাড়িগুলোর দরজা, জানালা, দেয়ালে গুলি লেগে আছে। কেমন যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো। যুদ্ধের সিনেমার শেষে দেখা যায় না? ওরকম।
জাতীয় দলে ডাক পেলেন কবে?
আমি কিন্তু ওই অনূর্ধ্ব-১৭ খেলার আগেই জাতীয় দলের হয়ে ম্যাচ খেলে ফেলেছি। আমরা যখন অনূর্ধ্ব-১৭ দলের জন্য ক্যাম্প করছি; তখন জাতীয় দল পাকিস্তান সফরে গেল। আমাকে সঙ্গে নেয়া হল। পাকিস্তানের দ্বিতীয় গ্রেডে খেলেছিলাম আমরা। আমি জাতীয় দলের হয়ে প্রথম ইনিংসেই ৮০ রান করেছিলাম। দু’দিনের ম্যাচ ছিল।
এই যে সবাই আপনাকে নিয়ে আগ্রহ দেখায়, একরকম সেলিব্রিটিই হয়ে গেছেন...
এখনও সেরকম সেলিব্রিটি হয়েছি নাকি? একটু একটু মনে হয়। বাংলাদেশে দেখলাম, দু-একজন লোক চিনছে।
এটা কী উপভোগ করেন?
এনজয় তো করিই। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনটা নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে আফগানিস্তানে একটু সমস্যাই হয় এখন আমার। জীবনের সবকিছুতে এখন একটা বাধা তৈরি হয়েছে। সব জায়গায় যেতে পারি না, চাইলেই কোনো হোটেলে খেতে যাওয়া যায় না। গেলেও অনেক ভিড় হয়; ছবি তোলা, অটোগ্রাফ। কিছু সামাজিক সমস্যাও হয়।
বিরক্ত হন?
নাহ, বিরক্ত হই না। এই যে আজকে তারকা হিসেবে যে সুবিধাগুলো পাচ্ছি, তারকা হয়েছি; এটা তো মানুষ বানিয়েছে বলেই। তাদের দোয়াই আমাকে এখানে এনেছে। এখন যারা এই আমাকে ওপরে তুললো, তাদের ওপর বিরক্ত হই কী করে!
একটি পত্রিকা লিখেছিল, আপনি আফগানিস্তানের টেন্ডুলকার।
আফগানিস্তান কা টেন্ডুলকার! এখনও না। তবে চেষ্টা করছি। হ্যাঁ, লোকজন ভালোবাসে। আমার ছক্কা মারাটা লোকেরা বেশি পছন্দ করে। অনেকে আফগানিস্তানের আফ্রিদি বলে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পছন্দের ক্রিকেটার কে?
কেভিন পিটারসেনকে পছন্দ হয়। আর আমি আসলে এমএস ধোনির মতো খেলোয়াড় হতে চাই; কুল ক্যাপ্টেন। ও তো সেরা ফিনিশার। আমি ওর মতো করে ম্যাচ শেষ করাটা শিখতে চাই। সেটা নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করি।
ধোনির সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছেন কখনো?
না, কথা বলিনি। কথা বলে নয়, আমার মনে হয় দেখে শেখা যায়। আমি এমসিসি থেকে শুরু করে অনেক অনেক খেলোয়াড়ের খেলা দেখে দেখে শিখেছি। ওরা কিভাবে খেলে, কিভাবে কি করে; সব দেখে শেখার চেষ্টা করেছি।
কখনো নাগরিকত্ব বদলে ফেলার কথা ভেবেছেন? টাকার জন্য বা ভালো দলের হয়ে খেলার জন্য?
না, না। এখন পর্যন্ত তো জীবনে এমন ভাবিনি। কেন ভাববো? অন্য দেশের হয়ে আমি কেন খেলবো? আমার নিজের দেশ আছে। যেমনই হোক, এটা আমার দেশ। নিজের দেশের নাম উজ্জ্বল করাই আমার কাজ। আজ আমি যা হয়েছি, আফগানিস্তানের জন্যই হয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, অন্যদের কথা জানি না, আর কোনো দেশের হয়ে খেলার কথা ক্রিকেটার হিসেবে আমি কল্পনাও করতে পারি না; আমার হূদয় সেটা কখনো মানবে না। আমি আমার জীবন, আমার দেশ নিয়ে খুব খুশি।
টেস্ট খেলুড়ে দেশের হয়ে খেলতে পারেন না, এ নিয়ে আফসোস হয় না?
না, আফসোস করি না। কারণ, আমরা চেষ্টা করছি। অল্প সময়ের চেষ্টায় আমরা দুটো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেছি। ওয়ানডে স্ট্যাটাস পেয়েছি। আশা তো করি, টেস্ট স্ট্যাটাসও পাবো। আমরা তো চেষ্টা করছি, যাতে ২০১৫ সালের আগে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া যায়।
আফগানিস্তান কী টেস্ট পাওয়ার মতো অবকাঠামো তৈরি করে ফেলতে পেরেছে?
কিছু সময় লাগবে। ঘরোয়া ক্রিকেট প্রতি বছর আগের চেয়ে ভালো হচ্ছে। তিন দিনের ম্যাচের লিগ হয়, ওয়ানডে টুর্নামেন্ট হয়, টি-টোয়েন্টি টূর্নামেন্ট হয়। বোর্ড চেষ্টা করছে। দুটো আন্তর্জাতিক মাঠ আছে। এখন আমাদের ওখানে আরও নতুন দুটো লিগ শুরু হচ্ছে। একটা আফগানিস্তান সুপার লিগ; অনেকটা আইপিএলের ধাঁচে হবে। তবে আফগান খেলোয়াড়রাই খেলবে। এ ছাড়া মিলিওনিয়ার্স কাপ হবে একটা।
মাঠে দর্শক হয়?
প্রতি ম্যাচে প্রচুর দর্শক হয়। আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না। এই দেখুন ছবি তুলে রেখেছি (ফোনে তোলা গ্যালারিভর্তি দর্শকের ছবি দেখালেন)। একেবারে স্টেডিয়াম ভরা দর্শক। আফগানিস্তানের এখন বড় সম্পদ এই দর্শকরা।
বাংলাদেশে খেলতে কেমন লাগে?
বাংলাদেশ তো এখন বড় দল। এখানে সমর্থক অনেক। গত বিপিএল খেলতে এসে আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি। আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না বিপিএল খেলার সুযোগ পাবো; এতো বড় টুর্নামেন্ট! কেমনভাবে যে সুযোগ পেলাম, জানি না। ব্যাটিং খুব ভালো করতে পারিনি। তবে বোলিংয়ে খুব উন্নতি হয়েছে বিপিএল খেলে। বড় বড় সব খেলোয়াড়কে বল করতে হয়েছে। ক্রিস গেইল, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালকে বল করেছি! আমি যে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে পেরেছি, ওদের বিপক্ষে; টি-টোয়েন্টিতে এটা তো অনেক বড় ব্যাপার। এখন ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলছি ঢাকা লিগে। আশা করি, এখানে আরও ভালো কিছু করতে পারি।
আপনার পরিবারের কথায় আসি। সবাই তো এখন কাবুলেই থাকেন? কাবুলের কী অবস্থা এখন?
আমি তো খুব একটা থাকার সুযোগ পাই না। বছরে সব মিলিয়ে মাসতিনেক হয়তো দেশে থাকি। তবে এখন কাবুলের অবস্থা অনেক ভালো। দেখলে মনেই হয় না, এখানে কখনো যুদ্ধ হয়েছে। খুব শান্তিপূর্ণ অবস্থা।
আপনার বাবাকে অপহরণ করা হয়েছিল...
হ্যাঁ, সেটা এমনি সন্ত্রাসীদের কাজ ছিল মনে হয়। আমাদের কিছু করতে হয়নি। সরকারের বিভিন্ন সংস্থাই সমাধান করে ফেলেছে। আব্বু ভালোভাবেই মুক্তি পেয়েছেন।
আপনার সন্তানদের কথা বলুন। তারা কে কী করছে?
আল্লাহর রহমতে তিনটি ছেলে-মেয়ে আমার। দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে। বড় ছেলেটার আট বছর বয়স। ও ভালো ক্রিকেট খেলে। ব্যাটিংটা ভালো করে। জানি না, কী করবে। তবে আমার খেলা খুব পছন্দ করে। ছোট ছেলেটা ক্রিকেট পছন্দ করে না। পড়াশোনায় খুব ভালো। আমি ওদের কোনো চাপ দেই না। ওদের যা পছন্দ তাই হবে। আমার দিক থেকে কোনো চাপ নেই।
