পারিবারিক গণতন্ত্র এনে দিবে সুস্থ প্রজন্ম

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৫৮
রাতের আঁধারে কাঁদতে কাঁদতে লিজা বারান্দায় এসে বসে আছে। এখন প্রায় শেষ রাত, সকাল হয়ে যাবে তবু মনে হয় ওর কান্না থামবে না। কেননা রাতে খাবার সময় তার বাবা বলেছে, দেখলাম তোমার পরীক্ষায় ফলাফল সেরকম ভাল হচ্ছে না, প্রথম-দ্বিতীয় না হলে চলবে না, তাই ভেবেছি এ বছর তুমি আবার ক্লাস সেভেনেই থাকবে। লিজা গতবার তৃতীয় হয়েছিল সবার মাঝে। কিন্তু বাবার এক কথা, প্রথম হতেই হবে। ওর বন্ধুরা সব ওপরের ক্লাসে চলে যাবে, আর একই স্কুলে একই ক্লাসে ওকে থাকতে হবে, ভাবলেই কান্না পাচ্ছে। বাসায় তার বা তার মায়ের মতামত বলে কিছু নেই। বাবা যা বলেন তাই সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত, তাকে তাই করতে হবে এ নিয়ে আর কোন প্রশ্ন হবে না। এমন বাসায় থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল এ কথা ভাবতে ভাবতে লিজা চেয়ে রইল রাতের আকাশে তারাদের দিকে- পরিবারে এমন একনায়কতন্ত্রমূলক আচরণ সন্তান ও জীবনসঙ্গীর জীবনের জন্য হুমকি স্বরূপ। পরিবারের শান্তিরক্ষা ও পরিবারের সব সদস্যের ইচ্ছা পূরণে পারিবারিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অতি জরুরি। একনায়কসুলভ আচরণে পরিবারের অন্য সদস্যদের মানসিক অবস্থা ও এর পাশাপাশি পরিবারে গণতন্ত্র বজায় থাকলে পরিবারের সব সদস্যের মনের অনুভূতি জানতে আলোচনা হচ্ছিল কয়েকটি পরিবারের সদস্যের সঙ্গে। পারিবারিক একনায়কতন্ত্রে সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যত্: অনিমারা (ছদ্মনাম) দুই ভাই, দুই বোন। তাদের বাবা ব্যবসা করেন। মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জীববিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন। তার মা পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিল। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চাকরির সুযোগ ছিল। কিন্তু বাবা চান না যে মা চাকরি করুক। তাই মায়ের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে, যা কোনদিন আর পূরণ হবেও না। বাবা ভীষণ রাগি এবং তার কথাই বাসায় শেষ কথা। অনিমা বলছিল- আমার বড় ভাইকে ছোটবেলায় বাবা হোস্টেলে পড়তে পাঠিয়ে দেন। ভাইয়া একদম যেতে চায়নি, মাও যেতে দিতে চায়নি। কিন্তু যেটা সিদ্ধান্ত সেটাই হবে, তা কখনও পাল্টাবে না। ভাইয়া ওখানে গিয়ে সিনিয়র ছাত্রদের কাছে খুব হেনস্তা হয়। সেই থেকে সব নতুন জায়গায়ই তার ভীতি। ভাইয়া খুব চুপচাপ হয়ে যায়। মনের বিরুদ্ধে হওয়ায় পড়াশোনার প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা জন্মায় এবং তা থেকে ভাইয়া আর অনার্স সম্পূর্ণ করেনি। অন্য এক মানুষ হয়ে গেছে। ভাইয়ার জীবন কি হতে পারত আর কি হল? মাও ধীরে ধীরে অনুভূতি ও মতামতশূন্য মানুষে পরিণত হয়েছে। আমার পড়াশোনার বিষয়, স্কুল, কলেজ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কখনই আমি আমার মতামত প্রকাশ করতে পারিনি। এমন একনায়কতন্ত্রমূলক আচরণে দেখা যায় সন্তানেরা মানসিক বিধ্বস্ততা থেকে বিপথগামী হয়ে পড়ে। বন্ধুদের কুসঙ্গে নিজ জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। কখনও খুব উগ্রও হয়ে ওঠে। তাদের মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক হয় না । কখনও দেখা যায় নিজস্ব মতামত বলে কিছু আর থাকে না, যা পরবর্তী জীবনে এক বড় অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। পারিবারিক গণতন্ত্রের অভাবে সাংসারিক জটিলতা: বর্তমানে একক পরিবারের যুগেও রুমানারা যৌথ পরিবার। তাদের বিয়ে হয়েছে সাত বছর হতে চলল, তাদের চার বছরের একটি ছেলে রয়েছে। দাদা-দাদী, ফুফুর সাথে আনন্দেই দিন কাটে তার ছেলে অমিতের। তবু ভাবী-ননদ শাশুড়ী সম্পর্কে প্রতিমাসেই বিভিন্ন কারণে মনমালিন্য দেখা দেয়। এর পেছনে রুমানার স্বামীর একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবই মূল কারণ। রুমানা বলছিল-আমার বাবার রিটায়ারমেন্টের পর আমার বাবা-মায়ের বাসা প্রায় অচল। আমি বর্তমানে এনজিওতে আছি। তবু আমি যে আমার ইচ্ছে মত খরচ করব, বাবা-মাকে একটু সাহায্য করব, সে সাধ্যি নেই। মাসের শুরুতে সব টাকা আমার স্বামীর কাছে। তার যা পছন্দ তাই করছে। ব্যবসা করছে যার কোন হিসাব নেই। আমার সুবিধা- অসুবিধার কথা বলার মত স্বাধীনতাও আমার শ্বশুর বাড়িতে নেই। তাই দরজার পেছনে একে অপরের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করা ছাড়া আর কোন উপায়ই থাকে না। আজ যদি আমরা সবাই পারিবারিক গণতন্ত্র রক্ষা করে চলতাম, সেক্ষেত্রে মতামত না মিললেও আমার সন্তান থেকে শুরু করে শাশুড়ী, ননদ সবার মনের চাহিদা আমি জানতাম আর আমার মতামত জানত ওরা। সবাই সবাইকে জানতাম বুঝতাম। পারিবারিক গণতন্ত্রে সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্: রুম্পারা এক ভাই এক বোন। তার মা ব্যাংকে চাকরি করে। বাবা শিক্ষক। রুম্পা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে পড়ে আর ওর ভাই কানাডায় মাস্টার্স করে সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করছে। রুম্পা বলছিল- আমার ক্লাস এইটের ফলাফল যথেষ্ট খারাপ ছিল। বাবা বলেছিলেন কমার্স পড়। মায়ের মতামত ছিল সায়েন্সে পড়লে ভালো করতে হবে, তাই যেটা ভালো হয় বুঝে কর। আমার সখ আমি সায়েন্সে পড়ব এবং পড়েছি। সেই থেকে এসএসসিতে আমার জিপিএ পাঁচ, এইচএসসিতেও জিপিএ পাঁচ। আমার ইচ্ছামত পড়তে পারাই আজকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারছি নইলে কখনও পড়াশোনাই করতাম না। ভাইয়াও সব বৃত্তি পেয়েছে , খুব ভাল ছাত্র ছিল এবং বুয়েট থেকে পড়াশোনা করেছে। এখন খুব ভাল কোম্পানিতে চাকরি করছে। আমাদের সাফল্যের পেছনে আমি মনে করি পারিবারিক গণতন্ত্রই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। সবাই আমরা আমাদের মতামত বলতে পেরেছি। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে সিদ্ধান্তে এসেছি। মা-বাবা দুজন চাকরিজীবী হলেও দুজন মিলে ভাগাভাগি করে আমাদের পড়িয়েছেন, সময় দিয়েছেন। তাই কখনও তাদের অভাব বা শূন্যতা আমরা ভাই বোন কেউই অনুভব করিনি। আমাদের জীবনের সাফল্যের পেছনে আমাদের পারিবারিক গণতন্ত্রই মূল। পারিবারিক গণতন্ত্রে সেরা ক্যারিয়ার: শীলা ও রফিককে এখন বলা চলে নববিবাহিত দম্পতি। তাদের বিয়ের তিন বছর হতে চলল। তারা দুজনই ব্যাংকার। স্ত্রীর চাকরি করার ব্যাপারে রফিক সব সময়ই উত্সাহ দেখিয়ে এসেছে। গত বছর যখন শীলার প্রমোশন হল সে উপলক্ষে রফিকই বেশ বড় পার্টির আয়োজন করে। তা শীলার চাকরির প্রতি আগ্রহ এবং রফিকের প্রতি শ্রদ্ধা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের মধ্যে কোন প্রতিযোগিতা নেই। দুজন ভাগাভাগি করে সংসারের সব কাজ করেন। তারা পারিবারিক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। কোন বিষয়ে নিজেরা আলোচনা না করে কোন সিদ্ধান্ত নেন না। একে অপরকে সবসময়ই উত্সাহ দিয়ে এসেছেন। তাদের এই সহযোগিতামূলক মনোভাবই চাকরি ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে । এমন পারিবারিক গণতন্ত্র বজায় থাকলে তা তাদেরকে চাকরি ও সাংসারিক জীবনে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যাবে।