গোপালগঞ্জ বাংলা-দেশের একটি জেলা হিসাবে শুধু নয় বিশ্বের সমস্ত বাঙালির কাছে অনন্য মর্যাদা বহন করে। এটি সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমি। বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনারও জন্মস্থান এই জেলা। এছাড়া ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগতভাবে অনেক গুরুত্ববহন করে এই জেলা।
নামকরণ
নিম্নগাঙ্গেয় অববাহিকায় অবস্থিত বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জলাভূমি বেষ্টিত এক ভূখণ্ডের নাম গোপালগঞ্জ। মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, স্বচ্ছ সলিলা কুমার নদের শাখা-প্রশাখা এ জেলায় বিছিয়ে রয়েছে জালের মত। প্রাচীন কাল থেকেই এ সব নদী, শাখা নদী ও উপ-নদীগুলোর তীরে তীরে গড়ে উঠেছে গ্রাম, হাট-বাজার, গঞ্জসহ বহুজনপদ। মধুমতি নদীর তীরে গড়ে ওঠা এ রকম একটি গঞ্জের নাম ছিল রাজগঞ্জ। আর এ রাজগঞ্জই হলো গোপালগঞ্জের পূর্ব নাম। তবে গোপালগঞ্জ বলে যে শহরটিকে আমরা চিনি তার আদি নাম ছিল খাটরা। এ শহরটি খাটরা মৌজায় অবস্থিত। এখানে গোপালগঞ্জ নামে ভিন্ন কোন স্থান গ্রাম বা মৌজা নেই। এ অঞ্চলটি অতীতে ছিল জঙ্গলাকীর্ণ ও বিপদসংকুল। সম্ভব সুলতানি আমলে পশ্চিমা সৈন্য সামন্তদের উত্তরাঞ্চলে যেতে হলে এ পথেই যেতে হতো। এ অঞ্চলটি বিপদসংকুল হওয়ার কারণে ফার্সি ভাষায় ওইসব সৈন্য সামন্ত খত্রা নামে অভিহিত করে এ এলাকাকে। তাদের উচ্চারিত খত্রা শব্দের অপভ্রংশই খাটরা হয়ে বৃটিশ আমলে সিএস জরিপে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে।
সুলতানি আমল ও মোগল আমলে জেলা ফতেহবাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল এ অঞ্চল। পরে গোপালগঞ্জ ফতেহবাদের থানা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশিষ্ট খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারক সেন্ট মথুরনাথ বসুর প্রচেষ্টায় গোপালগঞ্জকে মহকুমায় উন্নীত করা হয়। সেন্ট মথুরনাথ বসুই প্রথমে গোপালগঞ্জে কোর্ট এবং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতিষ্ঠিত মথুরনাথ ইনষ্টিটিউশনের (মিশনারী হাই স্কুল) ছাত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত গোপালগঞ্জ মহকুমায় থানার সংখ্যা ছিল ৪টি। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পরে গোপালগঞ্জ থানার ৩টি এবং কোটালীপাড়া থানার ২টি ইউনিয়ন নিয়ে টুংগীপাড়া থানা হিসাবে একটি নতুন থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই টুংগীপাড়া থানার টুংগীপাড়া গ্রামে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান এবং তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী ও আওয়মী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার জন্মস্থান।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, গোপালগঞ্জের পূর্ব নাম ছিল রাজগঞ্জ। মকিমপুর স্টেটের জমিদার রানী রাসমনীর জমিদারি এলাকা খাটরা মৌজায়। আর এই খাটরা মৌজায় ছিল রাজগঞ্জ। রানী রাসমনী বাস করতেন কলকাতার করনেশন স্টেটে। তার হয়ে নায়েব রজনী ঘোষ আজকের গোপালগঞ্জ (তত্কালীন রাজগঞ্জ) এলাকার জমিদারি তদারকি করতেন। রানী রাসমনীর স্নেহ ভাজন নায়েব রজনী ঘোষের এক আদুরে নাতির নাম ছিল নবগোপাল। রানী প্রজাদের ইচ্ছায় নবগোপালের নামের অংশ গোপাল-এর সাথে পূর্বেকার রাজগঞ্জের নামের গঞ্জ যুক্ত করে গোপালগঞ্জ নামের প্রবর্তন করেন।
গোপালগঞ্জ ঢাকা বিভাগের একটি জেলা। এর আয়তন ১৪৮৯ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৮৪ সালে গোপালগঞ্জ জেলা হিসাবে উন্নীত করার আগে এটি ফরিদপুর জেলার একটি মহকুমা ছিল। জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান সমান। মুসলমান ৬৩.৬২%, হিন্দু ৩৫.১৩%, খ্রিষ্টান ১.২০% এবং অন্যান্য .০২%। শিক্ষার গড় হার ৩৮.০৭%। জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা কৃষি। প্রধান ফসল ধান, পাট, আঁখ ও বাদাম। বিলুপ্তপ্রায় ফসলাদির মধ্যে রয়েছে চিনা, কাউন, আউশ ধান। জেলার প্রধান রপ্তানি ফসল পাট ও তরমুজ। প্রাচীন নির্দেশনাদির মধ্যে আছে চন্দ্রভর্মা ফোর্ট (কোটাল দূর্গ), বহলতলী মসজিদ (১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দ), সেন্ট মথুরনাথ এজি চার্চ, শ্রীধাম ওড়াকান্দির শ্রী হরিমন্দির, ননী ক্ষীরের নবরত্ন মন্দির, কোর্ট মসজিদ, কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি, দীঘলিয়া দক্ষিণা কালীবাড়ি ইত্যাদি।
ঐতিহাসিক ঘটনাবলী
এ অঞ্চলের ঘর্ঘরা (বর্তমান ঘাঘর) নদীর তীরে মোগল সম্রাট বাবরের সঙ্গে বাংলার সুলতান নুশরত শাহর যুদ্ধ হয়। ব্রিটিশ আমলের গোড়ার দিকে এ অঞ্চলের সন্ন্যাসি ও ফকির বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। ৬৯ সালে গণঅভ্যুথানের সময় শহীদ হন জলিলপাড় স্কুলের ছাত্র মহানন্দ বিশ্বাস।
ভৌগলিক অবস্থান ও সীমানা
বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাংশে মধুমতি নদী বিধৌত একটি জেলা। ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত ১৭টি জেলার একটির নাম গোপালগঞ্জ। এই জেলা ২৩০৩৬ উত্তর অক্ষাংশে এবং ৮৯০৫১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এর গড় উচ্চতা ৪৬ ফুট। এ জেলার পূর্বে মাদারীপুর ও বরিশাল জেলা, দক্ষিণে পিরোজপুর, বাগেরহাট ও খুলনা জেলা, পশ্চিমে নড়াইল ও মাগুরা জেলা এবং উত্তরে ফরিদপুর জেলা অবস্থিত। এ জেলার পূর্ব সীমানার খাটরা গ্রামের অধিবাসী হিন্দু ধর্মালম্বীরাই এ অঞ্চলে প্রথমে বসতি স্থাপন করে। ধারণা করা হয়, এটি বল্লাল সেনের আমলের (১১০৯-১১৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) ঘটনা।
(খ) জেলা সৃষ্টি ও প্রশাসনিক বিভাগঃ ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলা হিসাবে মর্যাদা লাভ করে। এর আগে এটি ছিল ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত একটি মহকুমা। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে গোপালগঞ্জ থানা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এ থানাটি মাদারীপুর মহকুমার আওতাভুক্ত ছিল। আর মাদারীপুর ছিল বাকেরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। ১৮৭৩ সালে মাদারীপুর মহকুমাকে বাকেরগঞ্জ জেলা থেকে কেটে এনে ফরিদপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ১৯০৯ সালে গোপালগঞ্জকে মহকুমা হিসাবে উন্নীত করা হয়। সে সময় শহরের লোকসংখ্যা ছিল মাত্র ৩৪৭৮ জন। বর্তমানে এ জেলায় উপজেলার সংখ্যা ৫ টি। টুংগীপাড়া, কোটলীপাড়া, মুকসুদপুর, কাশিয়ানী ও গোপালগঞ্জ সদর। পৌরসভা ৪ টি, ইউনিয়ন পরিষদ ৬৯টি, গ্রাম ৮৮০টি।
ঐতিহাসিক ঘটনাবলী
মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের সংগে আলাউদ্দিন হোসেন শাহর পুত্র নাসির উদ্দিন নসরত্ শাহর যুদ্ধ হয় এ অঞ্চলের ঘর্ঘরা নদীর তীরে। ঘর্ঘরা নদীই বর্তমানে কোটালীপাড়ার পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘাঘর নদী। নসরত্ শাহর আমলে দক্ষিণাঞ্চলে পর্তুগিজদের আক্রমণ ও লুটতরাজ বৃদ্ধি পেলে গোপালগঞ্জের সাধারণ লোকজন নিয়ে তিনি তা মোকাবেলা করেন।
ব্রিটিশ আমলের শুরুতেই এ অঞ্চলে সন্ন্যাসি বিদ্রোহ ও ফকির বিদ্রোহ দানা বেঁধে ওঠে। কোটালীপাড়া ও গোপালগঞ্জ সন্ন্যাসি ও ফকিরদের বেশ কিছু আখড়া ছিল। এ জেলার সবচেয়ে ঐতিহাসিক আন্দোলন হলো ফরায়েজি আন্দোলন। এখানে নীল চাষ বিরোধী আন্দোলনও হয়েছে। ১৮৪৬ সালে দুদু মিয়ার অনুচর কাদের বক্সের নেতৃত্বে পাঁচ চরে আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগ হয়। নীল কুঠির কর্নধার ডানলপ পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে কোটালীপাড়ার বান্ধাবাড়ী গ্রামের ধীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস শহীদ হন। তিনি এ জেলার প্রথম শহীদ। ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের সময় শহীদ হন জলিলপাড় গ্রামের মহানন্দ বিশ্বাস।
পুর্ণব্রহ্ম শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর (ওড়াকান্দি, কাশিয়ানী), উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামিক চিন্তাবিদ সদর শাহ শামচুল হক ফরিদপুরী (গওহরডাংগা, টুংগীপাড়া) ঐতিহাসিক ও হিষ্ট্রি অব বেঙ্গল গ্রন্থের রচয়িতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসি ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার (খান্দারপাড়, মুকসুদপুর) কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (ইনশিয়া, কোটালীপাড়া), নির্মল সেন প্রমুখ বরেণ্য ব্যক্তির বাড়ি, জন্মস্থান ও পৈত্রিক নিবাস এ জেলায়।
প্রাচীন নিদর্শনাদি ও প্রত্নসম্পদ
চন্দ্র ভর্মা ফোর্ট (কোটাল দূর্গ) কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের পৈত্রিক বাড়ি, কবি কৃষ্ণনাথ সার্বভৌমর (ললিত লবঙ্গলতা কাব্যগ্রন্থ প্রণেতা) বাড়ি, হরিণাহাটির জমিদার বাড়ি, দিঘলীয়া দক্ষিণা কালী বাড়ি, বহলতলী মসজিদ (১৫৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত) উলপুর জমিদার বাড়ি, সেন্ট মথুরনাথের সমাধি, সেন্ট মথুরনাথ এচি চার্চ, কোর্ট মসজিদ, ধর্মরায়ের বাড়ি, উজানীর জমিদার বাড়ি, শ্রীধাম ওড়াকান্দি, ননী ক্ষীর নবরত্ন মঠ, ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদারের পৈত্রিক বাড়ি, আদালত ভবন, পুরাতন হাসপাতাল ভবন ইত্যাদি। চতুর্থ শতাব্দীতে স্থাপিত কোটালীপাড়া চন্দ্রভর্মা ফোর্টটি পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে বড় দূর্গ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া রাজা স্কন্ধ গুপ্তের (৪৫৫-৪৬৭ খ্রিষ্টাব্দে) স্বর্ণমুদ্রা, রাজা সমাচার দেব, ধর্মাদিত্য ও গোপচন্দের আমলের তাম্রলিপি এ জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। এছাড়া টুংগীপাড়ায় জাতির পিতার সমাধি সৌধ কমপ্লেক্স একটি দর্শনীয় স্থান।
যাদের নিয়ে আমরা গর্বিত
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, শেখ ফজলুল হক মনি, খোন্দকার সামসুদ্দিন আহমেদ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী অহিদুজ্জামান, ক্যাপ্টেন ডা. ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ, নজির আহম্মেদ তালুকদার, সাবেক মন্ত্রী মোল্লা জালাল উদ্দিন আহম্মেদ, মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি, খান সাহেব শেখ মোশাররফ হোসেন, কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, এ্যাডভোকেট আলহাজ্ব কাজী আবদুর রশীদ, শেখ কবির হোসেন, অর্থনীতিবিদ বিশিষ্ট ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, সাবেক সিইসি এম.এ সাঈদ, সাবেক সচিব সৈয়দ আহম্মেদ বেগ, শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুর, সদর শাহ হুজুর, শামচুল হক ফরিদপুরী (ইসলামিক চিন্তাবিদ), সমাজসেবক রাইর সরাজ ঠাকুর, সাংবাদিক নির্মল সেন, শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, ক্রিকেটার এএসএম রকিবুল হাসান, সাবেক মন্ত্রী শেখ শহিদুল ইসলাম, সাবেক মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশিদ, এ্যাডভোকেট খোন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমেদ, সাবেক মন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মহব্বতজান চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী খান আবু মিয়া, শহীদ আব্দুল লতিফ, শহীদ মাহাবুব, শহীদ অধ্যাপক সন্তোষ হালদার, সেন্ট মথুরনাথ বসু, কৃষ্ণনাথ সার্বভৌম, রমেশ সেন, চন্দ্র নাথ বোস, অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস, সাহিত্যিক খালেক বিন জয়েনউদ্দিন, কৃতি ফুটবলার আবদুস সামাদ। কৃতি ফুটবলার সোহরাব হোসেন। জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক মো. ইলিয়াস হোসেন ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী অনিল কুমার বিশ্বাস।
লেখক :সিনিয়ার সাংবাদিক ও কবি
