প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। আমার বিশ্বাস, আপনারা নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সাথে সে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের পেশাগতভাবে দায়িত্বশীল এবং জনগণের প্রতি সহানুভূতিপরায়ণ হয়ে তাদের আস্থা অর্জনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা হচ্ছেন জনগণের আশা-ভরসাস্থল। কাজেই আপনাদের জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের প্রতি মনযোগী হতে হবে।
গতকাল রবিবার রাজধানীতে পুলিশ সদর দফতর চত্বরে নবনির্মিত ন্যাশনাল ক্রাইম কন্ট্রোল এ্যান্ড অপারেশনস মনিটরিং (এনকম) ভবনের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, দেশের উন্নয়ন বিরোধী অশুভ শক্তি দমনে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের আইনের কঠোর অনুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি পুলিশ বাহিনীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিপদগ্রস্ত মানুষ যারা তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য থানা, তদন্ত কেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি, পুলিশ বক্স ও অন্যান্য অফিসে যায় তারা যেন হয়রানি, দুর্ব্যবহার ও দুর্ভোগের শিকার না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি সদস্য ত্যাগ ও সেবার মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়ে দেশ ও জনগণের সেবায় এগিয়ে আসবেন। তিনি বলেন, আমার প্রত্যাশা আপনারাও কর্মক্ষেত্রে কোন ধরনের চাপে প্রভাবিত না হয়ে নিরপেক্ষভাবে নির্ভয়-নির্বিঘ্নে ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে জননিরাপত্তা ও আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ ৫ হাজার ৭শ’৭৩টি নির্বাচন অবাধ,সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোন নির্বাচনের বিরুদ্ধেই কোন অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা। এর পূর্বশর্ত হলো বিনিয়োগের পরিবেশ অটুট রাখা এবং ব্যক্তি সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর এই নিরাপত্তার পবিত্র দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে পুলিশ বাহিনীর উপর।
চলতি বছরের শুরু থেকে যুদ্ধাপরাধের মামলার রায়কে কেন্দ্র করে জামায়াতের সহিংসতার মধ্যেও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ধর্মান্ধ জামায়াত-শিবির ও হেফাজতের হিংস্র, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও ধ্বংসযজ্ঞ রোধে পুলিশ সদস্যগণ যে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, ত্যাগ, নিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন তার জন্য আমি এ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে ধন্যবাদ জানাই। পুলিশ বাহিনীকে তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ যখনই সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে জাতির পিতার প্রদর্শিত পথে একটি সুশৃঙ্খল, দায়িত্বশীল, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করেছে। তিনি বলেন, এবার সরকারের দায়িত্বে এসে তার সরকার পুলিশে ৭৩৩টি ক্যাডার পদসহ ৩২ হাজার পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইজিপি পদকে সিনিয়র সচিবের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। পুলিশ বিভাগের একাধিক পদকে গ্রেড-২ থেকে গ্রেড-১ এ উন্নীত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামছুল হক টুকু, স্বরাষ্ট্র সচিব সি কিউ কে মুশতাক আহমেদ ও জাপানের রাষ্ট্রদূত শিরো স্যাডো শিমা বক্তৃতা করেন। মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা এবং অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (প্রশাসন) এ কে এম শহীদুল হক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
ন্যাশনাল ক্রাইম কন্ট্রোল এন্ড অপারেশনস মনিটরিং ভবন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। ওই ভবনে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বিষয় ও সমস্যার কথা প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ সহকারে শোনেন। এসব সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দেন।
বৈঠকে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) একেএম শহীদুল হক, ডিআইজি (হাইওয়ে) আসাদুজ্জামান, ডিআইজি (চট্টগ্রাম রেঞ্জ) নওশের আলী, ডিআইজি (খুলনা রেঞ্জ) এসএম নুরুজ্জামান, ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মাহরুফ হাসান, র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্ণেল জিয়াউল হাসান, পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি সৈয়দ আতিকুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার হারুন-অর-রশীদ প্রমুখ। বৈঠকে পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী আগামীকালসিলেট যাবেন কৈলাশটিলার তেলকূপ খননের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন
হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী, সিলেট অফিস
২২০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেটের গোলাপগঞ্জে সিলেট গ্যাসফিল্ডে কৈলাশটিলার ৭নং নতুন তেলকূপ খনন করা হচ্ছে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর এ খননকাজের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গ্যাসফিল্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গোলাপগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্রকল্পে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে খনন কাজ শেষ হবে। খনন কাজের তিন মাস পর উত্পাদনে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন কর্মকর্তারা। নতুন কূপ খনন হলে তেল উত্তোলন সম্ভব হবে, মন্তব্য করে কৈলাশটিলা গ্যাসফিল্ডের ডিজিএম প্রকৌশলী মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ মোল্লা ইত্তেফাককে বলেন, প্রাথমিকভাবে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৩৬শ’ মিটার পর্যন্ত খনন করার পর যদি তেল না পাওয়া যায় তাহলে গ্যাস উত্তোলন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সিলেটে সরকারি ও দলীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি ও তত্পরতা চলছে। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা। তার আগমনকে সফল করতে জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ-সংগঠনের নেতৃবৃন্দ দফায় দফায় বৈঠক করছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে র্যাব-পুলিশের ৬ হাজার সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। গোলাপগঞ্জবাসীও অধীর অপেক্ষায় দিন গুণছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তাদের কিছু দাবি-দাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে।
সিলেটের বিভিন্ন স্থানের মত গোলাপগঞ্জ খনিজসম্পদ তেল-গ্যাসে ভরপুর। পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, গোলাপগঞ্জের কৈলাশটিলা গ্যাসকূপ এলাকায় জ্বালানি তেলের নতুন লেয়ার থাকার সম্ভাবনায় এই কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স।
২০১১-১২ সালে ত্রি-মাত্রিক জরিপ চালিয়ে বাপেক্স এই কূপে তেল-গ্যাসের সন্ধান পায়। এ উপজেলায় ইতিপূর্বে আবিষ্কৃত ৬ টি গ্যাসকূপ থেকে দৈনিক ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয় যা জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত। এই গ্যাস দেশের চাহিদার ৪ দশমিক ৫ ভাগ পূরণ করে থাকে। এছাড়া গড়ে দৈনিক ৭শ’ ব্যারেল কনডেনসেট উত্তোলন করা হয়। এ থেকে ৩শ’ ব্যারেল পরিশোধিত হয়ে স্থানীয়ভাবে বিতরণ হয়। বাকি কনডেনসেট বিপিসি পরিশোধন করে বিতরণ করে। সূত্রমতে, গোলাপগঞ্জে গ্যাসের রিজার্ভ রয়েছে এক দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। কর্মকর্তারা মনে করেন এখানে উত্তোলনযোগ্য এক ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা যেতে পারে। এছাড়া জ্বালানি তেলের রিজার্ভ রয়েছে ১০৯ মিলিয়ন ব্যারেল।
সিলেট গ্যাসফিল্ডের আওতাধীন গোলাপগঞ্জে প্রায় তিন শতাধিক বর্গকিলোমিটার জরিপ কাজে দেশীয় তেল-গ্যাস কোম্পানি বাপেক্স এ উপজেলার বেশ কয়েকটি স্থানে তেল-গ্যাসের সন্ধান পায়। জরিপে উপজেলার পৌরশহরের দাঁড়িপাতন এলাকায় বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসের সন্ধান পেলে পেট্রোলবাংলা কর্তৃপক্ষ দাঁড়িপাতন মৌজার প্রায় দেড়শ’ একর ভূমি অধিগ্রহণ করে। এই ভূমিতে ৭ নং নতুন কূপ খননের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার সকল প্রস্তুতি শেষ বলে সূত্র জানায়।
প্রধানমন্ত্রী এদিন সকালে হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরান (র)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। তিনি সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে নতুন একটি আর্মি ডিভিশন (১৭ ডিভিশন) উদ্বোধন করবেন। বেলা পৌনে ৩ টায় গোলাপগঞ্জ এমসি একাডেমী খেলার মাঠে উদ্বোধন করবেন সিলেট ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, কোতোয়ালী মডেল থানা, আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়, সিলেট কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, ৩১ শয্যাবিশিষ্ট দক্ষিণ সুরমা উপজেলা হাসপাতাল কমপ্লেক্স, সিলেট গাছবাড়ী কানাইঘাট বাজার সড়কের কানাইঘাট বাজার প্রান্তে সুরমা নদীর উপর ২৯৪ মিটার দীর্ঘ সেতু, বাগবাড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, সিলেট জেলা পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট এবং লায়ন্স শিশু হাসপাতাল ।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী সিলেট মেরিন একাডেমী স্থাপন প্রকল্প, সিলেট শহীদ সামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালকে শিশু হাসপাতালে রূপান্তর প্রকল্প, গোয়াইনঘাট রাধানগর বাজার জিসি জাফলং বাজার রাস্তায় পিয়াইন নদীর উপর ৩৬০ মিটার পিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ, গোলাপগঞ্জ কৈলাশটিলা গ্যাসফিল্ড ৭নং কূপ খনন প্রকল্পের উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সিলেট গ্যাস ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক আপগ্রেডেশন প্রজেক্টের আওতায় বিশ্বনাথ ও বালাগঞ্জ উপজেলার গ্যাস সরবরাহ পাইপ স্থাপনকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। তিনি সেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখবেন।
দলীয় প্রস্তুতি ব্যাপক
প্রধানমন্ত্রীর সিলেট আগমন ও গোলাপগঞ্জের জনসভা সফলের লক্ষ্যে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা গতকাল রবিবার দুপুরে তালতলাস্থ ‘গুলশান সেন্টারে’ অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক সিটি মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। সাধারণ সম্পাদক আসাদউদ্দিন আহমদের পরিচালনায় বর্ধিত সভায় প্রধানমন্ত্রীর জনসভা সফল করার লক্ষ্যে সিলেট মহানগরীর সকল ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সম্মিলিতভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানোর আহবান জানানো হয়।
