একটি মোটরসাইকেলের লোভে স্কুলপড়ুয়া তিন কিশোর বৃদ্ধ এক দম্পতিকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। পুলিশ মোবাইল ফোনের কললিস্টের সূত্র ধরে গত শুক্রবার ভোরে ওই তিন কিশোরের দুইজন ফয়সাল মিয়া (১৪) ও শাখাওয়াত হোসেনকে (১৪) চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করেছে। তারা পুলিশের কাছে দম্পতি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। গতকাল রবিবার নরসিংদী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর তাদের জেল হাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে হত্যা মিশনে অংশ নেয়া অপর কিশোর সুজন (১৫) এখনও পলাতক রয়েছে। মোটর সাইকেলটি বিক্রি করে টাকা ভাগাভাগি করে নেয়ার কথা পুলিশকে জানায়।
ওই ভয়াবহ জোড়াখুনের ঘটনাটি ঘটে গত ২৭ আগস্ট ভোরে জেলার পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালের বালিয়া গ্রামে। ঘাতকরা বৃদ্ধ আরমান উল্লাহ ভুঁইয়ার (৭০) একতলা দালানের দরজা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে তাকে ও তার স্ত্রী সালমা বেগমকে (৫৫) শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে একটি মোটরসাইকেল লুট করে নিয়ে যায়। গত শনিবার দুপুরে নরসিংদী পুলিশ সুপার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে পুলিশ এই হত্যা মামলা ও কথিত ঘাতকদের গ্রেফতার অভিযান সম্পর্কে গণমাধ্যমকে ব্রিফ করে।
জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন বলেন, গ্রেফতারকৃত দুই কিশোরের স্বীকারোক্তি ও তথ্য-প্রমাণে এখনও পর্যন্ত শুধু মোটরসাইকেলটি লুট হওয়া ব্যতীত অন্য কোন ক্লু খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে এর বাইরে অন্য কোন কারণ রয়েছে কিনা তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুব্রত হালদারও বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধান ও গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে আমাদের ধারণা, মোটরসাইকেলটি লুট করার জন্যই ওই দম্পতিকে হত্যা করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, পিতা-মাতাকে হত্যার ঘটনায় নিহত আরমান উল্লাহ ভুঁইয়ার কন্যা ফাহমিনা রহমান শিল্পী বাদী হয়ে পলাশ থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। দীর্ঘ ১৮ দিন পর পুলিশ বৃদ্ধ দম্পতির মোবাইল ফোনের কললিস্ট ধরে তদন্ত চালিয়ে শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রামের ডাবলমুরিং থানার পূর্ব মাদারবাড়ী এলাকা থেকে ফয়সাল মিয়াকে গ্রেফতার করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যার কথা স্বীকার করে এবং তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী নগরীর অক্সিজেন মোড়ের একটি দোকান থেকে সাখাওয়াত হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। ফয়সাল চট্টগ্রাম রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র এবং সাখাওয়াত পলুগ্রাম বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। দু’জনেরই বাড়ি চট্টগ্রামে। ফয়সাল ও সুজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। আর শাখাওয়াত পরোক্ষভাবে তাদের সহযোগিতা করেছে। পুলিশ সুজনকে গ্রেফতার করতে না পারলেও লুণ্ঠনকৃত মোটরসাইকেল ও একটি মোবাইল সেট উদ্ধার করেছে।
এদিকে সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের কারণেই দেশের কিশোররা হত্যার মত অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। মনোরোগ বিজ্ঞানী ডা. মোহিত কমিলি বলেন, যে বয়সে দুই কিশোর খুন করেছে, এ বয়সে খুনের কথা তো মাথায় থাকারই কথা না। এর যথাযথ কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
যেভাবে হত্যা
গ্রেফতারের পর ফয়সাল ও শাখাওয়াত পুলিশকে জানায়, বালিয়া গ্রামের বাড়িটিতে আরমান ভুঁইয়া ও তার স্ত্রী বসবাস করতেন। পাশের গ্রামে ফয়সালের ফুফুর বাড়ি। সেখানে বেড়াতে গিয়ে বৃদ্ধ আরমান ভুঁইয়ার সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটে। বৃদ্ধ নিজের মোটরসাইকেলে করে ফয়সালকে নিয়ে বাজারে যায়। বৃদ্ধ দম্পতি বাড়িতে একা বসবাস করায় ফয়সালের নজর পড়ে তাদের মোটরসাইকেলটির দিকে। এরপর থেকেই ফয়সাল আরমানের সাথে সম্পর্কের উন্নতির পাশাপাশি তার বাসায় আসা-যাওয়া শুরু করে। একপর্যায়ে মোটরসাইকেলটি নেয়ার জন্য তাদের হত্যার পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনামতো ফয়সাল মামাতো ভাই সুজনকে নিয়ে গত ২৬ আগস্ট সকালে চট্টগ্রাম থেকে নরসিংদীর পলাশে আসে। রাতে দম্পতির বাড়িতে প্রবেশ করে সুজনকে তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং জানায়, তারা রাতে এই বাসায় থাকবে। বৃদ্ধা অসম্মতি জানালে সুজন তখনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় এবং ফয়সাল ভোরে চলে যাবে বলে বাড়িতে থেকে যায়। ভোর চারটার দিকে ফয়সালকে বিদায় দিতে বাড়ির গেট খুললে সুজন ভেতরে প্রবেশ করে এবং আরমান ভুঁইয়াকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। চিত্কার শুনে স্ত্রী সালমা বেগম এগিয়ে আসলে তাকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয়। পরে দুজনে মিলে লুঙ্গি দিয়ে পেঁচিয়ে প্রথমে আরমানকে ও পরে তার স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহের জন্য তারা আলমিরায় থাকা জমির দলিলে আগুন লাগিয়ে দেয়। পরে মোটরসাইকেলটি নিয়ে তারা চট্টগ্রামে চলে যায়।
নিহতের মেয়ে ফাহমিনা রহমান শিল্পী জানান, পুলিশের আন্তরিকতার কারণে অল্প সময়ে ঘটনা উদ্ঘাটন ও দুই হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। আশা করি খুব দ্রুতই অপর হত্যাকারীকেও গ্রেপ্তার করবে পুলিশ। তিনি বলেন, আমার বৃদ্ধ মা-বাবাকে যারা খুন করেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।
