নাটোরের লোকজ সংস্কৃতির ভান্ডার সমৃদ্ধ।এর বৈচিত্র অফুরন্ত। শহরাঞ্চলের ক্ষুদ্র গন্ডী পেরিয়ে গেলেই পাওয়া যায় লোকজ সংস্কৃতির বেগবান ধারার খোঁজ। অন্যদিকে আছে লোকজ বা গ্রাম্য ধাঁধা যাকে নাটোরের কোন কোন অঞ্চলে ‘মান’ বলা হয়। সাধারণ মানুষকে মোটাবুদ্ধির বলে অবজ্ঞা করার যে স্বভাব আমাদের শহুরে পন্ডিতদের মাঝে দৃশ্যমান, তার প্রকৃষ্ট প্রতিবাদ হচ্ছে পল্লীবাসী সাধারণ মানুষ কর্তৃক ধাঁধার সৃষ্টি। কোন জিনিসকে বা বস্তুকে প্রত্যক্ষভাবে না বলে ধাঁধার মাধ্যমে প্রহেলিকা সৃষ্টি করে বলাটা একধরনের উচ্চাঙ্গের শিল্পসৃষ্টিও বটে। নাটোর জেলার ধাাঁধাসমূহ শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বড়দেরও বিমল আনন্দের সামগ্রী। মানুষের, বিশেষত শিশু-কিশোরদের বুদ্ধিবৃত্তির প্রখরতা বৃদ্ধি ও জ্ঞান অনুশীলনের প্রকৃষ্ট পন্থা। গ্রামাঞ্চলের মুরুব্বিরা সন্ধ্যায় সারাদিনের কর্মক্লান্ত দেহ এলিয়ে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে দাওয়ায় বা উঠোনে সপ-পাটি-মাদুর বিছিয়ে শুয়ে-বসে ধাঁধা বা মান ভান্ডরের আসর বসান। যে বা যারাই এই ধাাঁধাগুলির সৃষ্টি করুক না কেন, তাদের মেধা ও প্রত্যুতপন্নমতিত্বের কথা ভাবলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। চকিত বুদ্ধির ঝিলিক, পরস্পর সমৃদ্ধ বস্তুগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক আর তীব্র কৌতুকের ঝলকানির সমন্বয় দেখা যায় এই ধাাঁধাগুলিতে।
ধাাঁধার পাশাপাশি নাটোর জেলার মানুষ মুখে মুখে অসংখ্য প্রবাদ-প্রবচন আউড়ে থাকে। এই প্রবাদ প্রবচনে কৃষি, আবহাওয়া, সমাজতত্ব, সামাজিক অবস্থাসহ জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার সারাত্সার উত্সারিত হয়েছে। সরস ছন্দবহ ভাবব্যঞ্জক বাক্যসমষ্টিই প্রবাদ। অনুভূতিপ্রবণ মানবমনের অভিজ্ঞতা হতে প্রবাদের জন্ম। প্রবাদকে খন্ড জ্ঞানভান্ডার বলা চলে। দেখা যায়, পল্লীর প্রবীণ লোকেরা কথায় কথায় প্রবাদ আওড়ান। এগুলো যেন তাদের রক্তের সাথে মিশে আছে। প্রাসঙ্গিক প্রয়োজনে তাদের মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফুর্তভাবে বেরিয়ে আসে রাশি রাশি প্রবাদ বচন। স্থান-কাল-পাত্রভেদে কোথায় কোনটি প্রযোজ্য, অন্ত্মর-ভান্ডার খুঁজে বের করতে তাদের আদৌ বেগ পেতে হয় না।
মাদারের গান বা মাদার গান নাটোর জেলার নিজস্ব লোকসঙ্গীত হিসাবে পরিচিত। বাংলাদেশের অন্য কোন অঞ্চলে এই গানের আসর বসলেও এর জন্ম মূলত নাটোর জেলাতেই। নাটোরের সর্বত্র মাদার গানের আসর ছিল একসময় নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। মাদারের গান বা মাদার পীরের গান অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল একসময়। যদিও মাদার পীর নামে কোন পীরের দরগা বা মাজার নেই কোথাও, তবু মাদার পীরের নামে মানত বা মানসিক করার চল আছে সর্বত্র। বিশেষত নাটোর জেলা সদর ও চলনবিল অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে। সন্তান কামনায়, রোগ-শোক থেকে নিরাময় কিংবা বিপদ থেকে উদ্ধারের আশায় লোকে মাদার পীরের নামে মানত করে এবং ফল পেলে মাদার গানের আসর বসায়। একসময় এই অঞ্চলের গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে, মাঠে ময়দানে, উঠোনে-দাওয়ায় আসর বসতো মাদারগানের। পথে-প্রান্তরে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হতো মাদার গানের সুর। পথ চলতে, লাঙল দিতে, জমি নিড়াতে, গরম্ন চরাতে- সর্বত্রই মানুষের গলা চিরে বেরুত এই মাদার গানের ধুয়া। বিশেষ করে আসর বসত মহররমের চাঁদ উঠলে, কলেরা-বসন্ত দেখা দিলে, জমিতে মড়ক দেখা দিলে।
মাদার পীর কোন বাস্তব পীর নন। মারফতি তরিকায় কঠোর সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন মাদার পীর। তার এক-একটি কেরামতি নিয়ে এক-একটি পালা রচিত হয়েছে। এইরকম তার কয়েকটি পালার কথা জানা যায়। যেমন- জিন্দাশাহ্ মাদার, আসকান মাদার, তালেমূল মাদার, খাতেমূল মাদার ইত্যাদি। এক এক পালায় এক এক নামে আবির্ভাব ঘটে শাহ্ মাদার পীরের। আর সব লোকগীতির মতো মাদার গানের আসর বসে খুব সাদাসিধেভাবে। সামিয়ানা টাঙিয়ে তার নিচে পাটি-সপ-মাদুর বিছিয়ে বসে এই গানের আসর। কলা-কুশলীর সংখ্যাও বেশী নয়। প্রধান চরিত্র দুইজন। মাদার পীর ও তার শিষ্য জুমল শাহ্। এছাড়া আছে কয়েকজন দোহার-বাইন। দোহার-বাইনরা জটলা করে বসে আসরের মাঝখানে। তাদের হাতে থাকে খঞ্জনি। চারপাশে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে গান গায় মাদার পীর ও জুমল শাহ্। তাদের হাঁক-গানের সাথে ধুয়া ধরে দোহাররা। সওয়াল-জবাব-বিবৃতি সবকিছু করে মাদার জুমল দুইজনই। এদের পেছনে পেছনে গান-বাজনার তালে তালে নাচে নর্তকী। মাদার গানের নর্তকীর স্থানীয় নাম ছুকরি। ধুতি-শাড়ি-থান পরে পুরুষরাই ছুকরি সাজে এই গানে। দোহারদের বা জুমল শাহের জন্য অন্য কোন সাজ পোশাক নেই। শুধু মাদার পীরের জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ পোশাকের। তার পরনে থাকে আলখাল্লা, গলায় তসবিহ, মাথায় থাকে শিরস্ত্রাণ, হাতে আশা (লাঠি)।
পদ্মপূরাণ বা মনসার গান ও ভাসানযাত্রা। এই দুই পালার মধ্যে সাযুজ্য থাকলেও নাটোরের বিভিন্ন অঞ্চল ভেদে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। পদ্মপুরাণ নাটোর অঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য কাব্য আলেখ্য। সাপের দেবী মনসা বা পদ্মার নাম অনুসারে এই নামকরণ। এই গান বর্ণনামূলক। স্থানীয় লোক বিশ্বাস করে, প্রতি বছর মনসা গানের আয়োজন করলে সর্পাঘাতে পরিবারের কারো অকাল মৃত্যু ঘটবে না। মনসা পূজা উপলক্ষে গ্রামাঞ্চলে তো বটেই, শহরের কোন কোন বাড়িতে এখনো পদ্মপূরাণের আসর বসানো হয়। এটি নিতান্ত বর্ণনামূলক গান। সুতানাগের দংশনে লক্ষীন্দরের মৃত্যু থেকে শুরু করে পুরোটা বেগুলারই কাহিনী। অন্যদিকে ভাসান গান মূলত চলনবিল অঞ্চলের পদ্মপূরাণের একটি রূপান্ত্মর। জনশ্রুতি আছে যে, চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা মধুকর যে কালীদহ সাগরে নিমজ্জিত হয়, চলনবিলই সেকালের সেই কালীদহ সাগর। ভাসান গানের মূল পর্ব বেহুলা আর লক্ষীন্দরের গীতগাঁথা হলেও এই কাহিনীর শাখা প্রশাখা অছে অনেক। যেমন- ধম্মন্ত সওদাগর, শ্রীমন্ত সওদাগর, কুটিশ সওদাগরের স্ত্রী কমলা সুন্দরী প্রভৃতি।
বিয়ের সময় নাটোরের গ্রামাঞ্চলে মেয়ে মহলে নৃত্য-গীতের প্রচলন দেখার মত। গ্রামাঞ্চলে বিয়ের গান এখনো স্বমহিমায় তার অস্বিত্ব বজায় রেখেছে। নাটোর জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মুর্শিদী গান, ধুয়া গান, বারমাসি গান, জারিগান, নৌকাবাইচের গান, লোককাহিনী, মুখা খেলা, বিচ্ছেদ গান, টপ্পা গান, কবি গান, যোগীর গানসহ লোকজ সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান। কিছু কিছু বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিছু দ্রুত বিলীয়মান। সেগুলি সম্পূর্ণরূপে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক ও ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞ।
