স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের নেতা কিংবা সংসদ সদস্যের হুকুম পালনে ব্যস্ত। একারণে ন্যায়বিচার প্রার্থীরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। প্রকাশ্যে চলছে ঘুষ বাণিজ্য। স্থানীয় থানাগুলোতে অনুরূপ চিত্র স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে দায়িত্বে অবহেলার এ অভিযোগ সম্পর্কে পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, অপরাধী যেই হোক, পুলিশের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়া চলবে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, প্রকাশ্যে উেকাচ নেয়ার দৃশ্য স্বাভাবিক ঘটনা। এ টাকার ভাগ নিয়মিত পৌঁছে যায় ওসি, এএসপি, এসপি ও রেঞ্জে ডিআইজি পর্যন্ত। উেকাচ না দিলে থানা পুলিশের হয়রানির শিকার হন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় এমপি পছন্দের ওসি ও এসআইকে বদিল করে আনেন। ঐ সব ওসি ও এসআইর পক্ষে এমপির কথার বাইরে কাজ করা সম্ভব হয় না। এমনকি অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা হত্যা ও সন্ত্রাসী হামলার ফাইনাল রিপোর্ট এমপি ও স্থানীয় নেতার কথা মত দিতে হয়। থানার খবরদারি থেকে দূরে থাকেন এমন এমপির সংখ্যা খুবই কম। কয়েক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে স্থানীয় থানাগুলোর যে পরিবেশ ছিল বর্তমানেও একই পরিবেশ। রংপুর, দিনাজপুর, বরিশাল, সিলেট, কুমিল্লা, রাজশাহী, খুলনার বেশ কয়েকজন ইত্তেফাক সংবাদদাতা জানান, থানায় মামলা কিংবা এজাহার দায়ের করতে গেলে থানা থেকে বলা হয় আওয়ামী লীগ কিংবা অঙ্গ সংগঠনের নেতা অথবা সংসদ সদস্যের অনুমোদন নিয়ে আসতে। না হলে টেলিফোনে থানার ওসিকে ফোন করার জন্য বলা হয়।
পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, সন্ত্রাসী হামলা, চাঁদাবাজি, দখল ও হত্যাকাণ্ডে এজাহারভুক্ত কিংবা যারা সরাসরি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন, যাদেরকে প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখছেন, পুলিশি তদন্তে প্রমাণ মিলেছে এমন সব মামলা থেকেও আসামিদের নাম বাদ দিতে ওসি ও তদন্তকারী কর্মকর্তাকে চাপ দেন এমপি ও স্থানীয় নেতারা। এমপি ও স্থানীয় নেতার কথার বাইরে গেলে ওসির ঐ থানায় থাকা মুশকিল। এমন অনৈতিক ও দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডে জড়িত বেশ কয়েকজন ওসি ও এসআইর বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দফতর থেকে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
রাজধানীর গুলশান থানার সপারসওয়ার্ল্ডের প্রবেশপথে প্রকাশ্যে মতিঝিল থানার যুবলীগ নেতা জাহিদ হাসান মিল্কিকে ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে হত্যা করা হয়। কারা হত্যা করেছে তা তদন্তে বের হয়ে আসছে। প্রধান আসামি যুবলীগ নেতা তারেক র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয়। জড়িত বাকিরা যুবলীগ নেতাকর্মী। এদেরকে মামলা থেকে রাজনৈতিক কারণে অব্যাহতি দেয়ার জন্য একজন সংসদ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতা সুপারিশ এবং পুলিশকে চাপ দিয়ে আসছেন। একই অবস্থা পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলায়। আগস্ট মাসে স্বরূপকাঠিতে প্রকাশ্যে হামলা চালানো হয়। সেখানে আশিষ বড়ালসহ কয়েকজন আহত হয়। উপজেলা চেয়ারম্যান ও আশিষ বড়ালের বাড়ি একই এলাকায়। ঐ হামলাকারীদের প্রকাশ্যে প্রত্যক্ষদর্শী দেখেছে। আশিষ বড়াল বাদি হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও তার ভাইসহ বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করেন। অথচ পুলিশ দলীয় চাপে এই মামলার ফাইনাল রিপোর্টের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বিভিন্ন দিকের চাপের মুখে ঐ তত্পরতা আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে বলে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান।
ভাণ্ডারিয়ায় গত বছর ১৪ ডিসেম্বর মাসে প্রকাশ্যে দিবালোকে দুলাল চেয়ারম্যানকে হত্যা করে। ইতিমধ্যে পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে। এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও কিলার এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। নেপথ্যে মূল পরিকল্পনাকারী ক্ষমতার অন্তরাল থেকে কলকাঠি নাড়ছে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডে নিজেকে জড়িয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। খুনিদের নাম-ঠিকানা বলেছেন। তবে এ মামলায় এমন তদ্বির হচ্ছে তাতে এ মামলার ভবিষ্যত্ কি হবে এ নিয়ে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ বিপাকে।
কাউখালী উপজেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এনামুল হককে ২০ আগস্ট তার বাড়ির অদূরে বেকটিয়ায় দিনে দুপুরে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। ইতিমধ্যে জড়িতদের কয়েকজন জামিন পেয়েছেন। জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশের নিরব ভূমিকা এলাকাবাসীকে ভাবিয়ে তুলছে। জড়িতরা স্থানীয় যুবলীগ নেতাকর্মী। তদন্তের ধরন দেখে মনে হয় জড়িতদের সাথে পুলিশের জামাই-শ্বশুর সম্পর্ক । একজন গ্রেফতার হলেও এজাহারভুক্ত সবাই জামিনে বাইরে রয়েছেন। সারাদেশে হত্যা মামলা, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, দখলবাজি প্রায় সকল মামলার তদন্ত হবে কি হবে না তা দলীয় নেতার ওপর নির্ভরশীল। এমন অভিযোগ প্রতিদিন পাওয়া যায়।
বর্তমান সরকার জনবল বৃদ্ধিসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি সরবরাহ ও নান্দনিক ভবন পর্যন্ত নির্মাণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছেন যে, সন্ত্রাসীদের কিংবা অপরাধীদের কোন দল নেই। অপরাধী গ্রেফতারে কোন ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা স্থানীয় পুলিশে কার্যকর হয় না। সেখানকার চিত্র ভিন্ন।
পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্ট নির্দেশনা বাস্তবায়নে পুলিশ বাধ্য। সেইভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। অপরাধী কোন দলের সেটা দেখার বিষয় নয়। সে একজন অপরাধী, এটাই পুলিশের কাছে তার পরিচয়। এ নির্দেশনার বাইরে কারো কথা কিংবা চাপে পড়ে বেআইনি কাজকে আইনে পরিণত করে নিরীহ মানুষকে হয়রানি এবং প্রকৃত আসামি গ্রেফতারে ব্যর্থ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতিমধ্যে অনেক অফিসারকে এ সব কাজের জন্য বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
আইজিপি বলেন, জনগণের আইন-শৃঙ্খলা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। আগে আইন মানতে হবে। তারপর প্রয়োগ হবে। শীর্ষ মহল থেকে অপরাধী কিংবা জড়িত দলীয় লোক সম্পর্কে কোন তদ্বির তার কাছে আসে নাই। এ কারণে দেশে আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইতিমধ্যে সারাদেশের অপরাধ মনিটরিং, খুনি, সন্ত্রাসীসহ বিভিন্ন অপরাধীদের পূর্ণাঙ্গ ডাটা নবনির্মিত ন্যাশনাল ক্রাইম কন্ট্রোল এন্ড অপারেশন মনিটরিং কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। দ্রুত অপরাধীকে শনাক্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণে আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি আরো উন্নতি হবে বলে তিনি জানান।
পিরোজপুর জেলার পুলিশ এম আকতারুজ্জামান বলেন, স্বরূপকাঠির আশিষ বড়াল হামলা, ভাণ্ডারিয়া দুলাল চেয়ারম্যান হত্যা ও কাউখালী এনামুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত যেই হোক না কেন কোন ছাড় দেয়া হবে না। তদন্ত ও সাক্ষ্য প্রমাণে তাদেরকে গ্রেফতার করা হবে। ইতিমধ্যে এ সব হামলায় আসামি গ্রেফতার হয়েছে বলে তিনি জানান।
