অণুগল্প

সন্তান যেন থাকে মাছে ভাতে

আপডেট : ১৭ মে ২০১৯, ২০:৩৫

 

গাঁয়ের মেঠোপথ। তার পাশেই এক আটপৌরে ছোটখাটো কুঁড়েঘর। সেখান থেকেই টিমটিমে আলোটা ঠিকরে পড়ছে বাইরে। ঘরের একমাত্র বাসিন্দা বুড়িটি তখনো জেগে। পুরো গ্রাম সুমসাম। তার মাঝে কেরোসিন ভেজা সলতের কুপিবাতি জ্বলছে এ ঘরেই। বুড়ি জাল বুনছে আর আপন খেয়ালে গুনগুনিয়ে গাওয়ালি গীত গাইছে।

এ সময় নিঃশব্দ কিছু মানুষের হাঁটাচলার খসখস আওয়াজ এসে থামে ঘরের পাশে। এরা মুক্তিযোদ্ধা। বিকেলে তাদের এক যোদ্ধা বন্ধু দেখা করতে এসেছিল ক্যাম্পে। গালগল্প-আড্ডার মাঝেই শুরু হয় প্রবল বৃষ্টিপাত। সন্ধ্যা পর্যন্ত। এরপর বন্ধু যোদ্ধাকে এগিয়ে দিতে তারা কয়েকজন সাথে চলল। খানিক এগোতেই সামনে পড়ল এক পুরনো পুকুর। পুকুরের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই বাজের আওয়াজ। সঙ্গে বিদ্যুত্ চমক। আলোর ঝলকানিতে তাদের চোখে পড়ল অভূতপূর্ব দৃশ্য। অগণিত কই মাগুর টাকি শিং মাছ লাফিয়ে লাফিয়ে পুকুরের পানি ছেড়ে উঠে এসেছে পাড়ে। সব তাজা জ্যান্ত মাছ।

মুক্তিযোদ্ধারা মাছ ধরার আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। হাতে মাছের কাঁটা ফুটছে, রক্তাক্ত হয়ে উঠছে, সেদিকে নজর নেই কারো। মাছ রাখার জায়গা নেই। পরনের লুঙ্গি কোমর পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়ে ওতেই রাখছে। কিছু কিছু মাছ সুযোগ পেয়ে ওখান থেকেই নেমে যাচ্ছে।

এদিকে যে রাত বাড়ছে খেয়াল নেই। হুঁশ হয় যখন মাছ রাখার আর কোনো জায়গা না পাওয়া যায়। এ সময়ই তাদের চোখে পড়ে মিটিমিটি আলো। দূরে। ওখানে বোধহয় মানুষ জেগে আছে। মাছগুলো তাকেই দেয়া যেতে পারে।

বাইরে মানুষের সাড়া পেয়ে বুড়ি উঠে দাঁড়াল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা খোলে। দেখে একদল তরুণ দাঁড়িয়ে। পানিতে ভিজে টই-টম্বুর। হৈহৈ করে ওরা ঘরে ঢুকল। ভিজে গেল ঘরের মাটি লেপা মেঝে। ওরা মুক্তিযোদ্ধা শুনেই বুড়ির মুখ প্রশান্তির হাসিতে ঝলমল করে উঠল।

ওরা বলল, আপনাকে মাছ দিতে এসেছি। এত কাছ নিয়ে আমরা কী করব। সব দিয়ে যাই আপনাকে।

বুড়ি মাথা নেড়ে বলল: মাছ তো আমি নেব না। নিতে পারি এক শর্তে। আমার ছেলে স্বামীকে ধরে নিয়ে গিয়েছে হারামজাদারা। ওরা বেঁচে আছে, না মরে গিয়েছে জানি না। কী খেতে পাচ্ছে নাকি খাওয়া হচ্ছেই না তাও জানি না। আমি মাছ নিজের হাতে রেঁধে তোমাদের খাওয়াব। তাহলেই আমার জান জুড়োবে।

বুড়ির সকরুণ আবেদন তরুণরা ফেলতে পারল না। মাছগুলো রেখে দিল ঘরের একপাশে রাখা মাটির বড় বাসনে। বুড়ি তার থেকে কিছু মাছ নিয়ে কেটেকুটে মসলা মাখিয়ে চুলোয় চড়িয়ে দিল। ঘরে অল্প একটু চাল ছিল, তার সবটুকুই ভাতের হাঁড়িতে নিয়ে রান্না শুরু করল।

মুক্তিযোদ্ধাদের ভিজে যাওয়া জামা-কাপড়ের দিকেও বুড়ির নজর। তোরঙ্গ থেকে বের করে আনল তার শাড়ি আর বিছানার চাদর।

বুড়ি নিজ হাতে পরিবেশন করল খাবার। তার মুখে হাসির দীপ্তি। তরুণরাও খাচ্ছে মহানন্দে। হঠাত্ একজন খাওয়া থামিয়ে উঠে এল বুড়ির কাছে। তাঁর পা ছুঁয়ে কদমবুচি করল। বুড়ির চোখে কী পানির ঝিলিক। বিড়বিড় করে বলল: বেঁচে থাকো বাবা তোমরা। মাছে ভাতে। জয়ী হও।