‘আমার সৌভাগ্য, গ্রেটদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছি’

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪২
স্কুল জীবন থেকেই শ্রীলঙ্কায় আলোচিত ক্রিকেটার তিনি। জাতীয় দলে ঢোকার আগেই বলা হয়েছে—শ্রীলঙ্কার ভবিষ্যত অধিনায়ক। তারপর অনেক উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে আজ শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলের অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস। অনেকেই বলেন, তার বড় পরিচয়, তিনি মাহেলা জয়াবর্ধনে ও কুমার সাঙ্গাকারার মতো দুই গ্রেট অধিনায়কের অধিনায়ক! নিজের অধিনায়কত্ব অভিজ্ঞতা, শ্রীলঙ্কার গ্রেটদের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা, জীবন দর্শন ও জীবন নিয়ে ম্যাথুস কথা বলেছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের সাথে— ছোটবেলা থেকে শুরু করা যাক। ক্রিকেটে কিভাবে এলেন? পরিবারের আর কেউ ক্রিকেট খেলতেন? হ্যা, আমার বাবা ও ভাই ক্রিকেট খেলতেন। দু’জনই ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন। আমার ভাই জাতীয় দলের বয়স ভিত্তিক দলেও খেলেছে। এখন দু’জনই ক্রিকেট নিয়েই আছে। ছোটবেলায় কি এরকম নরম-শান্ত স্বভাবের ছিলেন? না। মোটেও শান্ত ছেলে ছিলাম না। মা এখনও বলেন, আমি নাকি দারুণ দুষ্ট ছিলাম। কারো কথা শুনতাম না। শুধু দুষ্টুমি করতাম। বাবা তখন বিদেশে থাকতেন। ক্রিকেটটা কিভাবে শুরু করলেন? আমার মা-ই আসলে আমার প্রথম ক্রিকেট কোচ। স্কুলে খেলার আগে মায়ের কাছ থেকেই শিখেছি। বাবা তখন বিদেশে থাকতেন। আমি আসলে এরকম বাবা-মা পেয়েছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করি। এখনও বাবা-মা আমাকে খুব সমর্থন দেন। এ ক্ষেত্রে আমার স্ত্রীর কথাও বলতে হবে। আসলে যখন পারফরম করতে পারি না, বেশ হতাশ লাগে। সে ক্ষেত্রে একটা ভারসাম্য তৈরির দরকার সেটাই আমি পরিবার থেকে, স্ত্রীর কাছ থেকে পাই। আপনাকে বন্ধুরা নাকি সুপারম্যান বলে ডাকে। কেন? আমি ঠিক জানি না, কেন! তবে সতীর্থতরা সুপারম্যান বলে ডাকে। সম্ভবত ২০০৯ সালে আমি বাউন্ডারি রোপের ওপর শূন্যে লাফিয়ে একটা ক্যাচ ধরেছিলাম বলে এমন বলে। প্যান্টের ওপর আন্ডারওয়্যার পরেন বলে এমন ডাক নাম হয়েছে বলেও শোনা যায়! হা হা হা... না, সেটা একটা ব্যাপার। সেটাও আছে। তবে ওই ক্যাচটাই মনে হয় বেশি ভূমিকা রেখেছে। আপনার ছোটবেলার ক্রিকেট-নায়ক কে ছিলেন? আমার ছোটবেলার নায়ক ছিলেন অরবিন্দ ডি সিলভা। পরে সনাথ ও মুরালি। এদের বলতে পারেন আমার আইডল। এদের সামনে রেখে আমি বড় হয়ে উঠেছি। এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন গ্যারি সোবার্সের মতো হতে চান? গ্যারি! ওফ। আমি যদি তার এক শতাংশও হতে পারতাম; গ্রেট হয়ে যেতাম! সে তো সর্বকালের সর্বসেরা অলরাউন্ডার। তাকে আমি বড় জোর স্বপ্ন দেখতে পারি। আমি, আমি আমার জীবনে তার কীর্তির শতভাগের এক ভাগও করতে পারলে আমার জীবন ধন্য হয়ে যাবে। হ্যা, আমিও স্বপ্ন দেখি আমার একটা নাম খেলাটায় থাকবে। তবে গ্যারি সোবার্সের স্বপ্ন দেখাটা অনেক বড় হয়ে যায়। অধিনায়কত্ব নিয়ে বলেন। শ্রীলঙ্কার অধিনায়কত্ব করা কতোটা চ্যালেঞ্জিং? জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করা সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। এটা খুব চাপেরও ব্যাপার। তবে আমাদের দলের সবাই মিলে, সিনিয়র ও জুনিয়ররা মিলে আমাকে অনেক সহায়তা করছে। তারা তাদের মতামত জানায়। এর ফলে আমার কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেছে। দলে তিনজন সাবেক অধিনায়ক। তাদের উপস্থিতি কি সমস্যা তৈরি করে? না, মোটেও সমস্যা হয় না। তাদের উপস্থিতি বরং আমাকে অনেক স্বস্তি দেয় কারণ, এরা সত্যিই অনেক অভিজ্ঞ। এই তিনজন দীর্ঘদিন ধরে অমূল্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। পুরো দলই তাদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শিখছে। আমরা দেখেছি, মাঠে জটিল পরিস্থিতি হলেই সাঙ্গাকারা, মাহেলা, দিলশান ও আপনি মিটিং মতো করেন। এই যে এদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেয়া, এটা কি চাপ থেকে? না, কখনোই চাপ না। এতে আমার শুধুই উপকার হয়। আসলে, তারা যাই বলুক, শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক হিসেবে আমিই তো সিদ্ধান্ত নেই। তাদের মতামতটা পাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ, তারা এই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে অনেকবার গেছে। আমি এসব সময়ে তাদের কাছ থেকে অনেক মতামত পেয়েছি। আমরা চেষ্টা করি সিনিয়রদের সঙ্গে মিলে একটা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিতে, যেটা দলকে উপকৃত করবে। আপনি দু’জন লিজেন্ডারি অধিনায়ক মাহেলা ও সাঙ্গাকারার ডেপুটি ছিলেন। দু’জনের তুলনা করবেন একটু? তারা তো দু’জন দুই ধরনের অধিনায়ক। আমি তিন জনের কথাই বলি। আমি তো টিএম দিলশানের অধিনায়কত্বেও খেলেছি। আমি বলবো, এরা তিন জনই ভালো অধিনায়ক; তবে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের অধিনায়ক। দলকে তারা নিজেদের কথাটা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে জানাতে চায়। আসলে আপনি এভাবে বিভিন্ন অধিনায়কের মধ্যে তুলনা করতে পারবেন না। আমার কাছে তিন জনই যথেষ্ট ভালো অধিনায়ক, তিন জনই দলের জয়ের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। খেলোয়াড় হিসেবে আপনি শ্রীলঙ্কার, তথা ক্রিকেটেরই সর্বকালের কয়েকজন সেরা খেলোয়াড়কে সতীর্থ হিসেবে পেয়েছেন... আমি আসলে খুব সৌভাগ্যবান যে, সনাথ, ভান, মুরালি, সাঙ্গা, মাহেলা, দিলশানের মতো এই খেলাটার লিজেন্ডদের সঙ্গে আমি একই দলে খেলতে পেরেছি। এরা দেশের জন্য অনেক কিছু করেছে। এখনও তারা খেলার সঙ্গেই আছে। যারা অবসর নিয়েছে, তারাও খেলাটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আপনারা জানেন, সনাথ এখন নির্বাচক, ভাস আমাদের বোলিং কোচ, মুরালি এখনও জিমে আসে। এরা অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, এখন খেলাটাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। আমরা জানি, এরা গ্রেট ছিলেন। কিন্তু টিমমেট হিসেবে এরা কেমন ছিলেন? অসাধারণ। আমি যখন দলে যোগ দেই, একেবারে তরুণ একটা ছেলে ছিলাম। তখন এরাই আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। এরকম গ্রেটদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেলে তরুণদের আত্মবিশ্বাস খুব দ্রুত তৈরি হয়। বিশেষ করে একটা তরুণ খেলোয়াড় যখন দলে আসে, সে একটু নার্ভাস থাকে, চাপে থাকে; আমার সেই অবস্থায় এই সিনিয়ররা এগিয়ে এসে আমাকে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে। আমি বলতে পারি, এই লিজেন্ডদের সঙ্গে খেলে আমি খুবই উপকৃত হয়েছি। আপনার সাবেক দুই অধিনায়ক দলকে বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলেছিলেন। আপনার ওপর কি একই কাজ করার চাপ থাকবে? হ্যা, শ্রীলঙ্কা গত কয়েক বছর ধরে টানা ভালো খেলছে। অনেকগুলো বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছি আমরা। ফলে একটা চাপ তো থাকবেই। তবে সামনেই ২০১৫ বিশ্বকাপ। তাই আমি বা আমার দল খুব দূরের কথা না ভেবে সিরিজ বাই সিরিজ চিন্তা করতে চাইছি; অন্তত এই বিশ্বকাপ পর্যন্ত। শ্রীলঙ্কার স্কুল ক্রিকেট নিয়ে বলুন। আপনি নিজেও তো স্কুল ক্রিকেট থেকে এসেছেন? অবশ্যই স্কুল ক্রিকেট আমাদের দেশের ক্রিকেট কাঠামোর বড় একটা অংশ জুড়ে আছে। আসলে আমাদের দেশের ক্রিকেটটা শক্তভাবে শুরুই হয়ে ওঠে স্কুল ক্রিকেট থেকে। আমি সৌভাগ্যবান যে সেন্ট জোসেফের মতো স্কুলের হয়ে খেলেছি এবং আলোচনায় এসেছি। এখানে শ্রীলঙ্কার মিডিয়ারও কিন্তু দারুণ একটা ভূমিকা আছে। আমাদের ওখানে প্রতিটা স্কুল ম্যাচ মিডিয়াতে দারুণ গুরুত্ব দিয়ে কাভার করা হয়। আসলে এই বয়সে আপনি যদি একটা মিডিয়ায় স্বীকৃতি পান, তাহলে খেলার আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়। আমার ধারণা স্কুল ক্রিকেটটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। বাংলাদেশে তো প্রথম ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছেন। কেমন লাগছে? বাংলাদেশের ঘরোয়া টুর্নামেন্টে প্রথম খেলছি। খুবই ভালো লাগছে। আমরা খেলোয়াড়রা সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াই, বন্ধু তৈরি হয়, ভিন্ন ভিন্ন কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়; সে দিক থেকে বাংলাদেশে এই খেলার অভিজ্ঞতাটা আমাকে আরও উপকৃত করবে। আর ব্রাদার্সে আমি আজহার মেহমুদসহ অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের সঙ্গে খেলতে পারছি। এটা আমাকে আরও ভালো খেলোয়াড় হয়ে উঠতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে কাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? আমাদের দলে তামিম আছে; ও গ্রেট খেলোয়াড়, অসাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের অনেকের বিপক্ষে আমি সেই অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে খেলছি। সাকিবের বিপক্ষেও খেলেছি। সাকিব এখন বাংলাদেশের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। খুবই অভিজ্ঞ। ওর পারফরম্যান্স দিনকে দিন ভালো হচ্ছে। ক্যারিয়ার শেষে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? আমি নিজেকে কোনো লক্ষ্য ঠিক করে দেই না। কখনো ভাবি না, অমুক উচ্চতায় পৌঁছাতে হবে। আমার নামটা যদি খেলোয়াড়-ক্যাপ্টেন হিসেবে টিকে থাকে, সেই অনেক। তবে আমি চাই খেলা ছাড়ার পর লোকে বলুক, ম্যাথুস নামে একটা ভদ্রলোক ছিল, যে খেলাটার জন্য পরিশ্রম করে গেছে এবং ভালো করার চেষ্টা করেছে।