সর্বনাশা ইয়াবা ও একজন ঐশী

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৬
‘সত্ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসত্ সঙ্গে সর্বনাশ’—প্রবাদটি অনেকেরই জানা। তারপরও কেউ কেউ পরিস্থিতির শিকার হয়ে অসত্ সঙ্গে পড়ে যায়। বখে যায় অসত্ বন্ধুর সঙ্গ পেয়ে। কেউবা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে খুন, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো বিভিন্ন অপরাধ কর্মে। আর এ কুপ্রভাব পরিবার, সমাজ ও দেশের ওপর গিয়ে পড়ে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু ভয়াবহ ঘটনার একটি— মেয়ের হাতে বাবা-মা খুন। লোমহর্ষক ব্যাপার! গুম-হত্যা-খুন, চাঁদাবাজি, লুণ্ঠন এখন কোনোটাই অস্বাভাবিক কিছু নয়। পত্রিকা খুললেই নিত্য এসব খবর চোখে পড়ে। কিন্তু নিজের সন্তানের হাতে যখন বাবা-মাকে খুন হতে হয়, তখন বিষয়টি আরো বেশি ভয়াবহভাবে সবাইকে ভাবায়। সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে আমরা জানতে পারি, অতি সুপরিকল্পিতভাবে ঐশী নামের এক কিশোরী তার বাবা-মাকে হত্যা করেছে। তাকে সহযোগিতা করেছে তার বন্ধুরা। পরে আরো ভালোভাবে জানা যায়, ঐশী ছিল ইয়াবা আসক্ত। ইয়াবা এক ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য, যা ট্যাবলেট আকারে পাওয়া যায়। ডিপেন্ডেন্সি তৈরি হয়ে গেলে তখন অন্যান্য নেশাদ্রব্যের মতো বেশি পরিমাণ ইয়াবা সেবন করে নেশা নিবৃত্ত করে ইয়াবা- আসক্তরা। আর এই ভয়াবহ ইয়াবা আসক্ত ছিল ঐশী। সুতরাং বলা যেতে পারে, ঐশী নামের কোনো কিশোরী তার বাবা-মাকে খুন করেনি, খুন করেছে একজন ইয়াবা-আসক্ত কিশোরী যার নাম ঐশী। কিন্তু কেন কোমলমতি এই কিশোরী আজকের এই ইয়াবা-আসক্ত ঐশীতে পরিণত হলো সেটাই ভাবার বিষয়। কোনো পেশাদার খুনিকে টাকার বিনিময়ে তার বাবা-মাকে খুন করতে বলা হলে, সেই খুনি এই নৃশংস কাজটি করতে পারবে কিনা প্রশ্ন থেকে যায়, যেটা খুব সহজে করতে পেরেছে একজন কিশোরী। ঐশীর বাবা ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু ঐশীর আনন্দ-ফূর্তির জন্য প্রতি মাসে বেশ কিছু টাকা খরচ হতো। এই অর্থের জোগানটাই বা কোথা থেকে আসতো প্রশ্ন থেকে যায়! আর এই টাকা দিয়ে ঐশী কী করতো সেটা তার বাবা-মায়ের একটু ভেবে দেখা দরকার ছিল। কিন্তু ঐশী যখন অতিমাত্রায় বখে যায় তখন পরিবার থেকে তার ওপর চাপ আসতে থাকে। কড়া শাসন করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে থাকে ঐশীর বাবা-মা। আর এতেই হিতে বিপরীত ঘটে। কিন্তু ইয়াবা-আসক্ত ঐশী সে শাসন মানতে পারেনি। ঐশী চেয়েছিল স্বাধীনভাবে ইয়াবা সেবন করার অনুকূল পরিবেশ। আর এজন্যই সম্ভবত বন্ধুদের সহযোগিতায় পরিকল্পিতভাবে বাবা-মাকে খুন করে ঐশী। কিন্তু এ ঐশী একা একা সৃষ্টি হয়নি। কী কারণে একজন কোমলমতি কিশোরী আজকের ঐশী হলো, সেগুলো আগে ভাবতে হবে সবাইকে। পুলিশ দম্পতি খুনের ব্যাপারে অনেকগুলো কারণ দাঁড় করানো যেতে পারে। তার মধ্যে নেশাজাতীয় দ্রব্যের অবাধ প্রচলন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, আকাশ সংস্কৃতির কুপ্রভাব, সঠিক নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং অসত্ সঙ্গ নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। আজ ঐশী সবার চোখে খারাপ। সবাই তাকে খুনি হিসেবে দেখছে। কিন্তু ঐশীর এই পরিণতির জন্য তার পরিবার কিংবা সমাজ কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। সারা রাত ধরে ফেসবুকে চ্যাট আর ভোর চারটা পর্যন্ত নাইট ক্লাবে ফূর্তি করার জন্য বর্তমান সময়ের কিছু তরুণ-তরুণী বেছে নেয় ইয়াবার মতো মারাত্মক নেশাজাতীয় দ্রব্য। ইয়াবার অনিদ্রা বৈশিষ্ট্যের জন্য রাত জাগা ছেলেমেয়েরা এর দিকে বেশি পরিমাণ ঝুঁকছে। যা তরুণ সমাজের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর এবং সবার জন্য অশনি সংকেত। আর কোনো বাবা-মাকে যেন মেয়ের হাতে জীবন দিতে না হয়, সেজন্য প্রত্যেক বাবা-মাকে মেয়ের দিকে একটু নজর রাখতে হবে। মেয়ে কোথায় যায়, কী করে, কার সঙ্গে মেলামেশা করে সেটা অবশ্যই মা-বাবাকে জানতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, কোনোমতেই মেয়ে যেন বখে না যায়। ঐশী এখন আর একা নয়। ‘ঐশী’ একটি শ্রেণিতে পরিণত হতে চলেছে, একটি সমাজে পরিণত হতে চলেছে। উঠতি বয়সী কিশোর-কিশোরী কিংবা তরুণ-তরুণীরা ইয়াবার মতো নেশাদ্রব্যে আসক্ত হয়ে আজ আপনজন ভুলতে বসেছে। এই সমাজকে এখনই রোখা দরকার, নইলে যুবসমাজকে বাঁচানো যাবে না। আমরা ইয়াবা-আসক্ত আর কোনো ঐশীকে চাই না, আমরা ‘ঐশীমুক্ত’ সমাজ চাই। যারা আকাশ ছোঁবে, যাদের চোখে মুখে মানুষ হওয়ার স্বপ্ন, যারা একদিন দেশ পরিচালনা করবে, জাতিকে নেতৃত্ব দেবে; তারাই প্রমাণ করবে, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা, সব শিশুরই অন্তরে।’ ঢাকা