আমাদের এ অঞ্চলের অনেক দেশের মতো মিয়ানমারের স্বাধীনতাও এসেছে রক্তঝরা পথে। জেনারেল অং সান ছিলেন সেই দেশের মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা রাখা মুক্তিযোদ্ধা।
মিয়ানমারের জাতীয় নেতা অং সান যখন বিভ্রান্ত কিছু সৈনিকের অতর্কিত আক্রমণে নিহত হন তখন জেনারেল অং-এর তৃতীয় সন্তান অং সান সু চি ছিল মাত্র দুই বছর বয়সী। পরবর্তী সময়ে ভারত ও অক্সফোর্ডে শিক্ষাজীবন শেষ করেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সু চি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজনীতির কর্ণধার হয়ে আবিভূর্ত হন। বর্তমানে মিয়ানমারের রাজনীতিতে সু চির প্রভাব বাড়ছে।
১৯৮৮ সালের ৮ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমারের রাজনীতিতে সু চির উত্থান। সু চির নেতৃত্বে মিয়ানমারে এখন গণতন্ত্রের হাওয়া বইছে। পাঁচ দশকের স্বৈরশাসন অবসানের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা বিশ্বের আরোপ করা অনেক বছরের অর্থনৈতিক অবরোধও শেষ হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
মিয়ানমার প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। খনিজ, আকরিক, তেল, গ্যাস, মূল্যবান পাথর সবই আছে দেশটিতে। বিশ্বের প্রাকৃতিক কাঠের প্রধান সরবরাহকারী। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ তেল ও গ্যাস খাতে সীমাবদ্ধ থাকলেও দেশটি সমপ্রতি উত্পাদনভিত্তিক বিনিয়োগ আকর্ষণে মনোযোগী হয়েছে। জলবিদ্যুত্ উত্পাদনে সাফল্য দেখিয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি ফিরছে মিয়ানমারে।
মিয়ানমার অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে ঢেলে সাজানোর জন্য জ্বালানি নীতিমালা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিমালা তৈরি করছে। মিয়ানমারের উদার অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণের কারণে মিয়ানমার এখন অংশত একটি বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মিয়ানমারকে ৮ কোটি ডলার মঞ্জুরি সাহায্য দিতে সম্মত হয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। পাশাপাশি ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে আন্তর্জাতিক ওই প্রতিষ্ঠানটি।
ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট জানিয়েছে, আগামী চার বছরে ব্রিটেন সেখানে ১৮ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড সাহায্য জোগাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। খাদ্য, শিক্ষা ছাড়াও নারীদের ক্ষমতায়নে খরচ হবে এ অর্থ। মিয়ানমারে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সুইডেনের টেলিয়াসনেরা এবি, মালয়েশিয়ার অজিয়াটা ও নরওয়ের টেলিনর। মালয়েশিয়া ইউকে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এরই মধ্যে মিয়ানমারে অফিস খুলেছে। বহুজাতিক কোম্পানি মাইক্রোসফট, জেনারেল ইলেকট্রিক, ফোর্ড , টয়োটা, ম্যাকডোনাল্ড, কোকাকোলা, ইউনিলিভার, গ্লাক্সোসহ বিশ্বের সব কোম্পানি ইয়াঙ্গুনে অফিস খোলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কৃষিতে সমৃদ্ধ মিয়ানমার। বাংলাদেশের চেয়ে আয়তনে পাঁচ গুণ হলেও দেশের লোকসংখ্যা মাত্র ৬ কোটি। তুলা, পাট, ধান, গম, ভুট্টা, আখ, ডাল, পেঁয়াজ, আদা, রসুন ও রাবারসহ সব ধরনের কৃষিপণ্য উত্পাদন হয় মিয়ানমারে। ষাটের দশকের আগে দেশটি ছিল শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশ।
অবিসংবাদিত নেত্রী অং সান সু চির হাত ধরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমার নতুন করে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হওয়ার পর দেশটিতে একের পর এক আগমন ঘটছে বিশ্ব নেতাদের। সমপ্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মিয়ানমার সফর করেছেন। সফরের আগে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মনমোহনের এ সফর শান্তি ও সমপ্রীতির প্রতীক মাত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মিয়ানমার সফর করেছেন। মিয়ানমারে এটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের প্রথম সফর।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে ২০০৩ সালের ৫ নভেম্বর টেকনাফ স্থলবন্দর চালু করে। এ বন্দর দিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের আমদানিকারকরা বাইসাইকেল, টর্চ লাইট, বিছানার চাদর, টাওয়েল, লুঙ্গি, জুতা, সেন্ডেল, তালা, চাবি, গরু, মাছ, আদা, সুপারি, মাশকলাই, আচার, শুকনা বড়ই, তেঁতুল, শিমের বীজ, বিভিন্ন প্রকার ডাল, ছোলা, মশলাজাতীয় পণ্য, শুঁটকি, বাঁশ, বেত, রাবার, কাঠ প্রভৃতি আমদানি করে। মিয়ানমার থেকে চাল আমদানি হলেও এখন তা বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ২০০৯ সালে মিয়ানমার থেকে ৪১ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে সিমেন্ট, রড, প্রসাধনসামগ্রী, হাঙ্গর, কচ্ছপের খোলস, অ্যালুমিনিয়ামসামগ্রী, স্বর্ণ অলংকার, মটর পার্টস, ওষুধ রপ্তানি হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের বাণিজ্য ঘাটতি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।
একটি দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অগ্রগতি, স্বাধীনতা হরণ, অবনতি নির্ভর করে সেই দেশের সরকার প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা, শারীরিক ও মানসিক অবস্থানের ওপর। মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জেনারেল অং সান ও রেঙ্গুন জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র সেবিকা এক সময়ের মিয়ানমার রাজনীতির ত্রাণকর্তা খিন চির সুযোগ্য কন্যা অক্সফোর্ডের কৃতী ছাত্রী শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এবং ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির প্রধান অং সান সু চি মাত্র ৭ মাসে মিয়ানমারকে বিশ্ব দরবারে শীর্ষ স্থানে নিয়ে গেছেন। এই অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে নিঃসন্দেহে আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিকবলয় নিয়ন্ত্রণ করবে অং সান সু চির মিয়ানমার।
একটি দেশের শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সমরনীতি প্রণয়ন করা হয় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে। আমাদের পার্শ্ববর্তী বৃহত্ দেশ ভারত সুপার পাওয়ার হতে চলেছে। এখন থেকে প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষা নিতে হবে অক্সফোর্ডের সাবেক ছাত্রনেত্রী অং সান সু চি থেকে। সু চি অধিক সংখ্যক কর্মহীন মানুষকে টাইম বোমার সঙ্গে তুলনা করেছেন। উচ্চশিক্ষার চেয়ে ডিপ্লোমা শিক্ষায় প্রশিক্ষিত তরুণ মিয়ানমারে বেশি প্রয়োজন বলে নীতি নির্ধারণ করেছেন। জাপানের মতো ৮০/৯০ শতাংশ তরুণকে ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদ্যায় শিক্ষিত করে একগ্রাম একপণ্য রপ্তানি নীতি গ্রহণ করবেন বলে পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনে ঘোষণা দিয়েছেন।
আদিকাল থেকে পররাষ্ট্রনীতির ধর্ম হলো পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা। সংস্কৃতিকে সংস্কৃতি দিয়ে, শান্তিকে শান্তি দিয়ে, অস্ত্রকে অস্ত্র দিয়ে, বিজ্ঞানকে বিজ্ঞান দিয়ে, শিক্ষাকে শিক্ষা দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। ভারসাম্যহীন নীতি পার্শ্ববর্তী দেশকে অতল গহবরে নিপতিত করে। অং সান সু চির নীতিকে পাল্লা দিতে হলে বাংলাদেশের তরুণদেরকে কর্মমুখী করার উদ্দেশ্যে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রশিক্ষণসহ যথাযথ কর্মখৌশল গ্রহণ করতে হবে। তাহলে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সুবাতাসের সঙ্গে বাংলাদেশ একাত্ম হয়ে উন্নতির পথে অগ্রগামী হতে পারবে সমতালে।
চট্টগ্রাম
