ভোলার মনপুরায় অধিকাংশ মানুষ মত্স্য সম্পদের উপর নির্ভরশীল। এখানকার শতকরা প্রায় ৭০ জন লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাছ ধরার সাথে জড়িত। জেলে পরিবারের অধিকাংশ ছেলে ৮/১০ বছর বয়সে সংসারের অভাবের তাড়নায় এ কাজে জড়িয়ে পড়ে। পিতা মাতাও ছেলেদের মাছ ধরার কাজে উত্সাহিত করে। এতে দেখা যায় জেলে পরিবারের অধিকাংশ ছেলে স্কুলে পড়াশুনা বাদ দিয়ে মেঘনায় মাছ শিকার করতো। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত জেলে পরিবারের মধ্যে দেখা যায় একজন জেলের আয়ের উপর ৭/৮ জনের সংসার চলে। এখানকার জেলেরা অত্যন্ত গরীব। জাল, নৌকা বা ট্রলার বানানোর মত অবস্থা এখানকার জেলেদের নেই। সংসারে অভাবের তাড়নায় ছেলে মেয়েদের ভরণ পোষণ জোগাতে বাধ্য হয়ে মাছের আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে মেঘনায় মাছ শিকার করে। এতে জেলেরা জিম্মি থাকতে হয় আড়তদারের কাছে।
মেঘনা পাড়ে কথা হয় ১০ বছরের শিশু মোঃ মিজানের সাথে। আলাপের এক পর্যায়ে সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, স্যার গেছে বছর আর আব্বা অসুখে মইরা গেছে। আংগো সংসারে ৪ ভাই বোনের মধ্যে আই বড়। আংগো কোন জাগা জমি নাই। আই লেহা হড়া করমু কেননে। ছোড ছোড ভাই বোনের পেডের ভাত জোগাইতে নৌকায় উডছি। মাছ ধইরা যা হায় তা দিইয়া সংসার চলে। কথাগুলো বলতেই সে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এভাবে নদীর পাড়ে দেখা যায় ১০/১২ বছরের অনেক শিশুকে যারা মাছ ধরার পেশায় জড়িত। অভাবের তাড়নায় সংসারের ভাই বোনের মুখে দুই মুঠো ভাত তুলে দিতে এসব শিশু বাধ্য হয়ে মেঘনায় মাছ শিকারে জড়িয়ে পড়ছে। জেলে রাস্তায় দেখা হয় চরযতিনের কাশেম মাঝির স্ত্রী জরিনা বেগমের সাথে। কথা হয় তার সাথে। রাস্তার পাশে ছোট একটি কুড়ে ঘর তুলে ৬/৭ জন বসবাস করছে। এ সময় দেখা যায় তিনি দুপুরের রান্নার জন্য কচুর লতি কুটছে। স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করলে জরিনা বলেন, আমার বেডার কথা বইললেন, হে নদীতে মাছ ধরতে গেছে। মাছ ধইরা বিক্রি করলে হের পর টাহা দিয়া দুহুরের জন্যে চাইল, ডাইল আনবে হের পর চুলা ধরাইমু। না আইনলে পোলাইন গুইলা নিয়ে উয়াস থাহন লাইগবো। সারগো আমরা খুব কষ্টে আছি। আংগো কষ্ট কেহই বুঝে না।
এভাবেই চলে জেলে পাড়ায় জেলেদের জীবন। মেঘনায় মাছ না পড়লে জেলেরা খুব কষ্টে তাদের সংসার চালায়। পরিবারের ভরণ পোষণ জোগাতে হিমশিম খেতে হয় জেলেদের। জেলেদের নেই কোন নিজস্ব জায়গা ও ফসলি জমি। তারা শুধু মেঘনায় মত্স্য শিকারের উপর নির্ভরশীল। মত্স্য মৌসুম ছাড়া বাকি সময় জেলেরা শ্রমিক পেশা হিসেবে কাজ করে। পারিশ্রমিক বিনিময়ে যা পান তা দিয়ে কোনমতে সংসার চলে।
