যে কোনো মূল্যে যথাসময়ে নির্বাচন :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৪৭
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যেকোন মূল্যে যথাসময়ে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি নেত্রীর সাধ্য নেই এই নির্বাচন বানচাল করার। তিনি বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, নির্বাচন প্রতিরোধের চিন্তা বাদ দিয়ে গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসুন। মানুষের ভোটের অধিকার নিয়ে ষড়যন্ত্র বাদ দিন। আপনি নির্বাচন না চাইলেও দেশের মানুষ নির্বাচন চায়। মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় আওয়ামী লীগ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। একমাত্র আওয়ামী লীগই জানে কিভাবে মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করতে হয়। সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৬ হাজার নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু একটি নির্বাচন নিয়েও কোন কথা উঠেনি, কারচুপির অভিযোগ উঠেনি। আওয়ামী লীগ ভোট কারচুপির রাজনীতি করে না। ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশন মেরুদণ্ডহীন’ বিরোধী দলীয় নেতার এমন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরাই প্রথমবারের মতো সাব কমিটি গঠন করে সকলের মতামত নিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করেছি। এই কমিশন একের পর এক অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করেছে। সদ্য সমাপ্ত ৫ সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, তাহলে বিএনপির এই প্রার্থীরা কী কারচুপির মাধ্যমে বিজয়ী হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার বিকালে সিলেটের গোলাপগঞ্জে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এমসি একাডেমী মাঠে আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইকবাল আহমদ চৌধুরী। সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রমুখ। বিকাল পৌনে ৪টায় প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারযোগে সিলেট জালালাবাদ সেনানিবাস থেকে গোলাপগঞ্জে পৌঁছেন। সেখান সভা মঞ্চে পৌঁছে প্রথমে তিনি সিলেটের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৬শ কোটি টাকার অনেকগুলো উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে-সিলেট ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, কতোয়ালী মডেল থানা ভবন, সিলেট কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়, ৩১ শয্যা বিশিষ্ট দক্ষিণ সুরমা উপজেলা হাসপাতাল কমপ্লেক্স, সিলেট গাছবাড়ী কানাইঘাট বাজার সড়কের কানাইঘাট বাজার প্রান্তে সুরমা নদীর উপর ২৯৪ মিটার দীর্ঘ সেতু, বাগবাড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, সিলেট জেলা পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট, লায়ন্স শিশু হাসপাতাল ভবন নির্মাণ, মেরিন একাডেমী স্থাপন প্রকল্প, সিলেট শহীদ সামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালকে শিশু হাসপাতালে রূপান্তর প্রকল্প, গোয়াইনঘাট রাধানগর বাজার-জাফলং বাজার রাস্তায় পিয়াইন নদীর উপর ৩৬০ মিটার পিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ, গোলাপগঞ্জ কৈলাশটিলা গ্যাস ফিল্ড ৭নং কূপ খনন প্রকল্পের উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সিলেট গ্যাস ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক আপগ্রেডেশন প্রজেক্টের আওতায় বিশ্বনাথ ও বালাগঞ্জ উপজেলার গ্যাস সরবরাহ পাইপ স্থাপন প্রকল্প। বিকাল ৪টা ৩৪ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা দেয়ার জন্য সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রথমেই উপস্থিত লাখো জনতাকে হাত নেড়ে অভিবাদন ও সালাম জানান। তিনি বলেন, আমি গোপালগঞ্জের মেয়ে। আর আজ এসেছি গোলাপগঞ্জে। লাখো গোলাপফুলে আজ ভরে গেছে এই মাঠ। তিনি বলেন, আমি মা-বাবা সব হারিয়েছি। এখন আপনারাই আমার আপনজন। বাংলার মানুষের জন্যই আমি সারা জীবন কাজ করে যাবো। কারো হুমকিতে আমি ভয় পাই না, মাথা নত করি না। আল্লাহর উপর ভরসা রেখেই আমি দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে আমাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড হামলা করেছিল। আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে যাই। তবে আইভি রহমানসহ আমাদের দলের অনেক নেতাকর্মী নিহত ও আহত হন। একইভাবে তারা সারাদেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছিল। হাওয়া ভবন বানিয়ে বিএনপি নেত্রীর ছেলে এতিমদের টাকাও মেরে খেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি। আর একারণে কষ্টে-দুঃখে দিন কাটছে বিএনপি নেত্রীর। কারণ তিনি যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে চান। এর আগে জিয়াউর রহমান এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর খালেদা জিয়া তাদের মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা ত্রিশ লাখ মানুষ খুন করেছে, আমাদের মা-বোনদের নির্যাতন করেছে, মানুষের বাড়ি-ঘর পুড়িয়েছে সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে হবেই হবে। কোন ষড়যন্ত্রই এই বিচার রুখতে পারবে না। ‘সরকারী টাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর’ বিএনপির উত্থাপিত অভিযোগ খণ্ডন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোন কিছু বলার আগে আয়নায় নিজের মুখও দেখা দরকার। বিএনপি নেত্রী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সারা দেশ চষে বেড়িয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। আগামীতেও মানুষ নৌকায় ভোট দিয়ে সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে। প্রধানমন্ত্রী আসন্ন নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করার জন্য উপস্থিত জনতার প্রতি অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সকাল ১০টায় একটি বিশেষ বিমানযোগে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে পৌঁছেন। সিলেট পৌঁছে প্রথমেই তিনি হযরত শাহজালাল (রহঃ) ও হযরত শাহপরান (রহঃ) এর মাজার জিয়ারত করেন। দুপুরে প্রধানমন্ত্রী জালালাবাদ সেনানিবাসে নতুন পদাতিক ডিভিশনের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। ১৭ পদাতিক ডিভিশনের পতাকা উত্তোলন করলেন প্রধানমন্ত্রী সিলেট জালালাবাদ সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর ১৭ পদাতিক ডিভিশনের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। গতকাল সকালে জালালাবাদ সেনানিবাসে এ পতাকা উত্তোলন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সকালে প্রধানমন্ত্রী জালালাবাদ সেনানিবাসে উপস্থিত হলে তাকে স্বাগত জানান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। প্রধানমন্ত্রী পতাকা উত্তোলনের পর সেখানে সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সেনাবাহিনীর উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে বিশ্বাসী। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ফোর্সেস গোল-২০৩০ আলোকে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সাংগাঠনিক কাঠামোতে আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও যোগাযোগ সরঞ্জামাদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ এলাকার সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা করে ভূমি মন্ত্রণালয়কে ইতিমধ্যে নোয়াখালীর চর কেরিংয়ের ৯ হাজার একর জমি বরাদ্দের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নবগঠিত ১৭ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যদের আবাসনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সিলেটের শিবের বাজারে ১৪৮৪ একর জমি সেনাবাহিনীর অনুকূলে হস্তান্তরের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। নবগঠিত ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেডের সদস্যদের আবাসনের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুর উভয়পাশে অধিগ্রহণকৃত জমি হতে প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্দেরও নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি রামু ও রুমাতে পূর্ণাঙ্গ সেনানিবাস স্থাপনের জন্য যথাক্রমে ৬৫৭ একর ও ৯৯৭ একর জমি হস্তান্তরের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নবগঠিত ১৭ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ও অধীনস্থ সকল অফিসার জেসিং ও অন্য পদবীর সেনাসদস্যদের শুভেচ্ছা জানান।